ফুটবলের এত ভক্ত প্রযোজক মেলে না কেন

‘জাগো’ সিনেমার অভিনয়শিল্পীরা- ইন্টারস্পিড
ফুটবল বিশ্বকাপ এলেই বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ে উৎসবের আবহ। এবারও রাজধানী থেকে গ্রামাঞ্চল সবখানেই ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেনসহ বিভিন্ন দেশের পতাকা উড়তে দেখা যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, টেলিভিশন এবং চায়ের আড্ডায় ফুটবল এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। এত বিপুল জনপ্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও দেশে ফুটবল নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্র শুধু দুটি! খিজির হায়াত খানের ‘জাগো’ ২০১০ সালে এবং রায়হান রাফীর ‘দামাল’ মুক্তি পেয়েছে ২০২২ সালে।
এ প্রসঙ্গে পরিচালক শিহাব শাহীন বললেন, ‘ফুটবল নিয়ে সিনেমা নির্মাণ করা অনেক খরচের ব্যাপার। খেলোয়াড়দের প্রচুর বিদেশ ট্যুর থাকে। তাদের কাউকে নিয়ে সিনেমা বানালে ট্যুরের অংশ না দেখালে বিশ্বাসযোগ্য মনে হবে না। আমি একজন খেলোয়াড়ের বায়োপিক তৈরির জন্য অনেক দিন আগেই অনুমতি নিয়ে রেখেছি; কিন্তু যথাযথ প্রযোজকের অভাবে সিনেমাটি বানাতে পারছি না।’
‘জাগো’র পরিচালক খিজির হায়াত খান বললেন, ‘খেলাধুলা নিয়ে চলচ্চিত্র বানানো খুবই কঠিন। এজন্য ধৈর্য ও সময় লাগে। শিল্পীদেরও প্রশিক্ষিত হতে হয়। আমাদের জনপ্রিয় শিল্পীদের হাতে অত সময় থাকে না। ‘জাগো’র সময় আরিফিন শুভ, রওনক হাসান, এফ এস নাঈমসহ সবাইকে দীর্ঘ সময় ধরে প্রশিক্ষণ নিতে হয়েছে। এখন ব্যস্ত তারকারা ছয় মাস প্রশিক্ষণের জন্য ইচ্ছা থাকলেও সময় দিতে পারবে না। সেক্ষেত্রে নতুনদের নিয়ে বানানোর অপশন আছে; কিন্তু নতুনদের নিয়ে সিনেমা বানিয়ে ব্যবসা করা খুবই কঠিন।’
১৯৭১ সালের জুনে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে গঠিত স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের গল্পে অনুপ্রাণিত ‘দামাল’ পরিচালনার অভিজ্ঞতা জানালেন রায়হান রাফি। তিনি বললেন, ‘আমরা স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের কয়েকজনের সঙ্গে দেখা করেছি। তখন জার্সি ও ফুটবল কেমন ছিল, সেসব খুঁজেছি; কিন্তু দেশে অনেক কিছুই নেই। যে পতাকা ওড়ানো হয়েছিল সেটি খুঁজেও পাইনি। প্রায় দুই বছর এসব বিষয় নিয়ে গবেষণা করেছি। ফুটবল-ক্রিকেট আমাদের এত পরিচিত খেলা, এ নিয়ে কিছু ভুল করলে হাস্যকর লাগতে পারে। অনেকে হয়তো এজন্য চ্যালেঞ্জ নিতে চায় না।’
প্রযোজক শাহরিয়ার শাকিল বললেন, ‘বাজেট তো পরের ব্যাপার। আগে ভালো গল্প চাই। যে গল্প মানুষের কথা বলবে, দেশের কথা বলবে। ‘লগান’ যেমন ক্রিকেট নিয়ে সিনেমা; কিন্তু এটি সামগ্রিক অর্থে একটি দেশের হয়ে উঠেছিল, একটা বার্তা পেয়েছে সবাই। এমন গল্প নিয়ে আমাদের দেশে সিনেমা হতেই পারে। আমিও বানাতে পারি।’
