খুন ৩৬

ঈদ মানে আনন্দ, ঈদ মানে খুশি— এটা হয়তো সবার জন্য হয়নি। ঈদ ছুটির সাত দিনে হত্যার শিকার হয়েছে ৩৬ জন। প্রতিটি প্রাণনাশের প্রাথমিক কারণ— ক্রোধ, বিরোধ, প্রতিহিংসা। একটু এদিক-ওদিক হলেই হত্যাকাণ্ড? বিশ্লেষকদের ভাষায়, সামাজিক আস্থাহীনতা, অবক্ষয়, মানবিকতা ও মূল্যবোধের অভাবেই এমন খুনাখুনি। যে যাই বলুক, তাদের পরিবার-স্বজন হারানোর শোক সইবে কীভাবে?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, পারিবারিক অশান্তি, পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে সামাজিক কাঠামো ভেঙে পড়ছে, যা ছোটখাটো ঘটনা থেকে বড় অস্থিরতা এবং পর্যায়ক্রমে হত্যাকাণ্ডে রূপ নিচ্ছে।
‘গ্লোবালাইজেশনের প্রভাবে আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ ও পারিবারিক বন্ধন ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। ফলে সম্পর্কের ভেতরে জমে থাকা রাগ, হতাশা, হীনম্মন্যতা কিংবা দ্বন্দ্ব অনেক সময় ভয়ংকর সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে’— যোগ করলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মুহাম্মদ মাহবুব কায়সার।
এ ছাড়া প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হলে অপরাধীরা কিছুটা হলেও ভয় পাবে বলে বিশ্বাস পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক নূর মোহাম্মদের।
সারা দেশে ঈদের ছুটির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত (২৫ থেকে ৩১ মে) ঘটেছে এসব হত্যাকাণ্ড ও মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা। এর মধ্যে শুধু রাজধানীতেই পাওয়া গেছে ১০টি মরদেহ। গত ২৭ মে যাত্রাবাড়ীর মাতুয়াইল ঠাকুরবাড়ী এলাকার একটি বাসা থেকে শ্রাবণী আক্তার পলি (২৮) নামের এক গৃহিণীর গলায় ফাঁস দেওয়া মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
এর আগে ২৬ মে রাতে দক্ষিণ বাড্ডা দারোগাবাড়ি এলাকায় পাওয়া যায় মামুনুর রশিদ (৩৫) নামের এক চাকরিজীবীর ঝুলন্ত মরদেহ। ২৮ মে পূর্ব রামপুরা অগ্নিশিখা গলির একটি বাসায় মেলে আবদুল্লাহ (২৪) নামের আরেক যুবকের ঝুলন্ত মরদেহ।
২৯ মে সন্ধ্যায় ভাটারা থেকে উদ্ধার করা হয় পূর্ণিমা আক্তার (২৫) নামের এক গৃহিণীর মরদেহ। স্বামী শ্বাসরোধে তাকে হত্যা করার পর শিশুসন্তান নিয়ে পালিয়ে গেছেন বলে জানা গেছে। একই দিন মনির গাজী (২৪) নামের এক যুবকের ঝুলন্ত মরদেহ পেয়েছে ওই থানার পুলিশ। ওইদিন কামরাঙ্গীরচরের পশ্চিম আশ্রাফাবাদ এলাকা থেকে আরেকটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায় এনামুল ওরফে সুমন (২৫) নামের এক রিকশাচালককে।
ডেমরা মেন্দিপুর আমান মার্কেট এলাকায় ২৮ মে নিজ বাড়ির পাশে পানিতে পাওয়া যায় অয়ন্তী নামের দুই বছরের শিশুর মরদেহ। আগের দিন পান্থপথে বসুন্ধরা শপিং কমপ্লেক্স থেকে পড়ে মৃত্যু হয় এক যুবকের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের সামনের ফুটপাত থেকে ২৮ মে উদ্ধার করা হয় অজ্ঞাতপরিচয়ের ভবঘুরের (৫০) মরদেহ। একই দিন ডেমরার ডগাইর পশ্চিমপাড়া এলাকার একটি বাড়ি থেকে শাকিল হোসেন (১৬) নামের এক কিশোরের মরদেহ পেয়েছে পুলিশ।
ঢাকার বাইরে ২৫ মে দুই খুন: মাদারীপুরের রাজৈরে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে অজ্ঞাতপরিচয় মধ্যবয়সী এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। তাকে গাড়িচাপা দিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারণা। একই দিন ময়মনসিংহের নান্দাইলে এক যুবকের সঙ্গে আপত্তিকর অবস্থায় আটক হওয়ার পর জেসমিন আক্তার (২৫) নামের এক প্রবাসীর স্ত্রীর মরদেহ পাওয়া গেছে।
২৬ মে খুন হয় তিনজন: নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় হোসিয়ারি কারখানায় বেতন নিতে যাওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর হারুন খালাসী (৪২) নামের এক শ্রমিকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তাকে বেতন না দিয়ে হত্যা করার অভিযোগ উঠেছে। একই দিন জয়পুরহাটের আক্কেলপুরে জমি নিয়ে বিরোধে সৌদিপ্রবাসী মাসুম মণ্ডল (২৩) নামের েএক যুবককে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়েছে বলে জানা গেছে। একই দিন কিশোরগঞ্জের মিঠামইনের ঘোড়াউত্রা নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে দুর্বৃত্তদের হামলায় সাইদুর রহমান (৩০) নামের এক যুবক নিহত হয়েছেন।
