গতির সঙ্গে বাড়ছে ব্যয়

দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে অন্যতম একটি উদ্যোগ ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ। চীনের ঋণে চলছে এর বাস্তবায়ন কাজ। কিন্তু মাঝপথে এসে ব্যয় বৃদ্ধিতে দেখা যাচ্ছে এক্সপ্রেসওয়ের মতোই দ্রুতগতি। এক লাফেই ৯ হাজার ৬৮০ কোটি টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধনীতে। এতে মূল ব্যয়ের তুলনায় বাড়বে ৫৫ দশমিক ১৫ শতাংশ। সেই সঙ্গে মেয়াদ দুই বছর বাড়িয়ে ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত করা হচ্ছে।
এর পেছনে কারণ তুলে ধরেছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, নতুনভাবে বাইপাইলে একটি ইন্টারসেকশন যুক্ত করার প্রস্তাব আছে। এটি হলে সেখানে এক মিনিটের জন্যও যানজটে দাঁড়াতে হবে না কোনো গাড়ির। এ ছাড়া বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল ও নির্মিতব্য পাতাল মেট্রোরেল-১-এর সঙ্গে এটির সংযোগ তৈরির নতুন অঙ্গ যোগ করায় এত বেশি ব্যয় বাড়ার কারণ।
এদিকে গত জানুয়ারিতে সংশোধনী প্রস্তাবটি নিয়ে অনুষ্ঠিত হয় প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা। ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও কোনো কারণে এটি উঠছে না জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায়। তবে সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করেছেন, আগামী একনেকে এটি অনুমোদন দেওয়া হতে পারে। প্রকল্পের আওতায় রাজধানীর কাওলা থেকে আব্দুল্লাহপুর-কামারপাড়া-ধউর-আশুলিয়া-জিরাবো-বাইপাইল-সাভার ইপিজেড হয়ে শ্রীপুর বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত প্রায় ২৪ কিলোমিটার এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে।
জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম আগামীর সময়কে বললেন, ‘সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় নতুন অঙ্গগুলোর ব্যাপারে কিছু বলা ছিল না। প্রকল্প বাস্তবায়ন পর্যায়ে দেখা গেছে এটিকে পুরোপুরি সফল করতে এবং মানুষের সুবিধা শতভাগ নিশ্চিত করতে ইন্টারসেকশন ও বিমানবন্দর এবং মেট্রোরেলের সঙ্গে সংযুক্তি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা প্রস্তাব দিয়েছি। এখন সরকার যদি মনে করে সত্যিই জনগুরুত্বপূর্ণ, তাহলে অনুমোদন দেবে।’ তিনি জানিয়েছেন, চীনের ঋণের অর্থছাড়ে কোনো সমস্যা নেই। ভালোভাবেই এগিয়ে চলছে প্রকল্পের বাস্তবায়ন। এখন দ্রুত সংশোধনী প্রস্তাবটি অনুমোদন হলে ভালো হয়। আশা করছি, আগামী একনেকে উপস্থাপন করা হবে।
সূত্র জানায়, ‘ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ’ প্রকল্পটির মূল ব্যয় ধরা হয়েছে ১৬ হাজার ৯০১ কোটি ৩২ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিলের ৫ হাজার ৯৫১ কোটি ৪১ লাখ এবং চীনের ঋণ থেকে ১০ হাজার ৯৪৯ কোটি ৯০ লাখ টাকা ব্যয় করা হচ্ছে। এর আগে প্রকল্পটির প্রথম সংশোধনী প্রস্তাবে ব্যয় বাড়িয়ে করা হয় ১৭ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা। এখন ৯ হাজার ৬৮০ কোটি টাকা বাড়িয়ে প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হচ্ছে ২৭ হাজার ২৩৩ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পের আওতায় খরচ হয়েছে ১১ হাজার ৭৩৫ কোটি ১৭ লাখ টাকা, আর্থিক অগ্রগতি ৬৬ দশমিক ৮৬ শতাংশ এবং ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ৫২ শতাংশ।
