বৈশাখে শ্রাবণের ধারা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কয়েক দিন ধরে রাজধানীর আকাশে চলছে রোদ-বৃষ্টির খেলা। আর এতে অনুভূত হয়েছে ভ্যাপসা গরম। ঠিক এ সময়ে বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপে ঢাকাসহ দেশের বেশিরভাগ অঞ্চলে হচ্ছে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টি। ্আর এতে অস্বস্তির পর স্বস্তি এসেছে জনজীবনে।
শুধু স্বস্তিই নয়, জলাবদ্ধতাও দেখা দিয়েছে দেশের বিভিন্ন শহরে। এতে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছে খেটে খাওয়া মানুষ। ফুটপাত ও খোলা আকাশের নিচের বাসিন্দারা পড়েছে চরম বিপাকে।
এদিকে টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে গত কয়েক দিনের তুলনায় আরও অবনতি হয়েছে হাওরাঞ্চল। সেখানে প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে ফসলি জমি।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, হাওর এলাকার সুরমা, কুশিয়ারা, ধনু, বাউলাই, ভোগাই ও কংস নদীতে পানি বেড়েছে। আগামী তিন দিন বাড়তে পারে আরও এই পানি। একই সঙ্গে হাওরাঞ্চলে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির আভাস থাকায় সেখানে দেখা দিয়েছে বন্যার আশঙ্কা। এমনটিই পূর্বাভাস আবহাওয়া অধিদপ্তরের।
এর মধ্যেই টানা বর্ষণে সুনামগঞ্জের মধ্যনগরে মঙ্গলবার ভোরে বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকেছে ইকড়ছই হাওরে। এতে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় প্রায় ৬৪ হেক্টর জমির বোরো ধান। এমন অবস্থায় খোলা হয়েছে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিজ্ঞপ্তি, হাওর অঞ্চলের সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও নেত্রকোনার নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চলে হতে পারে বন্যা। তাই নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এ নিয়ন্ত্রণ কক্ষ চালু থাকবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের অন্যতম প্রধান ‘ফুড বাস্কেট’ হাওর অঞ্চল। দেশের উৎপাদিত চালের ৩০ শতাংশ আসে সেখান থেকে। বোরো মৌসুমে পাহাড়ি ঢল বা অতিবৃষ্টিতে ব্যাপক ক্ষতি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় কৃষক, বাড়ে চালের দাম। প্রভাব পড়ে সব মানুষের ওপর।
এ সময়ে বৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক। বৈশাখ মাসে কালবৈশাখী হবেই। এ সময় ঝড়ের সঙ্গে ভারী বৃষ্টিপাতও হয়। তবে প্রতিবছর একই রকম হয় না। কোনো বছর বেশি হয়, কোনো বছর কম। আবহাওয়াবিদ এ কে এম নাজমুল হক এমনটিই বলছিলেন আগামীর সময়কে। তার মতে, গত কয়েক বছরের তুলনায় এ বছর বৃষ্টিপাত কিছুটা বেশি হয়েছে। আগামী মে মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টিপাত বেশি হতে পারে। এরপরও বৃষ্টি হবে। তবে পরিমাণ কমে আসবে ধীরে ধীরে।
এ সময়ে তাপমাত্রা খুব বেশি বাড়ার সম্ভাবনাও নেই জানিয়ে এই আবহাওয়াবিদের অভিমত, বৃষ্টিপাত চলমান থাকায় আবহাওয়া তুলনামূলকভাবে ঠান্ডা ও মেঘাচ্ছন্ন থাকবে। আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত তাপমাত্রা বেশি বাড়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।
‘কেন এ বছর এ সময়ে বৃষ্টি বেশি হচ্ছে?’ এ কথায় বজলুর রশিদের অভিজ্ঞতা, ১০ বছর পরপর প্রকৃতিতে এমন পরিবর্তন আসে, সেটা আবহাওয়ার প্যাটার্ন। তার দাবি, সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে ২০২৪ সালের এপ্রিল ছিল উষ্ণতম। এটি শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের সবচেয়ে উষ্ণ বছরগুলোর একটি ছিল ওই বছরের এপ্রিল। দক্ষিণ এশিয়া থেকে শুরু করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো দেখেছিল আবহাওয়ার ভয়াবহ রূপ। ওই সময় টানা ৩০-৩৫ দিনের মতো তাপপ্রবাহ ছিল বিস্তীর্ণ অঞ্চলে।
বজলুর রশিদের বিশ্লেষণ, এটা শুধু গ্লোবাল ফ্যাক্টর নয়, কাজ করেছে লোকাল ফেনোমেনোও। নভেম্বরের পর থেকে মার্চের শুরু পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত হয়নি। তাই তৈরি হয়েছে ড্রাই কন্ডিশন। বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে এই আবহাওয়াবিদের ভবিষ্যদ্বাণী, ‘এখন যে বৃষ্টি হচ্ছে, এটা হয়তো থাকবে আরও কিছুদিন। এরপর আবার আবহাওয়া শুষ্ক হবে, বাড়বে তাপমাত্রা।’
আবহাওয়া অধিদপ্তরের ৫১টি স্টেশনের বৃষ্টিপাতের তথ্যের গড় করে দেখা গেছে, মঙ্গলবার সারা দেশে ৩২ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। এ সময় উত্তরের দিকে তুলনামূলক কম বৃষ্টি হলেও ভারী বর্ষণ হয়েছে উপকূলে। শুধু ভোলাতেই হয়েছে ১৫২ মিলিমিটার বৃষ্টি।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাসে বলা হয়, বুধবার রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় এবং খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা বা ঝোড়ো হাওয়া ও বিদ্যুৎ চমকানোসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হতে পারে।



