‘বর্জ্যের অফিস’ দখল করে ঠিকাদারি ও রাজনীতি!
- সরকারি দলের ঠিকাদার জাকির আহমেদ বাবু বর্জ্য পরিদর্শকের অফিসে বসেন
- বর্জ্য পরিদর্শক আসেন হাজিরা দিতে
- ‘বর্জ্যের কন্ট্রাক্ট নিয়েছে তাই বসতেছে’: ডিএসসিসি প্রশাসক
- ‘রাজনৈতিক লোকদের জবাবদিহি লাগে না’— এমন রীতি চালু হয়েছে রাষ্ট্রে
- দখলদারিত্ব রোধে স্থানীয় নির্বাচন দরকার: নগরবিদ

বিএনপির সাবেক নেতা জাকির আহমেদের বিরুদ্ধে উঠেছে অভিযোগ। গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের বর্জ্য পরিদর্শকের ভবন দখল করে রাজনৈতিক ও ঠিকাদাির কার্যক্রম চালাচ্ছেন বিএনপির সাবেক এক নেতা। দখলদার জাকির আহমেদ বাবু ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক। পাশাপাশি বৃহত্তর লালবাগ থানা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতিও ছিলেন। দীর্ঘদিন বর্জ্য পরিদর্শকের ভবন নিজের দখলে নিয়ে রেখেছেন তিনি। এর সঙ্গে জড়িত বর্জ্য পরিদর্শক বা সিআই ফিরোজ আলম নিজেও। তিনি ওই ভবনের চাবি দিয়ে রেখেছেন জাকির আহমেদ বাবুকে।
গত সোমবার বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে সরেজমিন ঘটনার সত্যতা মেলে। ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন বা এসটিএসের পেছনে অবস্থিত সিআই ফিরোজ আলমের অফিস। নতুন, ঝকঝকে সাদা টাইলস বসানো মেঝে আর লাল ইট কাটা দেয়ালের ভবনটি বেশ পরিপাটি। ভেতরে ঢুকতেই দেখা যায় চার অনুগত সদস্য নিয়ে বসে আছেন বাবু। নিজের শরীরের ওজনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিশাল এক ফোমযুক্ত কালো চেয়ারে বসে আছেন। সামনে ছোট আরও পাঁচ-সাতটি চেয়ার। তাতেই বসে আছেন বাকিরা। ভেতরে উঁকি দিতেই আরও দুই কক্ষ চোখে পড়ে এই প্রতিবেদকের। কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন, সিআই ফিরোজ আলম এলে ওই ছোট চেয়ারে বসেন। আর বাবু বসেন বড় রাজকীয় চেয়ারটিতে। পুরো কক্ষে সিটিটিভি ক্যামেরার মনিটর লাগানো বেশ কয়েকটি।
অফিসে ঢুকে সিআই ফিরোজ আলম আছেন কি না, জানতে চাইলে জাকির আহমেদ বাবুর উত্তর, ‘না, এসেছিল, ৪টার দিকে চলে গিয়েছে।’ তবে ফিরোজ আলমকে ফোন করলে তিনি জানালেন, দুপুর ১টার দিকে অফিস থেকে বের হয়েছেন। ফলে এটা স্পষ্ট যে, অসংগতি দিয়েই শুরু জাকির আহমেদ বাবুর উত্তর। সিআই অফিস থেকে চলে গেলে আপনারা এখানে কী করছেন— প্রতিবেদকের এই প্রশ্নের জবাবে বাবু জানালেন, তিনি ঠিকাদার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাজ সিসিটিভিতে মনিটর করছেন।
আপনার ব্যক্তিগত কাজ সিটি করপোরেশনের অফিসে বসে করতে পারেন কি না? জবাবে বাবু বললেন, ‘এটা বর্জ্যেরই কাজ, আমি এর ঠিকাদার।’
কথা আর না বাড়িয়ে বের হয়ে এবার সিআই ফিরোজকে ফোন দেন প্রতিবেদক। আপনার অফিসের চাবি কেন আরেকজনের কাছে? ফিরোজের ঝটপট উত্তর, ‘বর্জ্যের কর্মীরা ওয়াশরুমে যায়, তাই।’
সেজন্য পাবলিক টয়লেট আছে। ঠিকাদার কেন আপনার চেয়ারে বসে তার রাজনৈতিক কার্যক্রম চালাচ্ছেন? এবার ফিরোজের চেষ্টা বাবুকে আড়ালের। তিনি বললেন, ‘আসলে ওনার অফিস নেই। তাই এখানে বসেন মাঝেমধ্যে।’ প্রতিবেদকের ফের নাছোড়বান্দা প্রশ্ন, সাংবাদিকরাও কি কাল থেকে এখানে বসে কাজ করতে পারবেন? সিআই ফিরোজের জবাব, ‘না। এটা কীভাবে সম্ভব?’ বোঝা গেল তিনিই আসলে সরষের মধ্যে ভূত।
জাকির আহমেদ বাবু ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের প্রাথমিক বর্জ্য সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠান বা পিসিএসপির ঠিকাদার। বর্জ্য সংগ্রহের এ ব্যবস্থায় সাধারণত বাসাবাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহ করে ভ্যান বা ছোট গাড়িতে করে এসটিএসে নেওয়া হয়। চলতি বছর ১ জানুয়ারি থেকে বাবুর প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স জয় কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড সাপ্লাইয়ার্স’ বর্জ্য সংগ্রহের টেন্ডার পায়। ঠিকাদারের পাশাপাশি তিনি বিএনপি নেতাও। এ পরিচয়ের জোরেই তিনি দখলে নেন সিটি করপোরেশনের অফিসটি। এখানে দিনভর তার ঠিকাদারি এবং রাজনৈতিক কার্যক্রম চালান। সিআই ফিরোজ কালেভদ্রে অফিসে আসেন। বর্তমানে বাবুই এ অফিসের স্বঘোষিত হর্তাকর্তা।
সিআইয়ের অফিসে ঠিকাদারি এবং রাজনৈতিক কার্যক্রম চলছে— বিষয়টি ডিএসসিসির প্রশাসক মো. আব্দুস সালামের কানে তুলতেই তিনি আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘তারা বর্জ্যের কন্ট্রাক্ট নিয়েছে তাই বসতেছে।’ কেন এতদিন ধরেও বিষয়টি সিটি করপোরেশনের নজরে আসেনি? এ প্রশ্নের উত্তরে প্রশাসকের জবাব, ‘আপনার (প্রতিবেদক) নজরে পড়ে নাই, তাই আমাদেরও নজরে পড়ে নাই। এ ছাড়া সিআই তো তেমন কিছু জানায়নি।’ অবশেষে প্রশাসক এতটুকু জানালেন যে, অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘যেখানে প্রশাসকের দায়িত্ব এগুলো খতিয়ে দেখা। কোথায় কী হচ্ছে সেটা ওনার জানতে হবে। অথচ উনি জানেন না।’
তিনি আরও বলেছেন, ‘রাজনৈতিক লোকদের জবাবদিহি লাগে না— এমন একটি রীতি এখন চালু হয়েছে রাষ্ট্রে। আর জবাবদিহি না থাকলে সেখানে দখলদারিত্ব বেড়ে যাবেই। এর ফলে সরকারি প্রতিষ্ঠানের ফাংশন ভেঙে যাচ্ছে।’ দখলদারিত্ব রোধে স্থানীয় নির্বাচন দরকার বলে মনে করেন আদিল মুহাম্মদ খান।




