এখনো বিক্রির শীর্ষে হুমায়ূন আহমেদের বই
- ফুটপাতে পাইরেটেড বইয়ের বিক্রি, অভিযোগ প্রকাশকের

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দীর্ঘদিন ধরেই রাজধানীর নীলক্ষেত বইপ্রেমীদের কাছে দুষ্প্রাপ্য ও সৃজনশীল সাহিত্যের এক চিরচেনা তীর্থভূমি। এক পড়ন্ত বিকেলে নীলক্ষেতের ফুটপাত ঘেঁষে হাঁটার সময় অবধারিতভাবেই চোখ আটকে যায় সারি সারি বইয়ের পসরায়। শত শত গাইড বইয়ের ভিড়ে সেখানে সগৌরবে মাথা উঁচু করে আছে হুমায়ূন আহমেদের বই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাফসান হাবিবের মতে, নীলক্ষেতের বইয়ের দোকানে চোখ রাখলেই বোঝা যায়, দেশের তরুণ প্রজন্মের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ কোন পথে এগোচ্ছে।
তার ভাষ্য, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও ইডেন মহিলা কলেজের মতো দেশের শীর্ষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মোহনায় দাঁড়িয়ে থাকা নীলক্ষেত শুধু একটি বাজার নয়; এটি আমাদের শিক্ষার্থীদের পাঠরুচি, চিন্তার পরিসর ও সমসাময়িক সামাজিক বাস্তবতার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।’
নীলক্ষেতের ফুটপাত থেকে শুরু করে অভিজাত বুকশপ— সবখানেই কি তবে এখনও রাজত্ব করছেন হুমায়ূন আহমেদ? দেশের অন্যতম শীর্ষ চেইন বুকশপ ‘বাতিঘর’-এর স্বত্বাধিকারী দীপঙ্কর দাশের কথাতেও মিলল সেই সত্যের প্রতিধ্বনি। তিনি স্পষ্ট করেই জানালেন, হুমায়ূন আহমেদের বইয়ের আবেদন আজও ফুরিয়ে যায়নি।
দীপঙ্কর দাশ আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘যেহেতু হুমায়ূন আহমেদের নতুন বই আর আসার সুযোগ নেই, তাই আগের মতো বাঁধভাঙা জোয়ার হয়তো নেই। নতুন বই এলে প্রথম দিকে যে বিপুল বিক্রি হয়, সেই উন্মাদনা হয়তো এখন স্তিমিত। তবে ক্ল্যাসিক বা পুরনো বই হিসেবে এর বিক্রি এখনও ভালো হয়। বাতিঘরে তো হুমায়ূন আহমেদের নামে একটি ডেডিকেটেড কর্নারই রয়েছে। অন্য বুকশপের কথা বলতে পারব না, তবে আমাদের এখানে হুমায়ূন আহমেদ এখনও বিক্রির শীর্ষে— এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়।’
হুমায়ূনের সিংহভাগ বইয়ের প্রকাশক ‘অন্যপ্রকাশ’। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্ত্বাধিকারী ও প্রধান নির্বাহী মাজহারুল ইসলাম জানান, বর্তমানে তাদের প্রকাশনায় এই কথাসাহিত্যিকের প্রায় ১১৬টি বই বাজারে রয়েছে, যার মধ্যে মৌলিক গ্রন্থ ও সংকলন দুই-ই রয়েছে।
এক জননন্দিত লেখকের মহাপ্রস্থানের এক দশকের বেশি সময় পর এই আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা যেমন আনন্দের, আবার তার বই পাইরেটেড হওয়াটা প্রকাশক হিসেবে শঙ্কার বলে জানান মাজহারুল ইসলাম।
তিনি বললেন, ‘একজন লেখকের মৃত্যুর ১৪ বছর পরও তার প্রায় সবগুলো বই নিয়মিত পুনর্মুদ্রণ (রিপ্রিন্ট) হচ্ছে– এটি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক অনন্য ও বিশাল ঘটনা। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদের বই দেদারসে পাইরেসি হয়ে ফুটপাতে বিক্রি হচ্ছে। এই অবৈধ চক্রকে কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না; বরং গত কয়েক বছরে এর প্রকোপ আরও বেড়েছে।’
সম্প্রতি জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের এক সভায় সংস্কৃতি উপদেষ্টা ডা. জাহেদুর রহমানের কাছে এই সংকটের কথা তুলে ধরেছেন বলেও জানান মাজহারুল ইসলাম। উপদেষ্টা দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।
বাংলা কথাসাহিত্যের জাদুকর হুমায়ূন আহমেদ ১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে নানার বাড়িতে জন্ম নেন। তার পৈতৃক নিবাস নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার কুতুবপুর গ্রামে। ফয়েজুর রহমান ও আয়েশা ফয়েজ দম্পতির এই কৃতি সন্তান বাংলা সাহিত্য ও নির্মাণশিল্পকে নিয়ে গেছেন এক অনন্য উচ্চতায়।
২০১২ সালের ১৯ জুলাই ক্যানসারের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াই শেষে নিউইয়র্কের একটি হাসপাতালে চিরবিদায় নেন তিনি। হুমায়ূন চলে গেছেন, কিন্তু তার সৃষ্টি আজও কোটি পাঠকের হৃদয়ে অম্লান, বিক্রির তালিকায় আজও তিনি অপরাজেয়।