এদিকে প্রকল্পের মূল মেয়াদ ছিল ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত। কিন্তু এটি অনুমোদন পেতে অনেকটা সময় চলে যাওয়ায় ২০২২ সালের ১৬ জুন অনুমোদন দেয় একনেক। ফলে মেয়াদ বাড়িয়ে করা হয়েছিল ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত। এখন প্রস্তাব করা হয়েছে আরও দুই বছর বাড়ানোর।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ২১ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় পিইসি সভা। পরিকল্পনা কমিশনে অনুষ্ঠিত ওই সভায় অর্থ বিভাগের প্রতিনিধি বললেন, প্রস্তাবিত দ্বিতীয় সংশোধিত ডিপিপিতে (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) ভৌত কাজের ভ্যারিয়েশন বাবদ প্রায় ১ হাজার ৯৩০ কোটি ২২ লাখ টাকা, ভ্যাট ও আয়কর বাবদ ১ হাজার ৩০ কোটি, কাস্টমস শুল্ক (সিডি) বাবদ ৫৫৫ কোটি ৭৩ লাখ, ভূমি অধিগ্রহণ বাবদ ৭৪৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা ধরা হয়েছে। আরও আছে, পরামর্শক সেবা খাতে ২৫৯ কোটি ৯৪ লাখ এবং ইউটিলিটি স্থানান্তর বাবদ ৫১৫ কোটি টাকা ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব। এসব ব্যয় সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই করা হয়েছে কি না, পাশাপাশি ভবিষ্যতে এসব খাতে আরও ব্যয় বাড়বে কি না? এর জবাবে প্রকল্প পরিচালক শফিকুল ইসলাম বললেন, ‘যাচাই-বাছাই করেই এসব খাতের ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ভবিষ্যতে এ খাতগুলোতে ব্যয় বৃদ্ধির প্রয়োজন হবে কি না, তা এ মুহূর্তে বলা অসম্ভব।’
প্রকল্প পরিচালক আরও জানান, প্রকল্পটি জি-টু-জি ভিত্তিতে বাস্তবায়নের জন্য ২০১৫ সালের ২২ জানুয়ারি চীন সরকারের মনোনীত প্রতিষ্ঠান চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশনের (সিএমসি) সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়। পরে প্রকল্পের বাণিজ্যিক চুক্তি ২০১৭ সালের ২৯ নভেম্বর স্বাক্ষর হয় এবং ২০২১ সালের ২৬ অক্টোবর চায়না এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে একটি ঋণ চুক্তি করা হয়েছিল। এটি পরের বছর থেকে কার্যকর হয়। বাণিজ্যিক চুক্তির আওতায় নির্মাণকাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়।
চুক্তি অনুযায়ী নির্মাণকাল ধরা হয়েছিল পাঁচ বছর দুই মাস, কিন্তু বাণিজ্যিক চুক্তি স্বাক্ষরের চার বছর পর ঋণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদ পরবর্তী সময়ে জুন, ২০২৬ পর্যন্ত বাড়ানো হয়। বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের পরিবর্তন, ভ্যাট ও আয়কর খাতে পরিবর্তন, কাস্টমস শুল্ক খাতে ব্যয় বৃদ্ধি, প্রাইস কন্টিনজেন্সি খাতে পরিবর্তন, ইউটিলিটি স্থানান্তর বাবদ ব্যয় বৃদ্ধি, অপরিহার্য পাঁচটি ভ্যারিয়েশন, ভূমি অধিগ্রহণ, পরামর্শক সেবা খাতে ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় দ্বিতীয় সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে। তিনি বলেছেন, এ প্রকল্পে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার পরিবর্তনের কারণে (তখন ১ ডলার সমান ৮৬ টাকা, যা বর্তমানে ১২১ দশমিক ৭৫ টাকা) ৩ হাজার ৭৩৬ টাকা বেড়েছে। ব্যয় বেড়েছে অন্যান্য খাতেও।




