রানা প্লাজা ধস
চার ভাগের একভাগও সাক্ষ্য দেয়নি হত্যা মামলায়
- সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনার পর হত্যা মামলা নিষ্পত্তি হয়নি
- ইমারত আইনের মামলায় ১৩৫ সাক্ষীর কারোর সাক্ষ্য হয়নি

ফাইল ছবি
২৪ এপ্রিল, ২০১৩ সাল। সকাল ঠিক ৯টা। ঢাকার সাভারে অবস্থিত রানা প্লাজা ভবনে কর্মব্যস্ত সময় পার করছেন পোশাককর্মীরা। হঠাৎ ধসে পড়ে ভবনটি। এতে মৃত্যু হয় ১ হাজার ১৩৬ পোশাককর্মীর। সময় পেরিয়ে আজ শুক্রবার এই ঘটনার ১৩ বছর পূর্ণ হয়েছে। অথচ শেষ হয়নি কাঙ্ক্ষিত বিচার প্রক্রিয়া। এ ঘটনায় পুলিশের করা হত্যা মামলাটি ২০২৪ সালের ১৫ জানুয়ারি ছয় মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে সংশ্লিষ্ট আদালতকে নির্দেশ দিয়েছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। তবে এই নির্দেশনার ২৬ মাস পেরোলেও নিষ্পত্তি হয়নি মামলাটি। আগের মতোই মামলাটি আটকে রয়েছে সাক্ষ্য গ্রহণ পর্যায়ে। এই মামলার মতো ইমারত নির্মাণ আইনের আরেক মামলার বিচার কাজও ঝুলে রয়েছে নিষ্পত্তি ছাড়াই। এখন পর্যন্ত মামলায় ১৩৫ জন সাক্ষীর কারোরই সাক্ষ্য গ্রহণ হয়নি। কবে নাগাদ বিচার কাজ শেষ হবে নির্দিষ্ট করে বলতে না পারলেও দ্রুত শেষ করার প্রত্যাশা রাষ্ট্রপক্ষের।
এ বিষয়ে ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর ফয়সাল মাহমুদের ভাষ্য, শেখ হাসিনার আমলে এই ট্রাজেডিকে পুঁজি করে তারা হাসিল করেছে রাজনৈতিক ফায়দা। তাদের স্বদিচ্ছার অভাবে এগোয়নি মামলার বিচার। দিনের পর দিন পার হলেও রাষ্ট্রপক্ষ বা সরকারের পক্ষে থেকে মামলা শেষ করতে নেওয়া হয়নি কোন উদ্যোগ। তবে আওয়ামী লীগের সরকার পতনের পর গুরুত্ব দেওয়া হয় মামলাটি নিষ্পত্তিতে।
এখন পর্যন্ত হত্যা মামলাটিতে ৫৯৪ সাক্ষীর মধ্যে সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়েছে ১৪৫ জনের। আশা করা যায়, এই বছরের মধ্যে বিচার প্রক্রিয়া শেষে ঘোষণা করা হবে রায়।
আসামি সোহেল রানার আইনজীবী মাসুদ খান খোকন জানান, সাক্ষ্য প্রমাণে আসামি রানা নির্দোষ প্রমাণিত হলে খালাস পাবেন, নাহলে সাজা হবে— এটাই চিরাচরিত বিষয়। তবে মামলার সাক্ষী তো শেষ হচ্ছে না। ১৩ বছর ধরে বিনা বিচারে কারাগারে রয়েছেন রানা। যদি তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে খালাস পান, তাহলে এই ১৩ বছর তাকে ফিরিয়ে দেবে কে। এখন পর্যন্ত সাক্ষ্য প্রমাণে রানার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্টভাবে কোনো অভিযোগ আনতে পারেননি রাষ্ট্রপক্ষ। মামলার বিচারে দীর্ঘসূত্রিতায় ন্যায় বিচার পাচ্ছেন না আসামি রানা। আমরা চাই এ মামলার বিচার দ্রুত শেষ হোক। প্রতিষ্ঠিত হোক ন্যায় বিচার।
বর্তমানে হত্যা মামলাটি ঢাকার অষ্টম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন। মামলাটিতে এ পর্যন্ত ৫৯৪ জন সাক্ষীর মধ্যে সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়েছে মাত্র ১৪৫ জনের। সর্বশেষ গত ৩০ মার্চ দিন ধার্য ছিল সাক্ষ্য গ্রহণের। ওইদিন আটজনের সাক্ষ্য গ্রহণ করেছেন আদালত। পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য দিন ধার্য রয়েছে আগামী ৩০ এপ্রিল। অন্যদিকে ইমারত আইনের মামলাটি ঢাকার অতিরিক্ত জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিচারাধীন। সর্বশেষ এই মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য ছিল গত ২০ এপ্রিল। ওইদিন আদালতে হাজির হননি কোনো সাক্ষী। এজন্য আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য করা হয়েছে।
মামলার সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সকাল ৯ টার দিকে ধসে পড়ে সাভারের রানা প্লাজা ভবন। এর নিচে চাপা পড়েন সাড়ে পাঁচ হাজার পোশাক শ্রমিক। ওই ঘটনায় উদ্ধার করা হয় ১ হাজার ১৩৬ জনের মরদেহ উদ্ধার। আহত ও পঙ্গু হন প্রায় দুই হাজার শ্রমিক। ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে জীবিত উদ্ধার করা হয় ২ হাজার ৪৩৮ জনকে। ওই ঘটনায় সাভার থানার উপপরিদর্শক (এসআই) ওয়ালী আশরাফ ভবন নির্মাণে ‘অবহেলা ও ত্রুটিজনিত হত্যা’ মামলা করেন। ২০১৫ সালের ২৬ এপ্রিল ভবন মালিক সোহেল রানাসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেন সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার বিজয়কৃষ্ণ কর। মামলার ৪১ আসামির মধ্যে মারা গেছেন চারজন। তাদের বাদ দিয়ে হত্যা মামলায় এখন আসামির সংখ্যা ৩৭ জন। এদের মধ্যে ২৫ জন জামিনে ও পলাতক রয়েছেন ১১ জন। একমাত্র আসামি সোহেল রানা রয়েছেন কারাগারে।
