বিশ্ব হাতি দিবস
বিশালদেহীর জন্য দুঃখগাথা

শেরপুরের পাহাড়ে বাচ্চাসহ বুনো হাতির পাল- ছবি: মনিরুল খান
বেশ কয়েক বছর আগের কথা। রাঙামাটির রাঙিপাড়া গিয়েছি হাতি দেখতে। সেখানে সাময়িক আস্তানা গেড়েছে বুনো হাতির একটি দল। কাছেই মানুষের বসতি। সেখানে মানুষ-হাতি রীতিমতো মুখোমুখি অবস্থা। এ সময় শুনলাম এক অবিশ্বাস্য ঘটনা। হঠাৎ করে বড় একটি হাতির সামনে পড়ে গিয়েছিল বছর পাঁচেকের এক অবুঝ শিশু। কাছেই থাকা ওর মা ভেবেছিলেন, ছেলেকে মনে হয় আর জীবিত পাবেন না। কিন্তু বিশাল দেহের অধিকারী প্রাণীটি অত্যন্ত আলতো করে শুঁড় দিয়ে শিশুটিকে অত্যন্ত আলতো করে শুঁড় দিয়ে শিশুটিকে পথ থেকে সরিয়ে দিল শুধু। অসীম শক্তির সেই আলতো স্পর্শেও শিশুটির গলায় সামান্য দাগ পড়ে যায়। ছেলেটি এবং তার মায়ের মুখ থেকেই শুনি পুরো ঘটনাটি। নিজে আক্রান্ত না হলে হাতি যে মানুষকে আক্রমণ করে না, আর ওদের অনুভূতি যে কতটা গভীর— এ ঘটনাটি তার একটি ছোট্ট প্রমাণ।
হাতিদের পারিবারিক বন্ধনের তুলনা নেই। নতুন কোনো সদস্য যখন পৃথিবীতে আসে, তখন মা ও শাবক হাতিকে সুরক্ষা দিতে গোল হয়ে দেয়ালের মতো ঘিরে দাঁড়ায় পুরো পালটি, যেন বাঘ কিংবা অন্য কোনো মাংসাশী তাকে ছুঁতেও না পারে। শিশুটিকে বড় করে তোলার দায়িত্ব শুধু মায়ের নয়; বোন, খালা, নানি-দাদিরও। ছোট্ট ছানাটির চলার গতির সঙ্গে মিলিয়ে পুরো দল নিজেদের হাঁটার গতি কমিয়ে দেয়। মা ও খালার কাছ থেকে সে শেখে অরণ্যে বেঁচে থাকার মূলমন্ত্র— কোন গাছ পুষ্টিকর, কোনটি বিষাক্ত কিংবা বিপদের আভাস পেলে কী করতে হয়।
হাতিদের শোক প্রকাশ মানুষের মতোই করুণ ও গভীর। সাম্প্রতিক সময়ে মৃত শাবকের পাশে কয়েক দিন ধরে মা হাতি দাঁড়িয়ে থাকার অন্তত দুটি ঘটনা ঘটেছে বাংলাদেশের বন-পাহাড়ে। শেরপুরের বুনো হাতিদের নিয়ে কাজ করা গারো যুবক কাঞ্চন মারাক জানিয়েছেন, মানুষের সঙ্গে সংঘর্ষ, বিদ্যুতের ফাঁদে হাতির মৃত্যু বেড়ে যাওয়ায় সেখানকার হাতিরা এখন সতর্ক। তারা লোকালয়ের আশপাশে যখন আসে, তখন বড় কয়েকটি হাতির পাহারায় বাচ্চাদের তুলনামূলক নিরাপদ জায়গায় রাখে।
এই বিশালদেহী, স্নেহশীল ও বুদ্ধিমান প্রাণীরা ভালো নেই আমাদের দেশে। সর্বশেষ ২০১৬ সালের জরিপ অনুযায়ী দেশে স্থায়ী বুনো হাতির সংখ্যা ছিল ২৬৮টি। সীমান্ত এলাকায় আসা-যাওয়ার মধ্যে থাকে এমন হাতির সংখ্যা ৯৩টি। তবে বন বিভাগের হিসাবই বলছে, ২০১৫-২০২৬ সালের এই সময় পর্যন্ত মারা গেছে ১১০টি বুনো হাতি। হাতিমৃত্যুর অন্যতম কারণ মানুষের পেতে রাখা বৈদ্যুতিক ফাঁদ। নিশ্চিতভাবেই এত হাতির বাচ্চার জন্ম হয়নি এ সময়ে।
