পোশাকশ্রমিকদের সহিংস বিক্ষোভ থামেনি, সংঘর্ষে আহত ৫০

নিহত পোশাকশ্রমিক তৌফিকের গায়েবানা জানাজার আয়োজন করে এনসিপি। তবে শুরুর আগেই পুলিশের সাউন্ড গ্রেনেডে ছত্রভঙ্গ। গতকাল গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তায়- শামীম-উস-সালেহীন
টানা পঞ্চম দিনের মতো গতকাল বুধবারও উত্তাল ছিল দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল। শ্রমিক অসন্তোষ কেন্দ্র করে আবার উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে ঢাকার সাভার, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে। শ্রমিকরা সড়ক অবরোধ করলে বাধা দেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। একপর্যায়ে বেধে যায় সংঘর্ষ, চলে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের ছোড়া ইটপাটকেলের জবাবে টিয়ার গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়ে পুলিশ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে মোতায়েন করা হয়েছে ২৪ প্লাটুন বিজিবি এবং এসআরবি সদস্যদের। পুলিশের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে কাজ করছেন তারা।
ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ, ছাঁটাই করা শ্রমিকদের পুনর্বহাল ও আন্দোলনকারীদের কালোতালিকাভুক্তি বন্ধের দাবিতে গত রবিবার থেকে উত্তপ্ত রাজধানীর মিরপুরসহ দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল। এ ঘটনায় সরকার মজুরি বোর্ড গঠন করলেও থামেনি শ্রমিকদের আন্দোলন।
তবে পোশাকশিল্পে চলমান সহিংসতাকে স্বাভাবিক শ্রমিক আন্দোলন নয়, বরং দেশকে অস্থিতিশীল করার পরিকল্পিত রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, সাধারণ শ্রমিকদের ব্যবহার করে শিল্প খাতে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে রাজনৈতিক স্বার্থান্বেষী মহল। শ্রমিক আন্দোলনের নামে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে বহিরাগত ও অশ্রমিকরা।
এদিকে গতকাল পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন ঘিরে রাজধানীর মিরপুরের বিভিন্ন সড়কে মোতায়েন করা হয় অতিরিক্ত পুলিশ। একই সঙ্গে আন্দোলন দমনে বিভিন্ন সড়কে দফায় দফায় মিছিল করেছেন বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। ফলে শ্রমিকদের সড়কে দেখা যায়নি এবং পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। তবে সাভার ও গাজীপুরে দফায় দফায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে ও পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় বিক্ষোভ করেন কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা। দুপুরের পর থেকে এসব শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে থাকে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
সাভারে পুলিশের গাড়িতে আগুন
পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভ কেন্দ্র করে সাভারে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষ, পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও টিয়ার গ্যাসের শেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেন বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা। সংঘর্ষে পুলিশ, সাংবাদিকসহ অন্তত ৫০ জন আহত হয়েছেন। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য গিয়ে শ্রমিকদের মহাসড়ক থেকে সরিয়ে দিলে স্বাভাবিক হয় যান চলাচল। তবে সাভার ও আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চলে দুই শতাধিক পোশাক কারখানা বন্ধ রয়েছে।
সাভার প্রতিনিধি জানিয়েছেন, গতকাল সকাল ৯টার দিকে সাভারের হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ড ও পদ্মার মোড়, উলাইল ও আশুলিয়ার বিভিন্ন এলাকায় পোশাক কারখানার শ্রমিকরা জড়ো হয়ে মহাসড়ক অবরোধ করেন। এতে প্রায় ২ ঘণ্টা যান চলাচল ব্যাহত হয়। অন্যদিকে সকাল থেকেই আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুর এলাকার কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা কর্মবিরতি পালন করেন। এ পরিস্থিতিতে বেলা ১১টার দিকে নিশ্চিন্তপুর এলাকায় নিউ এইজ, আল-মুসলিম, ট্রাউজার লাইনসহ অন্তত ২০টি পোশাক কারখানার কর্তৃপক্ষ সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। ছুটি পেয়ে শ্রমিকরা বেরিয়ে বাইপাইল-আব্দুল্লাহপুর সড়ক অবরোধের চেষ্টা করলে পুলিশ দ্রুত তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। দুপুর ১২টার দিকে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের সাভারের উলাইল এলাকায় পোশাকশ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশ ধাওয়া দিয়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। সাভার ও আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চলে পোশাকশ্রমিকদের অসন্তোষ ও আন্দোলনের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন অন্তত আট গণমাধ্যমকর্মী।
