যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল
অনিশ্চয়তায় বাংলাদেশ-ভারত আন্তঃসরকার বৈঠক
- জানুয়ারিতে বৈঠকের কথা থাকলেও করেনি ইউনূস সরকার
- নির্বাচনের দোহাই দিয়ে পেছায় মার্চে, ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত
- দিল্লি এখনো ঢাকাকে চিঠি দেয়নি

গ্রাফিক্স: আগামীর সময়
ভারতবর্ষে প্রথম রেললাইন চালু হয় সেই ১৮৫৩ সালে। তখনকার বোম্বেতে ট্রেন চালুর পর বাংলাকে খুব বেশি অপেক্ষা করতে হয়নি। মাত্র ৯ বছর পর এদিকে রেলের দেখা মেলে ১৮৬২ সালে। চুয়াডাঙ্গার দর্শনা থেকে কুষ্টিয়ার জগতি পর্যন্ত রেলপথ স্থাপনের মধ্য দিয়ে রেলযুগে প্রবেশ করেছিল বাংলা ভূখণ্ডও। এরপর সময় গড়িয়েছে, সঙ্গে গড়িয়েছে রেললাইনের শাখা-প্রশাখা। বাংলাদেশ স্বাধীনের পরও রয়ে গেছে এই শাখা-প্রশাখাগুলো। সেসব পথে দুদেশের মধ্যে চলাচলের জন্য নতুন করে তৈরি হয়েছে আরও কিছু রেললাইন ।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের জন্য রেলপথ আছে (ইন্টারচেঞ্জ) আটটি। যদিও এখন সচল আছে পাঁচটি। এর মধ্যে তিনটি পথে কিছুদিন আগেও নিয়মিত চলাচল করত যাত্রীবাহী ট্রেন। চলাচল করেছে পণ্যবাহী ট্রেনও।
চব্বিশের গণআন্দোলনের সময়ে বন্ধ হয়ে যায় দুদেশের রেল যোগাযোগ। তারপর পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল শুরু হলে যাত্রীবাহী ট্রেন এখনো বন্ধ। সবুজসংকেত না মেলায় খুলছে না এই পথ। যদিও যোগাযোগের স্বার্থে বাংলাদেশ রেলওয়েতে বিনিয়োগ আছে ভারতের। সব মিলিয়ে দুই দেশের ট্রেন চলাচলসহ নানা ইস্যুতে প্রতিবছর হয়ে থাকে আন্তঃসরকার বৈঠক। সর্বশেষ বৈঠক হয়েছিল দিল্লিতে। ধারাবাহিকতায় এবার বৈঠক হওয়ার কথা ঢাকায়।
সূচি অনুযায়ী, কথা ছিল এই বছরের জানুয়ারিতে হবে বৈঠক। কিন্তু জাতীয় নির্বাচনের কথা বলে সেই বৈঠক থেকে পিছিয়ে আসে অন্তর্বর্তী সরকার। তখন বলা হয়, ভোটের পর বৈঠকের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে নির্বাচিত সরকার। এরপর অবশ্য মার্চে বৈঠকের জন্য সম্ভাব্য সময় ধরে প্রস্তুতি এগোতে শুরু করে বাংলাদেশ রেলওয়ে। কিন্তু তাতে এখন পড়েছে ভাটা। এরই মধ্যে একাধিক প্রস্তুতি সভা হলেও কাজের কাজ কিছুই এগোচ্ছে না।
রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্রের তথ্য বলছে, গেল ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে এবং মার্চের মাঝামাঝি দুই দফা আন্তঃসরকার বৈঠকের এজেন্ডা এবং অন্যান্য বিষয় নির্ধারণ করতে নিজেদের মধ্যে হয় আলোচনা। সেখান থেকে বৈঠকে যেসব বিষয় তোলা হবে, তা করা হয় প্রায় চূড়ান্ত।
বৈঠকটি মার্চে হওয়ার কথা ছিল। আগেরবার দিল্লিতে হয়েছিল, এবার বাংলাদেশে হবে। উভয় দেশের মিউচুয়ালি কনভিনিয়েন্ট টাইমে বৈঠকে বসা হবে
ফাহিমুল ইসলাম, সচিব, রেলপথ মন্ত্রণালয়
বৈঠকটি দুই দেশের সময়ের ওপর নির্ভর করছে বলে মনে করছেন রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব ফাহিমুল ইসলাম। তার কথায়, ‘বৈঠকটি হওয়ার কথা ছিল মার্চে। আগেরবার হয়েছিল দিল্লিতে, এবার হবে বাংলাদেশে। উভয় দেশের মিউচুয়ালি কনভিনিয়েন্ট টাইমে বসা হবে বৈঠকে।’
কেন বারবার পেছাচ্ছে বৈঠক, কূটনৈতিক কোনো জটিলতায় বিষয়টি আটকে আছে কি না? ভারতের সঙ্গে আলোচনায় বসতে সরকারের সবুজসংকেত পাওয়া গেছে কি না? এমন আরও কয়েকটি প্রশ্নে নীরব ছিলেন রেলের সচিব।
