ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক
জমি অধিগ্রহণেই ১০ বছর
- ২০২৬-এ নির্মাণ শেষ হওয়ার কথা, ২০২৯ সালে ঠেকবে
- প্রস্তুত হচ্ছে সময় বাড়ানোর প্রস্তাব
- থমকে রয়েছে পরিষেবা লাইন সরানোর কাজ
- পুরনো নকশায় জটিলতা, সংশোধিত নকশাও পায়নি অনুমোদন

ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক— সংগৃহীত
চলতি বছর শেষ হওয়ার কথা ছিল ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের নির্মাণকাজ; কিন্তু কাজে তেমন গতি নেই। পরিকল্পনার সঙ্গে মিল রেখে পাওয়া যাচ্ছে না জমি। সরানো যাচ্ছে না পরিষেবা লাইন। সড়কের জন্য জমি পেতেই লেগে যাচ্ছে ১০ বছর। জমি অধিগ্রহণের জন্য আলাদা প্রকল্প করেও হয়নি লাভ। আবার প্রকল্পে কী কী থাকবে, কী বাদ যাবে— তাও যেন অনেকটা চূড়ান্ত নয়। নকশায়ও লেগে রয়েছে জটলা। সংশোধিত নতুন নকশাও পায়নি অনুমোদন। এতকিছুর মধ্যে শেষ হওয়ার পথে প্রকল্পের মেয়াদ। নতুন করে সময় বাড়ানোর প্রস্তাব প্রস্তুত হচ্ছে। অনুমোদন পেলে প্রকল্পের কাজ গিয়ে ঠেকবে অন্তত ২০২৯ সালে।
ঢাকা থেকে সিলেট পর্যন্ত ২০৯ কিলোমিটার মহাসড়কটি ছয় লেনে উন্নীত করার কাজ শুরু হয় ২০২১ সালে। চলতি বছরের মধ্যে তা শেষ হওয়ার কথা। সড়কের জন্য জমি অধিগ্রহণ করতে আলাদা একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। সেটি শুরু হয় আরও আগে, ২০১৮ সালে। ২০২৩ সালের মধ্যে জমি অধিগ্রহণ শেষ হওয়া কথা ছিল। না হওয়ায়, দুদফা সময় বাড়ে। ২০২৫ সালের পর এখন নতুন মেয়াদ ২০২৭ সাল। জমি অধিগ্রহণে সরকারের খরচ ধরা হয় ৭ হাজার ৯৭৫ কোটি ৩১ লাখ টাকা। এটি মূল প্রকল্পের বাইরে আলাদা খরচ। সড়কের নির্মাণকাজকে ভাগ করা হয়েছে ছয়টি ভাগে। সব ভাগের জন্য আলাদাভাবে নিয়োগ পেয়েছেন ঠিকাদার; কিন্তু কাজ এগোচ্ছে না।
মূল প্রকল্প প্রস্তাবে ৬৬টি সেতু, ৩০৫টি কালভার্ট, ৮টি ওভারপাস, ২৬টি ফুটওভারব্রিজ, ৩৭টি ইউটার্ন ও ৮টি গোলচত্বর (রাউন্ড অ্যাবাউট) নির্মাণ করার কথা। মহাসড়কের মূল চার লেনের প্রস্থ হবে ৭ দশমিক ৩ মিটার। সঙ্গে থাকবে সাড়ে ৫ মিটার প্রস্থের পার্শ্ব সড়ক (সার্ভিস লেন)। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ঋণে হতে যাওয়া এই মহাসড়কের খরচ ধরা হয়েছে ১৬ হাজার ৯১৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ঋণের টাকা ১৩ হাজার ২৪৪ কোটি। বাকি টাকা দেবে সরকার।
প্রকল্পের সর্বশেষ অগ্রগতির তথ্য বলছে, ৮০ কিলোমিটার এলাকায় চলছে সড়ক বাঁধ নির্মাণকাজ। চলমান রয়েছে ৬২টি সেতু, ৯টি উড়ালসড়ক ও ১৯৮টি কালভার্টের কাজ। শেষ হয়েছে ১০০টির বেশি কালভার্ট নির্মাণ।
