‘কার্ড হোল্ডার পিস্তল’
আকারে ছোট কিন্তু ভয়ংকর
- বাড়ছে নিরাপত্তাঝুঁকি
- গোপন চেম্বারে রাখা যায় ৪ রাউন্ড গুলি

একটি ছোট্ট কার্ড কেস। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড কিংবা ব্যবসায়িক কার্ড রাখার সাধারণ হোল্ডার। পকেট বা মানিব্যাগে থাকা এমন একটি বস্তু দেখে কারও সন্দেহ হওয়ার কথা নয়। অথচ সেই নিরীহ খোলসের আড়ালেই লুকিয়ে থাকতে পারে ভয়ংকর এক আগ্নেয়াস্ত্র। মুহূর্তেই ভাঁজ খুলে সেটি হয়ে উঠতে পারে পিস্তল।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘ট্রেইলব্লেজার ফায়ার আর্মস’ কোম্পানির তৈরি অত্যাধুনিক ক্ষুদ্রাকৃতির ‘লাইফ কার্ড’ পিস্তল উদ্ধারের পর এমনই নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে। গত ১৪ আগস্ট রাতে কেরানীগঞ্জে র্যাবের অভিযানে কিশোর গ্যাং সদস্যের কাছ থেকে পয়েন্ট ২২ ডব্লিউএমআর ক্যালিবারের এই ফোল্ডিং সিঙ্গেল-শট পিস্তল উদ্ধারের ঘটনা দেশে প্রথম বলে জানিয়েছে র্যাব। অস্ত্রটি এতটাই অস্বাভাবিক ও ছদ্মবেশী যে, শুরুতে এটি কীভাবে খুলতে বা ব্যবহার করতে হয়, তা বুঝতেই র্যাব সদস্যদের বেগ পেতে হয়েছে।
এর আগে কলমের মতো দেখতে ‘পেনগান’ উদ্ধারের ঘটনায় উদ্বেগ ছড়িয়েছিল। এবার কার্ড হোল্ডারের আদলে তৈরি আরও আধুনিক অস্ত্র উদ্ধারের পর প্রশ্ন উঠেছে— অপরাধীদের হাতে এমন কত অস্ত্র এর মধ্যে পৌঁছে গেছে?
অভিযানেই ধরা পড়ে ‘কার্ড হোল্ডার পিস্তল’: র্যাব সূত্রে জানা গেছে, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গত ১৪ আগস্ট রাতে র্যাব-২ কেরানীগঞ্জ মডেল থানাধীন শাক্তা ইউনিয়ন ও খোলামোড়া এলাকায় অভিযান চালায়। এ সময় শাক্তা ইউনিয়নের কোলচর এলাকা থেকে কিশোর গ্যাং সদস্য হৃদয়কে আটক করা হয়। তার কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় একটি বিদেশি ‘লাইফ কার্ড’ পয়েন্ট ২২ ডব্লিউএমআর ফোল্ডিং সিঙ্গেল-শট পিস্তল এবং এক রাউন্ড গুলি।
তবে অভিযানে সবচেয়ে বেশি কৌতূহল ও উদ্বেগের জন্ম দেয় হৃদয়ের কাছ থেকে পাওয়া ছোট্ট পিস্তলটি। দেখতে সাধারণ কার্ড কেসের মতো হওয়ায় শুরুতে র্যাব সদস্যরাও বুঝতে পারেননি এটি আসলে আগ্নেয়াস্ত্র।
র্যাব-২-এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি নয়মুল হাসান বললেন, ‘প্রযুক্তিগতভাবে আধুনিক ও ক্ষুদ্রাকৃতির এই অস্ত্রটি দেশে আমরা প্রথম উদ্ধার করলাম। এটা অপারেট করা কিংবা ডিসম্যান্ডেল করার ব্যাপারে আমাদের ধারণাও ছিল না। অনেকক্ষণ স্টাডি করার পর দেখলাম এটা ওপেন করা যায় এবং এর ভেতরে লাইভ বুলেট আছে। খালি চোখে চট করে দেখলে কেউ বুঝতে পারবে না যে, এটি পিস্তল।’
তার ভাষ্য, একই ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র আর কারও কাছে রয়েছে কি না, সে বিষয়ে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
