প্রস্তুতি সভায় সংস্কৃতিমন্ত্রী
নজরুল বর্ষে দেশব্যাপী ২ কোটি ৭১ লাখ টাকা বরাদ্দ

প্রস্তুতি সভায় সংস্কৃতিমন্ত্রী
যথাযথ মর্যাদায় নজরুল বর্ষ পালনের জন্য ৬৪ জেলা এবং ৭৪টি প্রত্যন্ত উপজেলা প্রশাসনকে ২ কোটি ৭১ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। তিনি বলেছেন, দেশের ৬৪টি জেলায় প্রতিটি জেলা প্রশাসনের জন্য ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং ৭৪টি প্রত্যন্ত উপজেলায় প্রতিটির জন্য ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা করে মোট ২ কোটি ৭১ লাখ টাকা এরই মধ্যে বরাদ্দ প্রদান করা হয়েছে।
গত ২৫ মে ময়মনসিংহের ত্রিশালে আয়োজিত নজরুল জয়ন্তীর অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২৫ মে ২০২৬ থেকে ২৫ মে ২০২৭ পর্যন্ত সময়কে নজরুলবর্ষ হিসেবে পালনের ঘোষণা দেন। সেই ঘোষণার আলোকে এরই মধ্যে প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়। আগামী ১৮-২০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত দেশব্যাপী ৩ দিনব্যাপী বিশেষ উদ্বোধনী কর্মসূচি পালন করা হবে।
এ উপলক্ষে আজ সোমবার সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের জাতীয় কমিটির প্রস্তুতিমূলক মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বিশ্ববাসীর কাছে নজরুল বর্ষকে তুলে ধরতে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম আমাজন ও নেটফ্লিক্সে প্রচারের উপযোগী উচ্চমানের প্রামাণ্যচিত্র ও চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রস্তাব উত্থাপিত হয় এ সভায়। এর পাশাপাশি বিশ্ব জুড়ে বাংলাদেশকে ল্যান্ড অব নজরুল হিসেবে ব্র্যান্ডিং করার ধারণা তুলে ধরা হয়, যা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যুক্তরাজ্যের ল্যান্ড অব শেক্সপিয়র পরিচিতির মতো ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছে মন্ত্রণালয়।
পাশাপাশি সাংস্কৃতিক কূটনীতিকে বেগবান করতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বিশ্ব জুড়ে নজরুলের বৈপ্লবিক চেতনা তুলে ধরা এবং বিদেশের সব বাংলাদেশি মিশনে বিশেষ আয়োজনের প্রস্তাব করা হয়। একই সঙ্গে বাংলাদেশে দায়িত্বরত বিদেশি রাষ্ট্রদূতদেরসহ সবার মধ্যে বিতরণের জন্য আন্তর্জাতিক মানের বুকলেট তৈরির পরিকল্পনাও স্থান পায় সভার আলোচনায়।
সভায় নজরুলের ঐতিহাসিক আন্তর্জাতিক সংযোগগুলোকে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্বারোপ করে তুরস্ককে নিয়ে নজরুলের সাহিত্যকর্মগুলোর সূত্র ধরে তুরস্কে কবিকে বিশেষভাবে প্রমোট করার প্রস্তাব করা হয়। নজরুলের গবেষণামূলক কর্ম ও সাহিত্য বিশ্বের প্রধান প্রধান ভাষায় সমন্বিতভাবে অনুবাদের মাধ্যমে সারা পৃথিবীতে পৌঁছে দেওয়ার প্রস্তাবনা আলোচিত হয় সভায়। এ ছাড়া আগামী জুলাই মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে বড় পরিসরে নজরুল মেলা আয়োজন, বিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে থাকা নজরুল গবেষকদের নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন এবং দেশব্যাপী নজরুলের জীবনী ও রচনার ওপর বৃহৎ প্রতিযোগিতার প্রস্তাব করা হয়। নজরুলের নির্বাচিত শ্রেষ্ঠ লেখাসমূহ নিয়ে একটি বিশেষ স্মরণিকা প্রকাশের পরিকল্পনাও সভায় উপস্থাপন করা হয়।
সভায় তরুণ প্রজন্ম ও দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে সম্পৃক্ত করতে দেশব্যাপী ‘নজরুল ট্যালেন্ট হান্ট’ ডিজিটাল কনটেন্ট প্রতিযোগিতার পাশাপাশি কবির একটি সুনির্দিষ্ট প্রমিত জীবনী প্রকাশের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়।
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব নজরুলের প্রকাশনা সমগ্র নিয়ে বইমেলা আয়োজনের বিশেষ গুরুত্বরোপ করেন। এ ছাড়া মাসভিত্তিক কর্মসূচির অংশ হিসেবে বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) কর্তৃক বিশেষ অনুষ্ঠানমালা সম্প্রচার, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় পর্যন্ত নারী মুক্তিতে নজরুলের অনন্য অবদান নিয়ে আয়োজন, ডিসেম্বর মাসে দেশাত্মবোধক নজরুল সংগীতের বৃহৎ আয়োজন এবং রমজান মাসে নজরুলের কালজয়ী হামদ-নাত নিয়ে বিশেষ অনুষ্ঠানমালার রূপরেখা প্রস্তাব করা হয়। উত্থাপিত এসব প্রস্তাবনা যাচাই-বাছাই ও পর্যালোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলে মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়।
সভাপতির বক্তব্যে সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেছেন, কবি নজরুলকে সুপরিকল্পিতভাবে অন্ধকারে নিমজ্জিত করার একটা গভীর অপচেষ্টা চালানো হয়েছিল বিগত দিনে। এমন একটি অন্ধকার যুগ আমরা পার করেছি, যে সময় স্বৈরাচারী ও সংকীর্ণ অপশক্তির মাধ্যমে স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে পাকিস্তানের দোসর ও মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী হিসেবে দেখানোর বিকৃত প্রয়াস চালানো হয়েছে। ঠিক একইভাবে, কাজী নজরুল ইসলামকেও এ দেশের মানুষের মন ও স্মৃতি থেকে চিরতরে ভুলিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা করা হয়েছিল। শহীদ জিয়া এবং জাতীয় কবি দুজনেই ছিলেন অন্যায্য অপশাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার কণ্ঠস্বর। একজন বিদ্রোহ করেছিলেন ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে, আরেকজন অস্ত্র হাতে গর্জে উঠেছিলেন পাকিস্তানি হানাদারের বিরুদ্ধে। সেই দীর্ঘ অন্ধকার যুগের অবসান ঘটেছে আজ ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে দেশে এক নতুন জাগরণ, একটি সাংস্কৃতিক রেনেসাঁ শুরু হয়েছে। নতুন এই যুগের সূচনাতেই নজরুলই আমাদের সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর এবং সাহসের অনন্য অনুপ্রেরণা।
সভায় সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলি নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম, মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মওলাসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বাংলা একাডেমি, নজরুল ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক এবং দেশের খ্যাতিমান নজরুল গবেষক ও জাতীয় কমিটির সম্মানিত সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।