তবে সংশ্লিষ্ট একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয় আগামীর সময়ের। আলোচনা করে বোঝা গেছে, বৈঠকের বিষয়ে দিল্লি দেবে একটি চিঠি। আবার দিল্লিকেও ঢাকা থেকে দিতে হবে চিঠি। দুটির কোনোটাই হয়নি এখনো।
রেলওয়ে থেকে রেলপথ মন্ত্রণালয়কে প্রস্তুতি সভার খবরাখবর হয়েছে জানানো। বিপরীতে রেলমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের দপ্তর থেকে এখনো করা হয়নি কোনো আলাপ। ফলে সিদ্ধান্তের পথ-সময় চলে যাচ্ছে আরও দূরে।
নাম প্রকাশ না করা শর্তে উচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তার মন্তব্য, ‘এটি সরকারের একেবারে উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্ত। প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর ঠিক হলে এই বৈঠক চূড়ান্ত হয়ে যাবে এক দিনেই। এখন সরকার কী চাইছে, সেটিই বড় কথা।’
আলোচনায় গুরুত্ব পাবে বন্ধ থাকা যাত্রীবাহী ৩ ট্রেন
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ঘিরে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যে নিরাপত্তাঝুঁকির কথা উল্লেখ করে ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই দেশের অভ্যন্তরে সব ধরনের ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দিয়েছিল রেলওয়ে। বন্ধ হয়ে যায় বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ট্রেন চলাচলও। এরপর ১২ আগস্ট সারা দেশে ট্রেন চলাচল শুরু হয়। কিন্তু তারপর এত দিনেও বাংলাদেশ-ভারত যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল চালু করা যায়নি।
ওই বছরের ১৭ জুলাই রাতে মিতালী এক্সপ্রেস ট্রেনটি নিউ জলপাইগুড়ি থেকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট স্টেশনে পৌঁছায়। ট্রেনটি পরদিন রাতে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে নিউ জলপাইগুড়ির উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ট্রেনটির যাত্রা করা সম্ভব হয়নি।
তারপর দীর্ঘদিন মিতালী এক্সপ্রেস ট্রেনের খালি ‘রেক’ ঢাকা রেলওয়ে স্টেশনে ছিল আটকে। পরে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থায় ট্রেনের রেক পৌঁছে দেওয়া হয় ভারত সীমান্তে। আর ঢাকা-নিউ জলপাইগুড়ির মধ্যে চলাচলকারী মিতালী এক্সপ্রেস ট্রেনসহ ঢাকা-কলকাতার মধ্যে চলাচলকারী মৈত্রী এক্সপ্রেস এবং খুলনা-কলকাতার মধ্যে চলাচল করা বন্ধন এক্সপ্রেস ট্রেনগুলো রয়েছে বন্ধ।
এরপর অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় বসে ট্রেন চলাচল চালু করতে তিনবার চিঠি দেয় ভারতকে। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি তাতে। রেলওয়ে থেকে ২০২৫ সালের আগস্টে আবারও চিঠি দিতে নেওয়া হয় প্রস্তুতি। তাতে রাজি হয়নি ইউনূস সরকার। নির্বাচিত সরকারের ওপর ছেড়ে রাখা হয় সেই ভার।
তখন ভারতের বাহানা ছিল 'নিরাপত্তাঝুঁকি'। সেই ঝুঁকি আজও কাটেনি! যদিও কোনো চিঠির আনুষ্ঠনিক জবাব দেয়নি ভারত সরকার। ফলে ২১ মাস ধরে বন্ধ রয়েছে আন্তঃদেশীয় মৈত্রী, মিতালী ও বন্ধন এক্সপ্রেস।
বৈঠকে আলোচ্যসূচিতে আরও যা থাকছে