২৮ মে খুন হয় তিনজন: ২৭ মে খুনের কোনো তথ্য না পাওয়া গেলেও পরদিন কক্সবাজারের টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়নের হারিয়াখালী এলাকায় স্থানীয়দের সংঘর্ষের সময় নিহত হয়েছে মো. ইব্রাহিম নামে ১৫ বছরের শিশু। চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার চরতী ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের খতিরহাট সৈয়দের বাড়ি এলাকায় মো. সেলিম (৪৫) নামের এক যুবককে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। একই দিন রাঙামাটির নানিয়ারচরে মুখোশ পরা তিন-চার ব্যক্তি ঘর থেকে তুলে নেওয়ার তিন দিন পর শম্ভু বিকাশ চাকমা (৪৮) নামের এক কৃষকের হাত বাঁধা মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। ওইদিন ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায় পারিবারিক কলহের জেরে ছেলে হোসেন শেখের কোদালের কোপে নিহত হয়েছেন মা ফুলজান বেগম (৬০)।
২৯ মে দুজনের প্রাণহানি: লক্ষ্মীপুরের রায়পুরের কেরোয়া ইউনিয়নের নয়ারহাটে নিখোঁজের এক দিন পর ফারাবি (৩) নামের এক শিশুর মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। একই দিন মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় মেঘনার শাখা ফুলদী নদী থেকে উদ্ধার করা হয়েছে হালিমা আক্তারের (২০) নামের এক তরুণীর মরদেহ। ওইদিন কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ার চণ্ডীপাশা ইউনিয়নের শৈলজানী এলাকায় জুবায়ের আহমেদ (২৫) নামের এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা।
৩০ মে সাত হত্যাকাণ্ড: পাবনার ঈশ্বরদীতে পদ্মা নদীতে নিখোঁজের ২০ ঘণ্টা পর রিফাত হাসান রক্তিম (৩৫) নামের এক যুবকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি তার মৃত্যুর কারণ। একই দিন কেরানীগঞ্জের রোহিতপুর ইউনিয়নের পোড়াহাটি এলাকায় আনুমানিক ৬৩ বছরের অজ্ঞাতপরিচয় এক পুরুষের মরদেহ পেয়েছে পুলিশ।
বাগেরহাটের রামপাল বাসস্ট্যান্ড এলাকায় দুর্বৃত্তের হামলায় ইখলাস গাজী (৫০) নামের সাবেক এক যুবলীগ নেতা নিহত হয়েছেন। তিনি সদর ইউনিয়ন যুবলীগের সাবেক সহসভাপতি। একই দিন নোয়াখালী সদরের দাদপুর ইউনিয়নের রামবল্লভপুর এলাকায় ‘ইয়াবা সেবন ও জুয়ার আসর’ নিয়ে দুই বাড়ির কিশোরদের দ্বন্দ্বের জেরে সংঘর্ষ ও হামলায় গাছ ব্যবসায়ীর মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে।
সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটেছে খুলনায়। নগরীর সোনাডাঙ্গা এলাকার কাঁচাবাজারের পাশে দারুল আমান মহল্লার সুজুকি কর্নার গলির শরিফুল ইসলামের বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয়েছে তিনটি মরদেহ। মৃত ব্যক্তিরা হলেন— বেবী বেগম (৫৫), তার নাতি শামীম ব্যাপারী (১২) ও মুস্তাকিম ব্যাপারী (৪)।
৩১ মে নিহত আরও ৯: মানিকগঞ্জের দৌলতপুর ও সদর উপজেলায় পারিবারিক কলহের জেরে মা ও দেড় বছরের শিশুসন্তান এবং পূর্বশত্রুতার কারণে এক যুবককে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। তারা হলেন— দৌলতপুরে বাঁচামারা গ্রামের আবদুস সালামের স্ত্রী আমিনা খাতুন (২৮), তার দেড় বছরের ছেলে আসওয়াদ এবং সদর উপজেলার পুটাইল ইউনিয়নের উত্তর পুটাইল গ্রামের বাসিন্দা মো. সজীব।
পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায় আমড়াগাছিয়া এলাকা থেকে দুটি মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। তারা হলেন দক্ষিণ আমড়াগাছিয়ার মৃত নুর মোহাম্মদ ব্যাপারীর ছেলে কৃষক আবদুর রশীদ ব্যাপারী (৪০) ও একই গ্রামের কালু মিয়ার ছেলে সাগর (২৮)।
রংপুরের পীরগাছায় আতিক (২৩) নামের এক যুবকের অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। উপজেলার উচাপাড়া ও দুধিয়াবাড়ি রেলগেটে পাওয়া গেছে তার মস্তকবিহীন মরদেহ। একই দিন নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের জামপুর ইউনিয়নের ভাদুড়িকান্দা গ্রামে তৃষা (২১) নামের এক গৃহবধূর মরদেহ পেয়েছে পুলিশ। পারিবারিক কলহের জেরে তিনি আত্মহত্যা করেছেন বলে ধারণা।
সিলেটের বিয়ানীবাজার পৌরসভার খাসাড়িপাড়া এলাকায় সাদিকুল ইসলাম রুপক (২৭) নামের এক যুবকের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। ওইদিন লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে প্রতিবেশীর কিল-ঘুসি ও মারধরে মো. হানিফ (৬২) নামের এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন আগামীর সময় প্রতিবেদক, ঢাকা এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা।






