জীবন ২৪১ দিনের, হাসপাতালেই ৯৯ দিন
- ফারুক হেরে গেল হামের কাছে
- হাসপাতাল থেকেই সংক্রমণ— দাবি মা-বাবার
- কোনো টিকা পায়নি শিশুটি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ফারুকের ২৪১ দিনের জীবন। এই ছোট্ট জীবনের ৯৯ দিনই কেটেছে হাসপাতালে হাসপাতালে। ডায়রিয়া দিয়ে শুরু। এরপর দিন দিন লম্বা হয়েছে রোগের তালিকা। সিএনজিচালক বাবা সর্বস্ব দিয়ে চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তবে ফারুক রোগমুক্ত হওয়ার পর্যাপ্ত সময় পেল না— হেরে গেল হামের কাছে।
গত ১৬ এপ্রিল চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাজধানী শ্যামলীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে (ঢাকা শিশু হাসপাতাল) হাম রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় ফারুক।
গত ১৫ মার্চ থেকে ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে ২২২ শিশু মারা গেছে। এর মধ্যে ৪৪ শিশুর হাম শনাক্ত হয়েছে। এ তথ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের।
ছোট্ট ফারুকের বাড়ি কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার পূর্ণমতি গ্রামে। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয় বাড়িতেই। উন্নত চিকিৎসার আশায় ফারুককে নিয়ে ২৬ মার্চ এই হাসপাতালে এসেছিলেন মা-বাবা। ভর্তির চার দিন পর হামের লক্ষণ দেখা দিলে নির্ধারিত ওয়ার্ডে শুরু হয় চিকিৎসা। শিশুটির শেষ তিন দিন কেটেছে নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ)।
ফারুক মারা যাওয়ার সাত দিন পর মোবাইল ফোনে মা-বাবার সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। বাবা মো. মোজাম্মেলের (৩৫) গলাটা ধরে আসে, ‘হ্যাতেরে (ছেলে) ভালো করার জন্য ডাক্তার যা বলছে, সাথে সাথে করছি; দেরি করছি না। তাও হ্যাতেরে বাঁচাইতে পারলাম না।’
বড় ছেলে মো. ওমরের (৫) সঙ্গে মিলিয়ে নাম রেখেছিলেন ছোট ছেলের। সেই ছেলেকে বাঁচাতে বাবা বিক্রি করেছেন আয়ের একমাত্র অবলম্বন সিএনজি, করেছেন ঋণও। ফারুকের চিকিৎসা বাবদ ঢাকা শিশু হাসপাতালে খরচ হয়েছে ২ লাখ টাকা। দরকার হলে ভিটেমাটি বিক্রি করে ছেলের সুস্থতার জন্য আরও টাকা জোগাড় করতেন বলে জানালেন বাবা।
বাবার কথা ছাপিয়ে ফারুকের মা পিংকি আক্তারের ফুপিয়ে কান্নার শব্দ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল ফোনের এপাশ থেকে, যার বয়স মাত্র ২৪ বছর। মায়ের আক্ষেপ, দৌড়াতে হয়েছে হাসপাতালে হাসপাতালে। ক্লান্ত ছিলেন নিজেই। পারেননি ঠিকমতো ছেলের যত্ন করতে। পারেননি চোখভরে দেখতেও।
শিশু হাসপাতালে ফারুক থেকেছে জীবনের শেষ ২১টি দিন। নিউমোনিয়া আক্রান্ত ছেলেকে এই হাসপাতালে নিয়ে এসেছিলেন স্থানীয় চিকিৎসকের পরামর্শে। যাচ্ছিল ভালোর দিকেই। কিন্তু ভর্তির চার দিন পরে জ্বর এলে হাম সন্দেহে ফারুককে পাঠানো হয় নির্দিষ্ট ওয়ার্ডে। অবস্থার অবনতি হলে আইসিইউতে চলে চিকিৎসা।
