বাংলা একাডেমিতে সেমিনার সিরিজ
- আবদুল হক, শহীদুল জহির, বদরুদ্দীন উমর ও শামসুর রাহমানকে স্মরণ

স্মরণসভায় উপস্থিত সদস্যরা
প্রাবন্ধিক ও লেখক আবদুল হক, কথাসাহিত্যিক শহীদুল জহির, গবেষক ও রাজনীতিক বদরুদ্দীন উমর এবং কবি শামসুর রাহমানকে স্মরণ করে দিনব্যাপী সেমিনার সিরিজ আয়োজন করেছে বাংলা একাডেমি। শনিবার বাংলা একাডেমির কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে এ আয়োজন করা হয়।
সকাল সাড়ে ১০টায় অনুষ্ঠিত আবদুল হক স্মরণসভায় ‘আবদুল হক : জীবন ও রাজনীতি’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ড. মুহম্মদ সাইফুল ইসলাম। এ আলোচনায় অংশ নেন অধ্যাপক মাহবুব বোরহান। সভাপতিত্ব করেন প্রাবন্ধিক ও গবেষক অধ্যাপক মোরশেদ শফিউল হাসান।
প্রাবন্ধিকের মতে, মননশীল সাহিত্যের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় নাম আবদুল হক। মৌলিক ও অনুবাদ নাটকের মাধ্যমে নাট্যসাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। একই সঙ্গে কথাসাহিত্যিক হিসেবেও তাৎপর্যপূর্ণ ছিলেন তিনি।
হেনরিক ইবসেনের একাধিক নাটকের অনুবাদের মাধ্যমে তিনি বাঙালি পাঠকের সঙ্গে বিশ্বসাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ স্থাপন করেন। তার প্রবন্ধ-নিবন্ধে জাতীয়তা, মুক্তবুদ্ধি ও ইহজাগতিক চেতনার যে প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে, তা বাংলা মননচর্চায় বিশেষ গুরুত্ব বহন করে বলেও উঠে আসে এ আলোচনায়।
দুপুর ১২টায় শহীদুল জহির স্মরণসভায় ‘মহল্লার অন্তঃশব্দ : শহীদুল জহিরের কথাসাহিত্যে মায়া, স্মৃতি ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সৈকত আরেফিন। আলোচনায় অংশ নেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক সুমন রহমান।
প্রাবন্ধিকের মতে, বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে এক স্বতন্ত্র ও শক্তিশালী উপস্থিতি শহীদুল জহির। পুরনো ঢাকা থেকে বাংলার গ্রামীণ জনপদের জীবন ও আত্মার স্পন্দন ধরা পড়েছে তার গল্প-উপন্যাসে। ভাষা, বিষয়বস্তু ও আঙ্গিকের বৈশিষ্ট্যে বাংলা কথাসাহিত্যে নিজস্ব এক জগৎ নির্মাণ করেছেন তিনি। জাদুবাস্তবতার রূপকল্পে তিনি বাংলার মাটি ও মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতাকে সাহিত্যিক ভাষা দিয়েছেন।
দুপুর আড়াইটায় অনুষ্ঠিত বদরুদ্দীন উমর স্মরণসভায় ‘বদরুদ্দীন উমরের রাজনৈতিক চিন্তা’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আফজালুল বাসার। আলোচনায় অংশ নেন লেখক ফয়জুল হাকিম। সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক।
প্রাবন্ধিক জানান, ইতিহাসচর্চা ও রাজনৈতিক তৎপরতায় এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব বদরুদ্দীন উমর। ভাষা আন্দোলনের প্রামাণ্য ইতিহাস রচনার পাশাপাশি তিনি চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ-পূর্ব ও পরবর্তী বাংলাদেশের। ইতিহাস বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। শ্রমিক-কৃষক ও মেহনতি মানুষের মুক্তির সংগ্রামে তার রাজনৈতিক অবস্থান এবং সাম্প্রদায়িকতা, সামন্তবাদ, পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে তার নিরন্তর সংগ্রাম বিশেষভাবে স্মরণীয়।
বিকাল ৪টায় অনুষ্ঠিত শামসুর রাহমান স্মরণসভায় ‘কবি শামসুর রাহমানের কবিতার শৈলী’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন তারানা নূপুর। আলোচনায় অংশ নেন জহির হাসান। সভাপতিত্ব করেন ফয়েজ আলম।
প্রাবন্ধিকের মতে, বাংলা কবিতার এক বিস্ময়কর উচ্চতা শামসুর রাহমান। তার কাব্যভাষা, শৈলী ও বিষয়বৈচিত্র্য বাংলা কবিতাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। ব্যক্তিমানস থেকে শুরু করে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা তার কবিতায় ব্যঞ্জনাময় শিল্পরূপ লাভ করেছে। ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং মুক্তিযুদ্ধ তার কবিতায় সাহস, সৌন্দর্য ও মানবিকতার অনন্য প্রকাশ ঘটিয়েছে।
সকালে প্রথম পর্বে ‘সেমিনার সিরিজ ২০২৫-২০২৬’-এর সূচনা পর্বে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মওলা। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম এবং ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন একাডেমির পরিচালক ড. সরকার আমিন।
অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম বলেছেন, বাংলা একাডেমি গত সপ্তাহ থেকে যে সেমিনার সিরিজ শুরু করেছে, শুধু একাডেমিতেই নয়, দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়েও অনুষ্ঠিত হচ্ছে তা। সাহিত্যের বিভিন্ন ক্ষেত্রের স্মরণীয় ব্যক্তিত্বদের নিয়ে উপস্থাপিত প্রবন্ধ ও আলোচনা সমৃদ্ধ করবে আমাদের জ্ঞানকে। নতুন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করাবে এবং নতুন পথের সন্ধান দেবে।
সরকার আমিনের ভাষ্য, এই সেমিনার সিরিজের মধ্য দিয়ে আমরা ফিরে তাকাতে পারব সেইসব প্রাজ্ঞ পূর্বসূরির দিকে, আমাদের সৃজন-মননের পরম্পরাকে শক্তি ও সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ করেছেন যারা।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে কানিজ মওলা বলেছেন, বাংলা একাডেমির উদ্যোগে শুরু হওয়া এই সেমিনার সিরিজ এরই মধ্যে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে বাস্তবায়ন হচ্ছে যৌথভাবে।
সেমিনার সিরিজের বিভিন্ন পর্ব সঞ্চালনা করেন বাংলা একাডেমির উপপরিচালক সায়েরা হাবীব এবং সহপরিচালক ড. মাহবুবা রহমান।




