সব বোঝা যাত্রীর ঘাড়েই
- ২০২২ সালে ডিজেলের দাম বেড়েছিল ৩৫ টাকা, বাস ভাড়া ২২.২২%
- এখন লিটারে বেড়েছে ১৫ টাকা, বাসা ভাড়া বাড়াতে চায় ৬৪%

সংগৃহীত ছবি
২০২২ সালের আগস্ট মাস। লিটারপ্রতি ডিজেলের দাম বাড়ানো হয়েছিল ৩৫ টাকা। এর জেরে সে সময় বাস ভাড়া বাড়ানো হয়েছিল ২২ দশমিক ২২ শতাংশ।
আর এবার ডিজেলের দাম লিটারে বেড়েছে মাত্র ১৫ টাকা, কিন্তু বাস মালিকরা বলছেন তারা বাস ভাড়া বাড়াতে চান ৬৪ শতাংশ।
অবশ্য এর পেছনে তাদের যুক্তি দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, ডলারের বাড়তি দামের বিষয়টি।
কিন্তু আসলেই যদি তাদের আবদার মেনে ৬৪ শতাংশ বাড়ে গণপরিবহনের ভাড়া, তাহলে তা সাধারণ মানুষের ঘাড়ে কেমন করে চেপে বসবে, সে খোঁজ বোধ হয় রাখছে না কেউ।
কারণ, সবকিছুর বাড়তি দামের যে অজুহাত বাস মালিকরা দিচ্ছেন, তার মধ্যেই রয়েছেন সাধারণ বাসযাত্রীরা। বরং গণপরিবহনের নতুন ভাড়া তাদের গলায় পরাবে নতুন ফাঁস।
এই সময়ের মধ্যে বেড়েছে সবকিছুর খরচ। বেড়েছে শ্রমিকের মজুরি, যন্ত্রাংশের দাম। শুধু তেলের দাম দেখেই তো হবে না। আছে আরও অনেক খরচ
বিশ্বায়নের ফলে গ্লোবাল ভিলেজের নাগরিক হিসেবে আমরা যেমন পৃথিবীর রোগ-জরা-শোক-তাপের অংশীদার হয়েছি, তেমনি কোথাও কোনো যুদ্ধ বাধলে তার মর্টার শেল এসে না পড়লেও, কোনো না কোনোভাবে রেশ ঠিকই এসে পড়ে আমাদের ওপর। সেই রেশই এবার পড়তে যাচ্ছে বাস ভাড়ার ওপর।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর আগস্টে লাফ দিয়ে বেড়েছিল জ্বালানি তেলের দাম। বাস-ট্রাকের জ্বালানি ডিজেলের দাম সে সময় বাড়ে লিটারে ৩৫ টাকা। স্বাভাবিকভাবেই তার প্রভাবে বাড়ে গণপরিহনের ভাড়া।
নানা আলোচনা-সমাবেশ, প্রতিবাদ-বিক্ষোভের পর ঠিক হয় গণপরিবহনের নতুন ভাড়া। সেবার দূরপাল্লার বাসে প্রতি কিলোমিটারের ভাড়া ৪০ পয়সা বাড়িয়ে করা হয়েছিল ২ টাকা ২০ পয়সা। ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরের জন্য প্রতি কিলোমিটার ৩৫ পয়সা বাড়িয়ে ভাড়া ঠিক হয় ২ টাকা ৫০ পয়সা, যা ২২ দশমিক ২২ শতাংশের মতো।
ইরান যুদ্ধের ফেরে পড়ে চার বছর পর প্রায় একই পরিস্থিতির মুখে নতুন সরকার।
এবার ডিজেলের দাম বেড়েছে লিটারে ১৫ টাকা। কিন্তু পরিবহন নেতারা বাস ভাড়া বাড়ানোর দাবি করছেন ৬৪ শতাংশ পর্যন্ত।
পরিবহন মালিক সমিতির নেতাদের দাবি, দূরপাল্লায় প্রতি কিলোমিটারের জন্য বাস ভাড়া নির্ধারণ করতে হবে ৩ টাকা ৩৬ পয়সা আর মহানগরে ৩ টাকা ৯৬ পয়সা।
