আগামীর সময় এক্সপ্লেইনার
তেলের দামের কোপ পড়বে সবার ঘাড়েই

ক্ষেত থেকে আলু তুলছেন কৃষক। ছবি: আগামীর সময়
ইরান যুদ্ধের জেরে তৈরি হওয়া সংকট সামাল দিতে শনিবার রাতে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে সরকার। এই সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়েছে গণপরিবহন থেকে নিত্যপণ্যের বাজারে, কৃষকের মাঠ থেকে নাগরিক মানুষের ঘরের খাবারের পাতে।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পরপরই রবিবার বেড়েছে এলপিজির মূল্য। পাশাপাশি দেখা দিয়েছে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির শঙ্কাও। এতে উচ্চ মূল্যস্ফীতি আরও বেড়ে জনদুর্ভোগের কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে নিম্ন আয়ের মানুষ। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে প্রকৃত আয় কমে নতুন করে গরিব হবে অনেকে। যারা এখন বসবাস করছে দারিদ্র্যসীমার ওপরে, যা বর্তমানে ২১ শতাংশের বেশি।
এরই মধ্যে এক পূর্বাভাসে বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, বাংলাদেশে নতুন করে গরিব হতে পারে কমপক্ষে ১২ লাখ মানুষ।
জীবনযাত্রাকে সহনীয় করতে বিকল্প উদ্যোগ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। তিনি বলেছেন, পরিস্থিতি যদি ঠিকভাবে সামাল দেওয়া না যায় ১৩ শতাংশে পৌঁছে যেতে পারে মূল্যস্ফীতি। সমন্বয় করতে হবে মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়গুলো। যাতে ঘোষিত মূল্যের চেয়ে বাড়তি মূল্যে কিছু কিনতে না হয় ভোক্তাকে।
এদিকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, তেলের দাম যেটুকু বাড়ানো হয়েছে তাতে মূল্যস্ফীতি বাড়তেও পারে, আবার নাও বাড়তে পারে। তেলের মূল্য নগণ্যই বাড়ানো হয়েছে।
এরই মধ্যে সর্বত্রই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তবে এই মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা কাদের কেমন লাগবে? সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিভিন্ন পেশাজীবী ও অর্থনীতির খাতগুলো কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে— তা নিয়েই এই বিশ্লেষণ।
পকেট কাটা পড়বে যাত্রীদের
তেলের মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে সরাসরি প্রভাব পড়বে গণপরিবহনে। ডিজেলের মূল্য লিটারে ১০০ টাকা থেকে বেড়ে ১১৫ টাকা হওয়ায় বাস, ট্রেন, লঞ্চ ও ট্রাকের ভাড়া বাড়ানো হবে প্রায় নিশ্চিত। এরই মধ্যে দূরপাল্লার পরিবহনে ভাড়া বাড়ার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। বেড়েছে রাইড-শেয়ারিং বাইকের ভাড়াও।
আরও বিপদে পড়বে খেটে খাওয়া মানুষ
দিনমজুর, রিকশাচালক, ভ্যানচালক থেকে শুরু করে নির্মাণশ্রমিক। যাদের আয় নির্ভর করে প্রতিদিনের কাজের ওপর, তাদের জন্য তেলের মূল্যবৃদ্ধি মানে অভিশাপ। যাতায়াত খরচ বাড়লে তাদের কাজ পাওয়ার পরিমাণ কমে যেতে পারে। ফলে কমবে আয়। নিত্যপণ্যের মূল্য আরও বাড়লে সংকুচিত হবে খাবার কেনার সামর্থ্যও।
কৃষক ও কৃষি খাত
বাংলাদেশে মোট ডিজেল আমদানির প্রায় ২০ শতাংশ ব্যবহার হয় কৃষি খাতে। বিশেষ করে, বোরো মৌসুমে (নভেম্বর-এপ্রিল) সেচের জন্য ডিজেলের চাহিদা সর্বোচ্চ থাকে। তেলের মূল্য বাড়ায় সেচ খরচ, ধান কাটা ও মাড়াই যন্ত্রের জ্বালানি খরচ, কৃষিপণ্য বাজারে আনার পরিবহন খরচ বেড়ে যাবে সবকিছু। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়বে চাল ও অন্যান্য কৃষিপণ্যের বাজারমূল্যে। খাদ্যপণ্যের দাম বাড়লে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের খাবার কিনতে পারার সক্ষমতা কমবে আরও।
বিনিয়োগ কমলে কমবে কর্মসংস্থানও
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বিনিয়োগের পরিবেশে। উৎপাদন খরচ বাড়লে নতুন উদ্যোক্তা বিনিয়োগে আগ্রহ হারাবেন। সংকুচিত হতে পারে পুরনো শিল্পও। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে। যেখানে দেশের প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ কর্মবাজারে যোগ দেয়, সেখানে কর্মসংস্থান কমে গেলে বেকারত্ব বাড়বে এবং দারিদ্র্য আরও গভীর হবে।