এ বিষয়ে শিল্প পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া জানালেন, দুপুরের পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে। সকালে বিভিন্ন পয়েন্টে বিচ্ছিন্ন কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলেও বর্তমানে শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। দুই শতাধিক পোশাক কারখানা আন্দোলনের কারণে বন্ধ রয়েছে। তবে শিল্পাঞ্চলে যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়ানো ও সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শিল্পাঞ্চলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
গাজীপুরে সকালে বিক্ষোভ, দুপুরের পর স্বাভাবিক
গাজীপুরে পাঁচ দিন ধরে চলা শ্রমিক অসন্তোষে গতকাল ৩০ থেকে ৩৫টি পোশাক কারখানা কর্তৃপক্ষ ছুটি ঘোষণা করেছে। শ্রমিকদের ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা বেতনের দাবিতে সকালে বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটে। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক এবং গাজীপুর চৌরাস্তা-জয়দেবপুর সড়কে পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। তবে দুপুর ১টার পর অধিকাংশ এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসে। সকাল ৯টা পর্যন্ত গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলের পরিবেশ শান্ত থাকলেও সকাল ১০টার দিকে ভোগড়া বাইপাস, বাসন সড়ক, কলম্বিয়া, ছয়দানা, মালেকের বাড়ি, সাইনবোর্ড ও জয়দেবপুরের তিনসড়ক এলাকায় শ্রমিকরা জড়ো হতে থাকেন। একপর্যায়ে তারা সড়কে অবস্থান নিয়ে যানবাহন চলাচলে বাধা সৃষ্টি করেন। পুলিশ আন্দোলনকারীদের সরিয়ে দিতে গেলে উভয়পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
বাসন থানার ওসি হারুন অর রশিদ জানালেন, মহাসড়ক ও জয়দেবপুর সড়ক অবরোধের চেষ্টা করলে পুলিশ আন্দোলনকারীদের সরিয়ে দেয়। গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার তাহেরুল হক চৌহান জানালেন, মহাসড়ক অবরোধের চেষ্টা করা ব্যক্তিদের ছত্রভঙ্গ করা হয়েছে। এ ঘটনায় কাউকে আটক করা হয়নি।
এদিকে পোশাকশ্রমিক নাজমা আক্তার বললেন, শ্রমিকরা সকালে কাজে যোগ দিলেও সকাল ১০টার পর বহিরাগতরা কারখানার সামনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলে মালিকপক্ষ কারখানা ছুটি ঘোষণা করে।
বাংলাবাজার এলাকায় লায়লা স্টাইলস লিমিটেডের শ্রমিক তৌফিক হোসেনের মৃত্যুর ঘটনায় ওই এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করে। সেখানে অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন এবং আশপাশের কারখানাগুলো ছুটি ঘোষণা করা হয়।
এ ঘটনায় গায়েবানা জানাজার আয়োজন করতে গিয়ে চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধাওয়ার মুখে পড়েন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাকর্মীরা। গতকাল দুপুরে আলী নাসের খানের নেতৃত্বে নেতাকর্মীরা সেখানে জড়ো হয়ে বক্তব্য দেন ও মোনাজাত করেন। পরে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এনসিপির আলী নাসের খান দাবি করেছেন, পুলিশের হামলায় অন্তত ২০ নেতাকর্মী আহত হন।
গাজীপুর শিল্পাঞ্চল-২-এর পুলিশ সুপার আমজাদ হোসাইন জানালেন, দুপুরের পর পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে আসে এবং সড়কে যানবাহন ও সাধারণ মানুষের চলাচল স্বাভাবিক হয়।
মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) হাসান মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার বলেছেন, সকাল থেকে মিরপুর-১১ নম্বর ও শিয়ালবাড়ী এলাকায় কয়েকবার শ্রমিকরা রাস্তায় নামার চেষ্টা করেছিল। আমরা তাদের বুঝিয়ে সরিয়ে দিয়েছি।
মিরপুরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ১০ হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (ভারপ্রাপ্ত) ক্রাইম প্রিভেনশন (উত্তর) মহিদুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। মিরপুর-১, পল্লবীর বিভিন্ন এলাকা, রূপনগর, মিরপুর-১২, কাফরুল রোডসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। সব মিলিয়ে ১০ হাজারের বেশি পুলিশ ফোর্স মোতায়েন রয়েছে।
নারায়ণগঞ্জেও শ্রমিকদের আন্দোলন
টানা তৃতীয় দিনের মতো গতকাল সড়কে নামেন নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা। সকাল ১০টার দিকে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সংযোগ সড়কের পাশে কুতুবআইল কাঠেরপুল এলাকায় মেট্রো গার্মেন্টের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন শ্রমিকরা। পুলিশ তাদের বেশ কয়েকটি সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ার গ্যাসের শেল ছুড়ে ছত্রভঙ্গ করে। আগে থেকেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কঠোর অবস্থানে ছিলেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও প্রশাসন) তারেক আল মেহেদী বললেন, শ্রমিকরা মূল সড়কে ওঠার চেষ্টা করলে তাদের আমরা মজুরি বোর্ড গঠন হয়েছে এবং সিদ্ধান্ত একটা আসবে জানিয়ে নিবৃত করার চেষ্টা করি। কিন্তু তারা না শোনায় পরে তাদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ার গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়া হয়। কয়েকজনকে আটকও করা হয়েছে।