২০১৬ সালের ১৮ জুলাই আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দেন ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ এস এম কুদ্দুস জামান। একই ঘটনায় ইমারত নির্মাণ আইন না মেনে ভবন নির্মাণ করায় রাজউকের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. হেলাল উদ্দিন ওইদিন সাভার থানায় আরেকটি মামলাটি করেন। ২০১৫ সালের ২৬ এপ্রিল সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার বিজয়কৃষ্ণ কর ভবনের মালিক সোহেল রানাসহ ১৮ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। মামলায় সাক্ষী করা হয় ১৩৫ জনকে। ২০১৬ সালের ১৪ জুন আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোস্তাফিজুর রহমান।
ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সময় ২০১৩ সালের ২৯ এপ্রিল রানাকে গ্রেপ্তার করা হয় বেনাপোল থেকে। এর পর থেকেই কারাগারে আটক রয়েছেন রানা।
২০২২ সালে হাইকোর্টে জামিন চেয়ে আবেদন করেন সোহেল রানা। আবেদনের শুনানি নিয়ে আদালত রুল দেন। রুলের শুনানি শেষে ২০২৩ সালের ৬ এপ্রিল জামিন মঞ্জুর বলে রায় দেন হাইকোর্ট। এই জামিন স্থগিত চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষ আবেদন করেন। পরবর্তীতে ওই বছরের ৯ এপ্রিল হাইকোর্টের দেওয়া জামিন স্থগিত করেন আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত। ২০২৪ সালের ১৫ জানুয়ারি হাইকোর্টের দেওয়া জামিন স্থগিত করে, আদেশ বহাল রাখেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। একই সঙ্গে ছয় মাসের মধ্যে মামলাটি নিষ্পত্তি করার জন্য সংশ্লিষ্ট আদালতকে নির্দেশ দেন সর্বোচ্চ আদালত।
ইমারত আইনের মামলার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আদালতের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ইশতিয়াক হোসেন জিপুর ভাষ্য, মামলাটি সাক্ষ্য গ্রহণ পর্যায়ে থাকলেও এখন পর্যন্ত কারোর সাক্ষ্য সম্পন্ন হয়নি। সাক্ষীদের বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য পরোয়ানা পাঠানো হলেও তাদের আদালতে উপস্থিত করা যাচ্ছে না। এখানে আমাদের কোনো দায় নেই। সাক্ষী হাজিরের দায়িত্ব হচ্ছে পুলিশের। সাক্ষী না আসলে তো বিচার হবে না। তবে আমরা চেষ্টা করছি, দ্রুত সময়ে সাক্ষী নিয়ে মামলাটি নিষ্পত্তি করা হবে।
দুই মামলার উল্লেখযোগ্য আসামিরা হলেন— রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানা, মা মর্জিনা বেগম, সাভার পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কমিশনার হাজি মোহাম্মদ আলী, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক (আর্কিটেকচার ডিসিপ্লিন) এ টি এম মাসুদ রেজা, প্রকৌশলী সাজ্জাদ হোসাইন, সাভার পৌরসভার সাবেক মেয়র মো. রেফাতউল্লাহ, সাভার পৌরসভার সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা উত্তম কুমার রায়, নির্বাহী প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম, সাবেক সহকারী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান, সাবেক উপসহকারী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান রাসেল, সাভার পৌরসভার সাবেক টাউন প্ল্যানার ফারজানা ইসলাম, লাইসেন্স পরিদর্শক মো. আব্দুল মোত্তালিব, পৌরসভার সাবেক সচিব মর্জিনা খান, সাবেক সচিব মো. আবুল বাশার, ফ্যান্টম অ্যাপারেলস লিমিটেডের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আমিনুল ইসলাম, নিউ ওয়েব বটমস লিমিটেডের এমডি বজলুস সামাদ ও ইথার টেক্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান মো. আনিসুর রহমান।