সে ক্ষেত্রে এই পুরো ভার গিয়ে পড়বে যাত্রীর ঘাড়ে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে ঢাকার ফার্মগেট থেকে মিরপুর-১০ রুটের কথা। এই রুটের দূরত্ব আনুমানিক ৮ দশমিক ২ কিলোমিটার।
বিআরটিএর সবশেষ ভাড়ার তালিকা অনুযায়ী, ডিজেলচালিত বাসে এই পথের ভাড়া ১৬ টাকা। তবে কোনো গণপরিবহনেই এই ভাড়া রাখা হয় না। যাত্রীদের দিতে হয় ২০ টাকা।
বাস মালিকদের নতুন দাবি পূরণ হলে অর্থাৎ প্রতি কিলোমিটারের জন্য ৩ টাকা ৯৬ পয়সা গুনতে হলে এই পথের ভাড়া বেড়ে দাঁড়াবে ৩৩ টাকায়। ৩ টাকা খুচরা থাকা না থাকা নিয়ে প্রতিনিয়ত চালকের সহকারীর সঙ্গে যাত্রীদের হবে বসচা, শেষমেশ ভাড়া গিয়ে হয়তো দাঁড়াবে ৩৫ টাকায়।
অন্যদিকে ঠিক এই পথের জন্য মেট্রোরেলের ভাড়া ৩০ টাকা, তবে কোনো যাত্রীর কার্ড করা থাকলে তার জন্য ভাড়া পড়ে ২৬ টাকার মতো। অর্থাৎ, বাসের ভাড়া যদি বাড়ে তাহলে চাপ গিয়ে পড়বে মেট্রোতে।
কারওয়ান বাজার মোড়ে বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিলেন অফিসফেরত নাজমুল আহসান। পথে বাস না থাকা, মেট্রোয় ভিড় আর নতুন দামের আলাপ নিয়ে রীতিমতো হতাশ তিনি।
আগামীর সময়কে বলছিলেন সেই হতাশার কথাই।
নাজমুল বললেন, ‘মালিকরা ইচ্ছামতো ভাড়া বাড়ানোর দাবি জানান। সেই দাবি পূরণে পথে বাস না নামিয়ে জিম্মি করেন যাত্রীদের। কিন্তু যাত্রীদের তো আয় দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে তাল রেখে বাড়ে না। তাহলে তারা কীভাবে সংসার চালাবেন? তাদের খোঁজ রাখে কেউ?’
কেন এত টাকা ভাড়া বাড়াতে চাইছেন, তা জানতে কথা হয় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কাজী মো. জোবায়ের মাসুদের সঙ্গে।
তিনি দোহাই দিলেন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির। তার কথায়, ‘এই সময়ের মধ্যে বেড়েছে সবকিছুর খরচ। বেড়েছে শ্রমিকের মজুরি, যন্ত্রাংশের দাম। শুধু তেলের দাম দেখেই তো হবে না। আছে আরও অনেক খরচ।’
তার মতে ঢাকায় ভাড়া হওয়া উচিত অন্তত ৪ টাকা ১০ পয়সা, আর দূরপাল্লায় সাড়ে ৩ টাকা।
কারণ হিসেবে তিনি বলছিলেন যানজটের কথা। ঢাকায় ১৬ ঘণ্টা বাস চালিয়েও ১৬০ কিলোমিটার চলা যায় না। আয় না হলেও খরচ তো ঠিকই হচ্ছে, এই অজুহাতও দিলেন তিনি।
মালিকদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সর্বশেষ ভাড়া বাড়ানোর সময় শুধু জ্বালানির মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। অন্যান্য খাত গুরুত্ব পায়নি। এখন দাম বেড়েছে যন্ত্রাংশের। তাই সেসব বিষয়ও বিবেচনায় দেওয়ার দাবি তাদের।

