র্যাবের সাবেক কর্মকর্তার সাক্ষ্য
গুমের সহযোগী ছিলেন আলকাস মাঝি, পরে তাকেও গুম করেন জিয়াউল আহসান

ট্রাইব্যুনালে জিয়াউল আহসান। ফাইল ছবি
জিয়াউল আহসান। শতাধিক ব্যক্তিকে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। আছে মানবতাবিরোধী অপরাধের একাধিক মামলা। সেনাবাহিনী থেকে হারিয়েছেন চাকরিও। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এসব হত্যাকাণ্ড ঘটানোর অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। হত্যার পর কীভাবে লাশ গুম করতেন জিয়াউল, সে বিষয়ে সাক্ষ্য দিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শী র্যাবের সাবেক কর্মকর্তা অবসরপ্রাপ্ত মেজর সাব্বির রহমান ওসমানী।
জবানবন্দিতে র্যাবের এই কর্মকর্তা জানান, ২০১০ সালের মে মাসে বিডিআর হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী নজরুল ইসলামসহ চারজনকে এবং বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও সরকারের সমালোচক হিসেবে চিহ্নিত অন্তত ১৫ জন ভিকটিমকে গুলি করে হত্যার পর পেট চিরে সিমেন্টের বস্তা বেঁধে নদীতে ডুবিয়ে দেওয়া হয়। এসব হত্যাকাণ্ডকে জিয়াউল আহসান সাংকেতিক ভাষায় বলতেন ‘গল্ফ অপারেশন’। তার অনেক অপারেশনের সহযোগী ছিলেন আলকাস মাঝি। অপকর্মের তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়ার শঙ্কায় একপর্যায়ে তাকেও গুম করেন জিয়াউল।
বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ এই সাক্ষ্য অনুষ্ঠিত হয়। মামলার একমাত্র আসামি সাবেক এনটিএমসি মহাপরিচালক বরখাস্তকৃত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান। অভিযানগুলো পরিচালনার সময় তিনি র্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক ছিলেন।
সাব্বির রহমান ওসমানি বলেছেন, সুন্দরবন ও বরিশাল অঞ্চলে র্যাবের অভিযানে আটক ব্যক্তিদের হত্যা করে ‘বন্দুকযুদ্ধের’ ঘটনা সাজানো হতো। জিয়াউল আহসানের পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় এসব অভিযান পরিচালিত হতো।
সাব্বির রহমান ওসমানীর বলেন, ২০১০ সালের জানুয়ারিতে বরিশালের চরদুয়ানী থেকে একটি ট্রলারে করে মোহনার দিকে যাওয়ার পর তার সামনে এক ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
তার ভাষ্য, গুলি করার আগে ধরে আনা ব্যক্তির গলা ও পা বরাবর দুটি সিমেন্ট ভর্তি বস্তা বাঁধা হতো। পরে একজন র্যাব সদস্য তাকে মাথা ও কান বরাবর একটি ছোটো বালিশ ঠেকিয়ে পিস্তল দিয়ে এক রাউন্ড ফায়ার করত। তারপর একজন ওই গুলিবিদ্ধ ব্যক্তির পেট কেটে ফেলতেন। আরেকজন গুলিবিদ্ধ ব্যক্তির কাটা পেটে হাত ঢুকিয়ে পেট কাটার সঠিকতা নিশ্চিত করতেন। এরপর জিয়উল আহসান সবকিছু ঠিক আছে মর্মে সিগন্যাল দিলে গুলিবিদ্ধ ব্যক্তিকে পানিতে ফেলে দেওয়া হতো।
২০১০ সালের মে মাসে একই ধরনের অভিযানে চারজনকে হত্যা করে পানিতে ফেলে দেওয়া হয়। পরে দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে বলেশ্বর নদীতে পেট কাটা ও সিমেন্টের বস্তা বাঁধা একটি মরদেহ ভেসে ওঠার খবর পাওয়া যায়। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ওই মরদেহ সাবেক বিজিবি সদস্য নজরুলের বলে শনাক্ত হয়।
জবানবন্দি ও প্রসিকিউশনের ভাষ্যমতে, নজরুল ছিলেন বিডিআর বিদ্রোহের প্রত্যক্ষদর্শী। নদী থেকে যখন নজরুলের লাশ ভেসে ওঠে, তখন জিয়াউল আহসান বিষয়টি নিয়ে আর কোনো বাড়াবাড়ি বা তদন্ত না করে কেবল ফলোআপ করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন। এর মধ্য দিয়ে বিডিআর হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শীদের মুখ বন্ধ করতেই তাদের পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছিল বলে আদালতে তথ্য উঠে আসে।
জবানবন্দিতে সাব্বির ওসমানী ২০১১ ও ২০১২ সালে সুন্দরবনের নিশানখালী, কটকা ও মরা ভোলা এলাকায় পরিচালিত তিনটি অভিযানকেও সাজানো বলে দাবি করেন সাব্বির রহমান ওসামানি।



