বন্যায় মাছ ও প্রাণিসম্পদেই ক্ষতি ৪৪৩ কোটি টাকা

ছবি: এইআই নির্মিত
বন্যায় দেশের সাত জেলায় সৃষ্ট বন্যায় ৬ লক্ষাধিক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত। এখন পর্যন্ত বন্যা ও সংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে ৫৯ জনের, আহত আরও ৩৯। এসব জেলায় ৩২৯টি কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন প্রায় ১১ হাজার মানুষ। ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র নিরূপণ না হলেও মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় বলছে— এবারের বন্যায় এ খাতে ৪৪৩ কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হয়েছে। অন্যদিকে ৪৩টি জেলার ১ লাখ ১৪ হাজার ৭২৩ হেক্টর ফসলি জমি আক্রান্তের পাশাপাশি সাড়ে ১০ হাজার হেক্টরের বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি কৃষি মন্ত্রণালয়ের। এ ছাড়া ক্ষতির মুখে পড়েছেন সাড়ে ৪ লাখ প্রান্তিক কৃষক।
এমন পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনে বীজ ও সার সহায়তা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। তিনি গতকাল মঙ্গলবার আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, ‘বন্যাদুর্গত এলাকায় গবাদি পশুর জন্য শুকনা খাদ্য সরবরাহ এবং রোগপ্রতিরোধে টিকাদান কর্মসূচি শুরু করা হবে।’
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ভারী বৃষ্টিপাত ও সৃষ্ট বন্যায় অন্তত ৩৩ জেলার ১২০টি উপজেলায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদের ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ৩৩ হাজার ৯২০টি পুকুর, খামার ও ঘের। ১২ হাজার টন ফিনফিশ, দেড় হাজার টন চিংড়ি ও ১৮ কোটি ৫৭ লাখ পোনা মাছ নষ্ট হয়েছে। ৩০টি নৌকা বা ট্রলার এবং ২২০টি জালের ক্ষতি হয়েছে। অবকাঠামোগত ক্ষতির আনুমানিক পরিমাণ ৪৩ কোটি ৮২ লাখ টাকার। সব মিলিয়ে প্রাথমিক ক্ষতির পরিমাণ ৩৬৮ কোটি ৯৭ লাখ টাকার বেশি। এদিকে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর বলছে, এবারের বন্যায় গরু ৪৬, ছাগল ১২৩, ভেড়া ৪০, মুরগি ১ লাখ ১১ হাজার ১৫২ এবং হাঁস ১ হাজার ৫৭৫টি মারা গেছে। এ ছাড়া ৪ হাজার ৫৫৬টি গবাদি পশুর খামার ও ৬ হাজার ৬০টি হাঁস-মুরগির খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ খাতে প্রাথমিক ক্ষতির পরিমাণ ৭৩ কোটি ৯৯ লাখ টাকা।
গতকাল দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে বিকাল ৪টায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ— এই সাত জেলার ৫৯ উপজেলা এবং ৩৩৪টি ইউনিয়ন ও ১২টি পৌরসভা বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। দুর্গত মানুষের জন্য খোলা হয়েছে ৩২৯টি আশ্রয়কেন্দ্র। জেলাভিত্তিক হিসাবে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে কক্সবাজারে। সেখানে ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে স্থানীয় বাসিন্দা ১৮ এবং রোহিঙ্গা ১৩ জন। এ ছাড়া আহত হয়েছেন ৩৯ জন। দুর্গত মানুষের জন্য ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। এখন পর্যন্ত সাতটি বন্যাকবলিত জেলার জন্য ৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা এবং ৮ হাজার ৯৫০ টন চাল বরাদ্দ করেছে সরকার।
গতকাল সচিবালয়ে বন্যাজনিত দুর্যোগ মোকাবিলা, জরুরি সাড়াদান ও সমন্বয় বিষয়ে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা শেষে সংবাদ সম্মেলন করেছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু। তার ভাষ্য, এই বন্যায় প্রায় ৬ লাখ ৯ হাজার ৪৪১টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন পর্যন্ত ৫৬ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে, যার বেশিরভাগই পাহাড়ধসে। এর মধ্যে শুরু হয়েছে ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়ন। ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক দ্রুত মেরামত এবং দুর্গত মানুষের জন্য খাদ্যসহায়তা অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জানিয়েছেন, সম্প্রতি পাহাড়ি ঢলে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের সীমান্তবর্তী কয়েকটি গ্রাম। ভেঙে গেছে অনেকের বসতঘর ও দোকানপাট। একই সঙ্গে ঢলের পানিতে ভেসে আসা বালুতে সীমান্তসংলগ্ন বিস্তীর্ণ ফসলি জমি ভরাট হয়ে গেছে। ফলে আগামী বোরো মৌসুমে ধান চাষ নিয়ে দেখা দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তা।
ভেঙে গেল তীর সংরক্ষণকাজ
রংপুর অফিস জানায়, বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে রংপুরে। তিস্তার পানি লোকালয়ে ঢুকে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ৫০০ পরিবার। তিস্তার ভাঙনে কয়েক বছর ধরে সর্বস্বান্ত হন লালমনিরহাট সদরের হরিণচড়া ও রংপুরের গঙ্গাচড়ার সীমান্তবর্তী মর্ণেয়া ইউনিয়নের মানুষজন। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলুর উদ্যোগে চলতি বছরই ওই এলাকায় প্রায় দুই কিলোমিটার তীর সংরক্ষণের কাজ (স্থানীয়দের ভাষায় বাঁধ) করে পানি উন্নয়ন বোর্ড। ভাঙনরোধসহ তিন গ্রামের ১৫০০ পরিবারের ঘরবাড়ি রক্ষায় এ কাজেও স্বস্তি মিলল না নদীপাড়ের মানুষের। কাজ করার কয়েক মাসের মধ্যেই সেই ‘বাঁধ’ বিলীন তিস্তায়। গত সোমবার রাতে দেশের বৃহৎ সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে নদীর পানি বিপৎসীমার ১০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় ভয়াবহ রূপ নিয়েছে ভাঙন।
কক্সবাজারের চকরিয়া প্রতিনিধি জানিয়েছেন, বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও ভেসে উঠছে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র— যা দেখে হতাশায় ডুবে যাচ্ছেন ভুক্তভোগীরা। অনেকের বাড়িঘর ভেঙে গেছে, কারও বিলীন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া নদীতে মিলিয়ে গেছে অনেক কাঁচাপাকা স্থাপনা। ভিটা ও বসতি হারিয়ে অনেকেই আশ্রয় নিয়েছেন রাস্তা ও প্রতিবেশী-স্বজনের বাড়িতে। কীভাবে নিজ ভূমিতে ফিরবেন, বাড়ি তৈরির জমিইবা কোথায় পাবেন, সে চিন্তায় নিদ্রাহীন রাত কাটছে তাদের।




