মিরপুর টাউন হল
২৩ বছরেও কেউ কথা রাখেনি
- কবে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র পাবে মিরপুরবাসী

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মিরপুর-১০ মেট্রোরেল স্টেশনের পূর্ব পাশে তাকালেই চোখে পড়ে সিটি করপোরেশনের সারি সারি ময়লার গাড়ি। অথচ আশি-নব্বই দশকেও জায়গাটি ছিল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে মুখর; নিয়মিত আয়োজন করা হতো নাটক, গান, আবৃত্তিসহ নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। মিরপুরের ঐতিহ্যবাহী টাউন হলের সে চিত্র এখন বিশ্বাস করানোই দায়।
সংস্কৃতিকর্মীরা বলছেন, ২৩ বছর ধরে এখানে একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণের আশ্বাস দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেয়নি কোনো সরকারই। বরং জুলাই অভ্যুত্থানের পর দ্রুত একটি মসজিদ নির্মাণ করে জায়গাটি দখলের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ওই জায়গায় ‘অপু আমান নাট্য আসর’ আয়োজন করেছিল অপেরা নাট্যদল। দলটির সাধারণ সম্পাদক নাহিদ স্মৃতি আগামীর সময়কে বললেন, ‘আমরা ডিসেম্বরে এখানে অনুষ্ঠান করলাম। এরপর ২০২৫ সালের এপ্রিলে দেখি মুক্তমঞ্চ ভেঙে সেখানে একটি মসজিদ নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে এবং খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে কাজটি সম্পন্ন করা হয়। পাশেই তো একটি মসজিদ রয়েছে।’
তারপরও কারা, কী উদ্দেশ্যে এখানে এত দ্রুত মসজিদ নির্মাণ করলেন? কেউ কি জায়গাটি দখলের চেষ্টা করছে— প্রশ্ন নাহিদ স্মৃতির। বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধানের দাবিও জানালেন তিনি।
সাংস্কৃতিক ঐক্য ফোরামের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব আলম শাহীনের দাবি, টাউন হলের জায়গায় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড চিরতরে বন্ধ করতেই পরিকল্পিতভাবে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছে। তিনি বলছিলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানের পর হুট করে এখানে মসজিদ নির্মাণ করা হলো, অথচ আশপাশেই আরও মসজিদ রয়েছে। যদি সত্যিই মসজিদের প্রয়োজন হয়, তবে আরও অনেক জায়গা আছে। কিন্তু এখানে কী উদ্দেশ্যে এটি নির্মাণ করা হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা উচিত।’
জায়গাটিতে কারা মসজিদ নির্মাণ করছে— জানতে চাইলে সিটি করপোরেশনের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন জানালেন, সিটি করপোরেশন নিজেই নির্মাণ করছে মসজিদটি।
সরেজমিনে গেছে, খোলা জায়গাটির মাঝখানে রাখা আছে সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ি। এক পাশে রয়েছে কর্মচারী ইউনিয়নের কার্যালয়। যে স্থানে একসময় সংস্কৃতিকর্মীরা উন্মুক্ত মঞ্চ তৈরি করে অনুষ্ঠান করতেন, সেখানে এখন নির্মাণাধীন একটি মসজিদ। খোলা জায়গার সামনের সড়কে ফুটপাত দখল করে বসেছে হকারদের দোকান।
মিরপুরের মতো জনবহুল এলাকায় একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র না থাকায় কিশোর গ্যাংসহ নানা ধরনের অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে— দাবি সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সৈয়দ জামিল আহমেদের। মিরপুরে অন্তত ১০ লাখ মানুষ ২৩ বর্গমাইল এলাকায় বসবাস করে উল্লেখ করে জানালেন, এখানে মানুষের নিঃশ্বাস নেওয়া কিংবা মুক্তচিন্তা করার মতো কোনো পরিসর নেই। কিশোরদের মধ্যে যে নানা ধরনের অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে, তার একটি কারণ হতে পারে সৃজনশীল সংস্কৃতিচর্চার সুযোগের অভাব।
বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক ড. সৈয়দ জামিল আহমেদের ভাষ্য, ‘মিরপুরে একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র গড়ে তোলা খুবই জরুরি। যেখানে মানুষ তাদের সৃজনশীল আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ ঘটাতে পারবে। টাউন হল একটা সামাজিক পরিসর। এখানে মানুষ একত্র হয়ে আনন্দ-বেদনা, আশা-আকাঙ্ক্ষা ভাগাভাগি করবেন। এমন একটি জায়গা খুবই প্রয়োজন।’
সংস্কৃতিকর্মীরা ২০২২ সালে আন্দোলন করেছিলেন টাউন হল ফের চালুর দাবিতে। সে সময় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র আতিকুল ইসলাম আশ্বাস দিয়েছিলেন তিন বছরের মধ্যে মিরপুরে আধুনিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণের। এর আগে অবিভক্ত ঢাকার মেয়র সাদেক হোসেন খোকাও দিয়েছিলেন একই আশ্বাস, তবে বাস্তবায়িত হয়নি কোনো উদ্যোগই।
মিরপুরে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে সোচ্চার নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ। তার ভাষ্য, ‘এই দাবিটি বহু বছরের। একসময় যে টাউন হলটি ছিল, সে জায়গায় একটি অত্যাধুনিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণের দাবি আমরা দীর্ঘদিন ধরে জানিয়ে আসছি। কিন্তু হঠাৎ করে সেখানে মসজিদ কেন নির্মাণ করা হলো, তা খতিয়ে দেখা দরকার। মসজিদ যেমন প্রয়োজন, তেমনি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্যও জায়গার প্রয়োজন।’
মিরপুর টাউন হল ফের চালুর কোনো পরিকল্পনা আছে কি না— জানতে চাইলে বিষয়টি এড়িয়ে যান সিটি করপোরেশনের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ এস এম শফিকুর রহমান। বললেন, ‘এ বিষয়ে আমার জানা নেই।’ এদিকে সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজ নেবেন বলে জানিয়েছেন।
যে ইতিহাস হারিয়ে যাচ্ছে
ইতিহাস ঘেঁটে জানা গেছে, ১৯৭৮ সালে মিরপুর ১০ নম্বর সেকশনে তৎকালীন ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বে এবং মিরপুর উন্নয়ন কমিটির তত্ত্বাবধানে নির্মিত হয় ‘টাউন হল’। সেখানে নিয়মিত অনুষ্ঠান আয়োজন করত বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। তবে ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় ২০০৩ সালে ভেঙে ফেলা হয় ভবনটি। ২০০৫ সালে গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের জাতীয় সম্মেলনে মিরপুরে একটি আধুনিক নাট্যমঞ্চ নির্মাণের ঘোষণা দেন তৎকালীন মেয়র সাদেক হোসেন খোকা। একই বছর ফেডারেশনের ১০ দফা দাবির অন্যতম ছিল একটি ‘আধুনিক নাট্যমঞ্চ’ নির্মাণ। ২০০৭ সালে স্বাধীনতা উৎসব উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে টাউন হলের ফাঁকা জায়গায় একটি আধুনিক নাট্যমঞ্চ নির্মাণের দাবি জানিয়েছিলেন জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী। সেটি শহীদ মুনীর চৌধুরীর নামে করারও প্রস্তাব দিয়েছিলেন তিনি। পরে ২০১৩ সালে গণঅর্থায়নে সেখানে একটি মুক্তমঞ্চ নির্মাণ করেন সংস্কৃতিকর্মীরা। জাতীয় দিবসসহ বিভিন্ন উপলক্ষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো সেখানে। তবে সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ি রাখা শুরু হলে জায়গাটিকে বানিয়ে ফেলা হয় ‘ময়লার ডিপো’।
সংস্কৃতিকর্মীরা বলছেন, এই জায়গাটি দখল করার চেষ্টা চলছে অনেক বছর ধরে। একসময় সিটি করপোরেশনের কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশে জায়গাটিতে বহুতল বাণিজ্যিক মার্কেট করার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সংস্কৃতিকর্মীদের আন্দোলনের কারণে সেটি সম্ভব হয়নি। পরে জায়গাটিতে সিনেপ্লেক্স, নাট্যমঞ্চসহ সংস্কৃতিচর্চার বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধাসহ একটি ভবন করার প্রস্তাব করেন।