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় রেল যোগাযোগব্যবস্থা-সংক্রান্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে ৩৮তম ইন্ট্রা-গভর্নমেন্ট রেলওয়ে মিটিং (আইজিআরএম) হওয়ার কথা। গত বছরের ৬ অক্টোবর বাংলাদেশ রেলওয়েতে আন্তঃসরকার রেলওয়ের বৈঠকের আলোচ্যসূচি নিয়ে হয় প্রস্তুতিমূলক ওই সভা। পরে ২৩ অক্টোবর সভার কার্যবিবরণী চূড়ান্ত করে তাতে স্বাক্ষর করেন রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব। এরপর গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ও ১২ মার্চ হয় আরও দুটি প্রস্তুতিমূলক সভা।
সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আন্তঃদেশীয় মৈত্রী, মিতালী ও বন্ধন এক্সপ্রেস ট্রেন আবার চালু করার বিষয়ে আগের চিঠির ধারাবাহিকতায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে রেলপথ মন্ত্রণালয় আবারও চিঠি দেবে ভারতকে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে চলাচলরত যাত্রীবাহী ট্রেনের সঙ্গে যাত্রীদের অতিরিক্ত মালপত্র পরিবহনের জন্য লাগেজ ভ্যান সংযুক্ত করার বিষয়ে ভারতীয় রেলওয়েকে পাঠানো হবে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব।
এরই মধ্যে রাজশাহী-কলকাতা রুটে নতুন ট্রেন পরিচালনার বিষয়ে অনুমোদন চেয়ে মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ভারতীয় রেলওয়ে বোর্ডকে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে।
আবার বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যাত্রীবাহী মৈত্রী এক্সপ্রেস ট্রেনের চলাচলের পথ বদল করতে চায় রেলওয়ে। নতুন পথে পদ্মা সেতুকে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে বাংলাদেশের। তাই পদ্মা সেতু দিয়ে মৈত্রী এক্সপ্রেস ট্রেন পরিচালনার বিষয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ভারতীয় রেলওয়েকে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠাবে বাংলাদেশ রেলওয়ে। এ প্রস্তাবে উল্লেখ করা হবে রাতের বেলা ট্রেন পরিচালনার বিষয়টিও।
ট্রেন চালুর আগে ভিসার স্বাভাবিকতা দরকার
দুই দেশের মধ্যে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল আবার শুরু হলে ঢাকায় ‘বন্ধ’ থাকা ভিসার প্রক্রিয়া চালু করতে হবে ভারতকে। যদিও ভারতের দিক থেকে বাংলাদেশকে এখনো যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচলের জন্য নিরাপদ মনে করা হচ্ছে না। তাই পণ্যবাহী ট্রেন চলাচলের অনুমতি দেওয়া হলেও বন্ধ রাখা হয়েছে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যাত্রীবাহী ট্রেন চালানোর বিষয়ে গত বছরের আগস্টে ভারতীয় রেলওয়ে বোর্ডের সঙ্গে বাংলাদেশ রেলওয়ে কয়েকবার অনানুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় যোগাযোগ করে। তবে তাতে সায় দেয়নি ভারত। এরপর গত বছরের ১৯ আগস্ট বাংলাদেশ রেলওয়ের পরিচালন বিভাগের এক চিঠির বিপরীতে পণ্যবাহী ট্রেন চালুর বিষয়ে অনুমতি দেয় ভারত। ওই রাতেই পণ্যবাহী ট্রেন চলাচলে অনাপত্তি পায় বাংলাদেশ।
ট্রেন চালানোর জন্য রেলওয়ের সব প্রস্তুতি আছে; কিন্তু ট্রেন চালু হলে যাত্রী পাওয়া যাবে কোথায়- এমন প্রশ্ন তুলেছেন বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন। তার কথা 'ট্রেন চালানোর সব প্রস্তুতি আছে, দরকার অনুমতি। তবে ট্রেন চালুর আগে ভিসা প্রক্রিয়া স্বাভাবিক হওয়া দরকার।'
তিনি যোগ করেন, 'হাজার যাত্রীর জায়গায় ৫০ যাত্রী পাওয়া গেলে তো ট্রেন চালানো কঠিন হবে।'