মা-বাবার অভিযোগ, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে ছেলে পায়নি প্রয়োজনমতো চিকিৎসা। এতেই শ্বাসকষ্ট বেড়ে অবস্থা দ্রুত খারাপ হচ্ছিল। ফারুক মারা যায় বিকেল ৪টার দিকে। বাবার কথা, ‘মারা যাওয়ার দিন দুপুর পর্যন্ত পোলা আমার হাসছে, খেলছে, খাইছে।’
ফারুকের জন্মের সময় ওজন ছিল ২ কেজি ৭০ গ্রাম। সুস্থই ছিল তিন মাস পর্যন্ত। চার মাসে এসে মা ‘শখ করে’ বুকের দুধের পাশাপাশি শুরু করেন বাজার থেকে কেনা কেক খাওয়াতে। নিষেধ করতেন বাবা; কিন্তু শোনেননি মা। বাবার আক্ষেপ, ‘ওরে (স্ত্রী) কতবার কইছি, কেক দিও না, হজম হবে না। শুনে নাই।’
এরপর শুরু হয় পাতলা পায়খানা, বমি, জ্বর। কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২৬ দিন চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয় ফারুক। কেক থেকেই ফারুক ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে বলে ধারণা বাবার।
এর কিছুদিন পর আবারও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয় শিশুটি। স্থানীয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিতে হয় ১২ দিন চিকিৎসা। এরপর আর বেশিদিন বাড়ি থাকতে পারেনি ফারুক। ধরা পড়ে হাঁটুর বাটিতে (জোড়া) সংক্রমণ। ফুলে যায় বাটি। স্থানীয় চিকিৎসকের পরামর্শে রাজধানী শ্যামলীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চলে চিকিৎসা। ১ মাস ১০ দিন চিকিৎসা শেষে বেশ উন্নতি হয় অবস্থার। কিন্তু ছোট্ট ফারুকের মেলে না স্বস্তি। কদিন বাদেই আক্রান্ত হয় নিউমোনিয়ায়। বাবা-মা ধরেন ঢাকার পথ।
ঢাকা শিশু হাসপাতাল থেকেই ফারুক হামে আক্রান্ত হয়েছে— জোর দাবি মা-বাবার। নিউমোনিয়ার সুচিকিৎসা দিতে শিশুটিকে নেওয়া হয়েছিল ঢাকার হাসপাতালে। ভালোর জন্য গিয়ে লাশ হয়ে বাড়ি ফেরে ফারুক। বাড়ির আশপাশে এখনো মেলেনি কারও হাম হওয়ার খবর। বাবার কথায়, ‘আশপাশে কারও হাম শুনছি না।’
নিজেদের ছোটবেলায় ফারুকের বাবা-মা নিয়েছিলেন ইপিআইয়ের সব টিকা। তাদের দুজনের কখনো হাম হয়নি। অষ্টম শ্রেণি পাস ফারুকের মা পিংকি আক্তার বলেন, ‘হ্যাতেরে কোনো টিকা দেই নাই, হাসপাতালে দৌড়াদৌড়ি করে সময় পাইছি না।’ ভিটামিন ‘এ’ও পায়নি শিশুটি; ঢাকা শিশু হাসপাতালে অবশ্য চিকিৎসক দিয়েছিলেন।
মারা যাওয়ার আগের দিন ৫ হাজার ২৮০ টাকা খরচ করে ছেলের অনেক পরীক্ষা করাতে দিয়েছিলেন। ফুসরত মেলেনি রিপোর্টগুলো নেওয়ার। এর আগেই ফারুকের নিথর দেহ নিয়ে ছুটতে হয়েছে বাড়ির পথে। তাতেও খরচ সাড়ে ৫ হাজার টাকা। এই প্রতিবেদককে বাবা মানি রিসিট পাঠিয়ে অনুরোধ করেন, রিপোর্টটি সংগ্রহ করে ছবি তুলে পাঠিয়ে দেওয়ার। বাবার কথা, ‘যে হাসপাতালে গিয়ে আমার কলিজার টুকরা মইরা গেছে, সেইখানে আর পা দিমু না।’