নিত্যপণ্যের বাজার
তেলের দাম বাড়ায় সরাসরি প্রভাব পড়ছে নিত্যপণ্যের বাজারে। চাল, ভোজ্য তেল, সবজি— সবকিছুর দাম বাড়তির দিকে। পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় দূরের জেলা থেকে আসা পণ্য (যেমন- ডিম, পেঁয়াজ, আলু) দাম বাড়তে পারে।
বিদ্যুতের দাম বাড়লে যা হবে
বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, তেলের মূল্য সমন্বয় করাই তাদের বাধ্যতামূলক সিদ্ধান্ত। সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোরও।
বিদ্যুতের দাম বাড়লে বাসা-বাড়ি, শিল্প-কারখানা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান— সবার বেড়ে যাবে বিদ্যুৎ বিল। হিমঘর, কোল্ডস্টোরেজ, ছোটশিল্প, এমনকি চিকিৎসা সরঞ্জামের খরচ বেড়ে যাবে। তখন মূল্যস্ফীতি আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা।
এলপিজিনির্ভর হোটেল-রেস্তোরাঁয় বাড়বে খাবার খরচ
এক মাসের ব্যবধানে দ্বিতীয়বারের মতো এলপিজির দাম বেড়েছে। এপ্রিলের শুরুতে ৩২ টাকা ৩০ পয়সা বেড়েছিল, এবার প্রতি কেজিতে বেড়েছে ১৭ টাকা ৬২ পয়সা। রান্নার কাজে এলপিজি ব্যবহার করা মধ্যবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর মাসিক বিল বাড়বে উল্লেখযোগ্য হারে। বিশেষ করে শহরের অলিগলির ছোট দোকান, রেস্তোরাঁ, হোটেল যারা এলপিজিনির্ভর, তাদের খরচ বেড়ে যাবে— যা শেষ পর্যন্ত গ্রাহকের প্লেটে।
জিডিপিতে প্রভাব
জ্বালানি তেল আমদানি করতে বেশি ডলার লাগবে। রিজার্ভ কমে যেতে পারে। গবেষকরা আশঙ্কা করছেন, দীর্ঘমেয়াদে জিডিপি কমে যেতে পারে এবং অবমূল্যায়ন হতে পারে মুদ্রার। অর্থাৎ টাকার মান কমে যাবে, আমদানিপণ্য আরও দামি হবে, বিদেশে পড়ালেখা বা চিকিৎসা করতে লাগবে আরও টাকা। তবে সরকার ভর্তুকি দিয়ে কিছুটা স্বস্তি দিলেও, দীর্ঘস্থায়ী সমাধান নয়।
উৎপাদন কমবে পোশাক কারখানায়
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ আসে পোশাকশিল্প থেকে; কিন্তু জ্বালানি সংকটের কারণে এরই মধ্যে অনেক শিল্প-প্রতিষ্ঠান উৎপাদন করছে সক্ষমতার ৫০ শতাংশেরও কম। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে এই খাতের জন্য।এতে প্রভাব পড়তে পারে শ্রমিকদের জীবনযাত্রায়।
বিকেএমইএর প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ হাতেম জানিয়েছেন, বর্ধিত মূল্যে ডিজেল কিনে কারখানা সচল রাখলেও বাড়তি মূল্য সমন্বয় করবেন না বিদেশি ক্রেতারা। ফলে লোকসান গুনতে হবে শিল্পমালিকদের, বাড়বে ব্যাংকের দায়। এরই মধ্যে টানা আট মাস রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি, ভবিষ্যতেও তা ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী আগামীর সময়কে বলেছেন, যাত্রীদের দুর্ভোগ কমাতে সুপারিশ করা হবে ভাড়া যেন বেশি পরিমাণে না বাড়ে। আমরা বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নেব। প্রতি লিটার ডিজেলের মূল্য ১৫ টাকা বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে বাস ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ১৫ পয়সা হারে বৃদ্ধির জন্য দেশের যাত্রীসাধারণের পক্ষ থেকে প্রস্তাব তুলে ধরেন তিনি।
বাস মালিক সমিতিকে একচেটিয়া সুবিধা দেওয়ার এমন কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রাখতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন মোজাম্মেল হক চৌধুরী।
উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে এই মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। নতুন মূল্য কার্যকর হয়েছে শনিবার রাত থেকে।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, অকটেনের দাম বেড়ে প্রতি লিটার ১৪০ টাকা এবং পেট্রলের দাম ১৩৫ টাকা করা হয়েছে। এ ছাড়া নতুন মূল্য অনুযায়ী পেট্রল ১৩৫ টাকা, ডিজেল ১১৫ টাকা ও কেরোসিন ১৩০ টাকায় বিক্রি হবে।
মূল্যবৃদ্ধির আগে ভোক্তাপর্যায়ে প্রতি লিটার ডিজেলের মূল্য ১০০ টাকা, কেরোসিন ১১২ টাকা, অকটেন ১২০ টাকা ও পেট্রলের মূল্য ১১৬ টাকা ছিল।