ছোট্ট খোলস, বড় উদ্বেগ: তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানালেন, যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি এই ‘লাইফ কার্ড’ মূলত একটি ভাঁজ করা পিস্তল। আকারে ছোট এবং ওজনে হালকা হওয়ায় এটি সহজে পকেট বা অন্য সাধারণ বহনযোগ্য জিনিসের সঙ্গে আড়াল করা যায়। ভাঁজ করা অবস্থায় এর চেহারা অনেকটাই সাধারণ কার্ড হোল্ডারের মতো।
পিস্তলটি পয়েন্ট ২২ উইনচেস্টার ম্যাগনাম রিমফায়ার (.২২ WMR) কার্তুজ ব্যবহার করে এবং এটি একবারে একটি গুলি ফায়ারের উপযোগী। এর নকশার মূল বৈশিষ্ট্যই হলো, ভাঁজ করা অবস্থায় অস্ত্র হিসেবে সহজে শনাক্ত না হওয়া। এ কারণেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উদ্বেগ বেশি।
পেনগানের পর নতুন আতঙ্ক: এর আগে কেরানীগঞ্জ এলাকা থেকেই কলমের মতো দেখতে ‘পেনগান’ উদ্ধার করেছিল ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ— ডিবি। স্বল্প দূরত্বে গুলি ছোড়ার উপযোগী এই অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসে।
গত ৩ এপ্রিল রাতে রাজধানীর পুরান ঢাকার নয়াবাজার পার্ক এলাকায় যুবদল নেতা রাসেলকে লক্ষ্য করে গুলি চালায় দুর্বৃত্তরা। পরে রাসেলকে গুলির ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে সায়মন ও সোহেল ওরফে কাল্লুকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কেরানীগঞ্জ থেকে উদ্ধার করা হয় কলমের মতো দেখতে ‘পেনগান’। জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানিয়েছিল, প্রায় ৮০ হাজার টাকায় অস্ত্রটি সংগ্রহ করা হয়েছিল।
এবার সেই পেনগানের পর কার্ড হোল্ডারের ছদ্মবেশে আধুনিক অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় গোয়েন্দাদের উদ্বেগ আরও বেড়েছে। কারণ প্রচলিত পিস্তল বা রিভলবারের তুলনায় এসব অস্ত্রের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্যই হলো— এগুলোকে সহজে অস্ত্র বলে চেনা যায় না।
কোথা থেকে আসছে এসব অস্ত্র?: অপরাধ বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, উদ্ধার হওয়া অস্ত্রটি যদি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা না হয়ে থাকে, তাহলে বাজারে একই ধরনের আরও অস্ত্র থাকতে পারে। সহজে বহনযোগ্য এবং দ্রুত আড়াল করা যায়— এমন আগ্নেয়াস্ত্র অপরাধী চক্রের হাতে ছড়িয়ে পড়লে তা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী বললেন, ‘বাজারে এমন অস্ত্রের সংখ্যা একটি বা দুটি নয়; বরং অনেক বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সন্ত্রাসীদের হাতে অবৈধ ও নতুন ধরনের আগ্নেয়াস্ত্রের উপস্থিতি এবং এর ব্যবহার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও বিচারহীনতার সংস্কৃতির ফল।’
তার মতে, দ্রুত এসব অস্ত্রের অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং উৎস বন্ধ করা না গেলে তা জননিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। শুধু বিচ্ছিন্ন বা লোকদেখানো অভিযান নয়, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে সমন্বিত ও কার্যকর অভিযান প্রয়োজন বলেও তিনি মনে করেন।