এখন মূলত কাজ আটকে রয়েছে জমি অধিগ্রহণে। দীর্ঘ এই মহাসড়কে একাধিক জেলা থেকে জমি পেতে বেগ পেতে হচ্ছে। পুরো সড়কের কাজ শেষ করতে মোট ১ হাজার ৩৩ একর জমি অধিগ্রহণ করতে হবে। সাত জেলা মিলিয়ে প্রায় ৮৩০ একর জমি অধিগ্রহণের কাজ চলছে। যদিও প্রকল্প কর্তৃপক্ষ বুঝে পেয়েছে মাত্র ২৭৭ জমি। এর মধ্যে পাওয়া গেছে নরসিংদীতে ১৫৮ একরের মধ্যে ৩৪, হবিগঞ্জে ৩০৩ একরের মধ্যে ৯০ এবং সিলেটে ২৫৫ মধ্যে মাত্র ৪৯ একর। তবে কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও মৌলভীবাজারে প্রায় পুরো জমি এবং নারায়ণগঞ্জে ৮০ শতাংশ জমির দখল পেয়েছে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। আবার প্রকল্পে ভূমি অধিগ্রহণে সবচেয়ে বেশি জটিলতা হবিগঞ্জ ও সিলেটে। জমি বুঝে না পাওয়ায় সেখানে গ্যাস ও বিদ্যুতের মতো পরিষেবার লাইন সরানো যাচ্ছে না।
পরিস্থিতি নিয়ে আগামীর সময়ের সঙ্গে কথা বলেছেন প্রকল্প পরিচালক এ কে এম ফজলুল করিম। তিনি বলছিলেন, ‘জমি অধিগ্রহণ ও ইউটিলিটি হস্তান্তরে অনেক বেগ পেতে হয়েছে। এ দুই কারণেই মূলত প্রকল্প বেশি পিছিয়ে গেছে। মেয়াদ বাড়ানোর জন্য প্রস্তাব তোলা হচ্ছে। ২০২৯ সাল পর্যন্ত সময় চাওয়া হবে। প্রকল্পে যদি নতুন করে কিছু যুক্ত করা না হয়, তাহলে খরচ বাড়বে না।’
যদিও প্রকল্প সূত্র বলছে, খরচ বাড়বে। তবে কতটা বাড়বে সেটি নির্ধারণ হবে প্রকল্পে স্থাপনার ধরনে কতটা পরিবর্তন হচ্ছে তার ওপর। বর্তমান নকশায় সেফ ক্রসিং, সেফ ইউটার্ন, আন্ডারপাস ও ওভারপাস যুক্ত করার আলোচনা তৈরি হয়েছে। নতুন এসব স্থাপনা যুক্ত করতে গেলে ব্যয় বাড়বে।
এদিকে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিবিড় সমীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে ‘সাউথ এশিয়া সাব-রিজিওনাল ইকোনমিক কো-অপারেশনের (সাসেক) এ প্রকল্পটি ভুগছে ভুল নকশার কারণে। সম্প্রতি প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৯ সালে সম্ভাব্যতা যাচাই করার সময় প্রকল্প পথে গ্যাস, বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন ইউটিলিটি কোথায় কেমন অবস্থায় আছে, তা সঠিকভাবে তুলে ধরা হয়নি। এমনকি অনেক জায়গায় সড়ক নির্মাণের জন্য মাটি উপযুক্ত নয়। মাটি উপযুক্ত করতে গিয়ে সময় বাড়ছে। আবার কয়েকবার নকশা পরিবর্তন করতে হচ্ছে।
ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের দুর্গতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বলেছেন, ‘কাজ শুরু হওয়ার আগেই প্রকল্প শুরু করে দেওয়া একটা বড় সমস্যা। এখানে জমি অধিগ্রহণের জন্য আলাদা প্রকল্প নিয়েও কোনো লাভ হলো না। এ কারণেও দুদফা সময় বেড়েছে। আমাদের উচিত জমির কাজ পুরোপুরি শেষ করার পর মূল প্রকল্প শুরু করা। তা না হলে ঋণের সময় বেড়ে যায়। খরচ বেড়ে যায়।’