শেষ জরিপে বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি স্থায়ী বুনো হাতি পাওয়া গিয়েছিল কক্সবাজারে। এখন সেখানেই বেশি হুমকিতে বুনো হাতিরা। রোহিঙ্গা বসতি এবং বিভিন্ন স্থাপনার কারণে সেখানে হাতিদের কয়েকটি ঐতিহাসিক চলাচলের পথ বা ‘করিডর’ বন্ধ হয়ে গেছে। একসময় যে টেকনাফ গেম রিজার্ভ ছিল হাতিদের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থল, সেখানে এখন রোহিঙ্গা শিবিরের চাপে কোনো বন্যপ্রাণীরই খাবার নেই। এদিকে চুনতির বন, ফাঁসিয়াখালী বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য এবং মেধাকচ্ছপিয়া ন্যাশনাল পার্ক কেটে গেছে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথের ২৭ কিলোমিটার। এতে হাতি চলাচলে কয়েকটি করিডর বাধাগ্রস্ত হয়েছে। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা পার্বত্য চট্টগ্রাম-গারো পাহাড় এলাকায় ভারত-মিয়ানমারের কাঁটাতারের বেড়া। মিয়ানমারের পেতে রাখা স্থলমাইন সীমান্তের হাতিদের জন্য দেখা দিয়েছে নতুন এক মরণফাঁদ হিসেবে।
অথচ একসময় এ দেশে হাতিরা মহানন্দে দিন কাটাত। ইউসুফ এস আহমেদের ‘উইথ দ্য ওয়াইল্ড অ্যানিমেলস অব বেঙ্গল’ কিংবা জর্জ পি স্যান্ডারসনের বই অনুবাদ করার সময় জেনেছি, একসময় কাসালং, কাপ্তাইসহ রাঙামাটি-খাগড়াছড়ির গহিন বনে হাতির এত আধিক্য ছিল যে ‘খেদা’ দিয়ে হাতি ধরে পোষ মানানো হতো। এনায়েত মাওলা তার বইয়েও বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে সিলেটের সীমান্ত এলাকায় বুনো হাতির বড় দলের বিচরণ ও পার্বত্য অঞ্চলের বিশাল হাতির পালের গল্প লিখেছেন। ২০১১ সালে কাসালং রিজার্ভের পাবলাখালীতে গিয়ে এক বৃদ্ধের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, কৈশোরে কাসালংয়ে ১০০ হাতির বিশাল পাল দেখেছেন। ওই ভ্রমণে ২৮টি হাতির একটি পাল আমি নিজেও ঘুরতে দেখেছি রাঙিপাড়ার বনে। কিন্তু সে বিশাল পাল বা প্রকাণ্ড দাঁতের হাতির রাজত্ব আজ অতীত।
শত শত বছর ধরে হাতিরা যে অরণ্যে মুক্তভাবে বিচরণ করত, আজ সেখানে তাদের অস্তিত্ব হুমকিতে। তবে বন বিভাগ হাতি সংরক্ষণে নতুন প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এর আওতায় হবে হাতি শুমারিও। উখিয়া বন বিভাগের বিট কর্মকর্তা ইমদাদুল হাসান রনির সঙ্গে ১১ আগস্ট কথা বলে জানলাম, ইনানী-উখিয়ার হাতির পালে কয়েকটি ছোট বাচ্চাও আছে। ১২ আগস্ট বিশ্ব হাতি দিবসে একটাই চাওয়া, শাবকদের নিয়ে দেশের অরণ্য-পাহাড়ে মনের আনন্দে ঘুরে বেড়াক বুনো হাতির পাল।