একই অভিমত জানালেন মধুমিতার স্বত্বাধিকারী ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ। তিনি বললেন, ‘১৬ বছর আগে মধুমিতা প্রেক্ষাগৃহে ‘জাগো’র প্রিমিয়ার হয়েছিল। তখন এটি মোটামুটি চলেছিল। আমার মনে হয়, ভালো গল্প থাকলে ফুটবল নিয়ে সিনেমা যেকোনো সময় চলতে পারে। আমাদের চেষ্টা থাকতে হবে।’
শিহাব শাহীন মনে করেন, ফুটবল নিয়ে সিনেমা বড় পর্দায় দেখতে দর্শকের অত বেশি আগ্রহ আছে বলে প্রযোজকরা এখনো বিশ্বাস করতে পারছেন না। তবে তার দৃষ্টিতে, ‘ধীরে ধীরে বিভিন্ন ঘরানার সিনেমার দর্শক তৈরি হচ্ছে দেশে। ফলে অনুপ্রেরণাদায়ক মুভির সংখ্যা দিন দিন বাড়বে।’
‘দামাল’ সিনেমায় শরিফুল রাজকে দেখা যায় স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের অধিনায়কের চরিত্রে। তার নাম মুন্না। বাস্তবজীবনে ব্রাজিলের সমর্থক রাজ পছন্দ করেন রোনালদিনহোর খেলা। সিনেমার শুটিংয়ের আগে তিন-চার মাসের ফুটবল প্রশিক্ষণ নেন তিনি। তার কথায়, ‘এমনও হয়েছে, আমাদের বুটের নিচের স্পাইক গলে যেত। প্রতিদিন অন্তত ৫ ঘণ্টা মাঠে থাকতে হতো। দৌড়ের মধ্যে থেকে একসময় বমি চলে এসেছে। আমাদের সবার জন্যই এটি শারীরিকভাবে অনেক চ্যালেঞ্জিং ছিল।’
‘দামাল’ সিনেমার আরেক অভিনেতা সিয়াম আহমেদ বললেন, ‘ফুটবল ভালো লাগলেও বাস্তবে খেলেছি বেশি ক্রিকেট। এ কারণে ফুটবল খেলা শেখার জন্য প্রশিক্ষণ নিতে হয়েছে। আমাদের কোচ ছিলেন মিনার স্যার। তিনি আমাদের মাসখানেক প্রশিক্ষণ দেন। মিনার স্যারের সঙ্গে আমার যতদূর মনে পড়ে প্রায় ২ হাজারের ওপর ফ্রিকিক প্র্যাকটিস করেছি। দর্শক দেখেছে একটি শট।’
সিয়াম মনে করেন, ‘সিনেমায় আমি যার চরিত্রে অভিনয় করেছি, তিনি এখনো বেঁচে আছেন। আমাদের প্রায় সবারই পরিচিত। ফুটবলে এমন অনেক কীর্তিমান আছেন, যাদের নিয়ে সিনেমা হতে পারে।’
খেলাধুলা নিয়ে আবারও সিনেমা বানালে ‘আবার জাগো’ নাম রাখবেন বলে জানালেন খিজির হায়াত খান। তার অভিজ্ঞতায়, ‘প্রযোজকই পাচ্ছিলাম না ‘জাগো’ বানাতে। শুরুতে বাজেট ২ কোটি টাকা ছিল না। শুটিংয়ে যাওয়ার পর এই অঙ্ক ব্যয় হয়েছে। আমরা ৬৭ দিন শুটিং করেছি। গরমের মধ্যে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ছিল। তখন সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল ডিজিটাল ক্যামেরার অভাব। দেশে স্টেডিয়াম ছিল একটি। ফলে সিনেমার মাত্র একটি অংশে ব্যবহার করতে পেরেছি। খেলার সিনেমার জন্য বারবার মাঠে দর্শক দেখাতে হয়। বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে প্রায় ৩০ হাজার দর্শক বসানো যায়। শুটিংয়ে আমার তো কমপক্ষে ৩ হাজার দর্শক লাগবে। ভিএফএক্সের দক্ষতাও তখন ছিল না। তখন ভারতে যেতে হয়েছে। পোস্ট-প্রোডাকশনেই খরচ হয়েছে অনেক। এখন পোস্ট-প্রডাকশনে অনেক উন্নত হয়েছে দেশ।’
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, নির্মাতাদের সদিচ্ছা থাকলে ফুটবলভিত্তিক সিনেমা দেশীয় চলচ্চিত্রে নতুন একটি ধারা তৈরি করতে পারে। কোটি মানুষের আবেগের এই খেলা বড় পর্দায় সফলভাবে তুলে ধরতে পারলে যেমন বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক হতে পারে, তেমনি দেশের ফুটবল সংস্কৃতিকে নতুনভাবে উদযাপনের সুযোগ সৃষ্টি করবে।





