আবার মূল্যবান মতিঝিল

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
একসময় দেশের অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র ছিল রাজধানীর মতিঝিল। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেই রূপ হারিয়ে গিয়েছিল তীব্র যানজট, পার্কিং সংকট এবং নতুন ঢাকার সঙ্গে এর দূরত্বের কারণে। অপরিকল্পিত ট্রাফিকব্যবস্থার ফলে বিগত দেড়-দুই দশকে বহু সরকারি প্রতিষ্ঠান ছাড়াও করপোরেট এবং বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান মতিঝিল ছেড়ে স্থানান্তরিত হয়েছিল গুলশান, বনানীর দিকে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র, পিডিবির মূল ভবন, আমেরিকান লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানি (আলিকো), বিটিআরসি কার্যালয় কিংবা পানি ভবনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো রাজধানীর অন্যত্র ঘাঁটি গেড়েছে। তবে মেট্রোরেল চালু হওয়ার পর এই সমীকরণ পাল্টে গেছে। মেট্রোরেলে ভর করে মতিঝিল আবারও সেই পুরনো ঐতিহ্য ও জৌলুশ ফিরে পেতে শুরু করেছে।
২০২৩ সালের ৪ নভেম্বর উত্তরা থেকে সরাসরি মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেল চালু হয়। পরদিন থেকে এটি উন্মুক্ত করা হয় জনসাধারণের জন্য। মূলত এরপর থেকেই বাণিজ্যিক এলাকা মতিঝিল আবারও পুরনো মেজাজে ফিরতে শুরু করে। মেট্রোরেলে চড়ে সহজেই উত্তরা, মিরপুরসহ নগরীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মতিঝিলে পৌঁছানো এখন বেশ সহজ। এই পরিবর্তনের কারণে রাজধানীর যোগাযোগব্যবস্থায় এক অভাবনীয় বিপ্লব ঘটেছে গত কয়েক বছরে। মেট্রোর কারণে চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ীদের দৈনন্দিন যাতায়াতের সময় নেমে এসেছে অর্ধেকের বেশি কম সময়ে। ফলে দীর্ঘদিনের যানজটের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি মিলেছে নগরবাসীর। আবার যেসব প্রতিষ্ঠান কয়েক বছর আগেও গুলশান, বনানী, উত্তরার দিকে যাবে যাবে করছিল, তারাও মেট্রো চালুর পর সহজ যোগাযোগ এবং বাণিজ্যিক অবকাঠামোর সুবিধার কারণে বদলেছে সেই সিদ্ধান্ত।
বছর দেড়েক আগে মতিঝিলে চালু হওয়া একটি রেস্তোরাঁর ম্যানেজার রহমতউল্লাহ আগামীর সময়কে বললেন, আগের চেয়ে মতিঝিলে অফিসের সংখ্যা বেড়েছে। মেট্রো হয়েছে। তাই রেস্তোরাঁর মালিক মতিঝিলকেই উপযুক্ত মনে করছেন ব্যবসার জন্য। ওই রেস্তোরাঁর পাশেই বছরখানেক আগে চালু হওয়া আরেকটি রেস্তোরাঁর ভেতরে ঢু মেরে ভিরাভাট্টা দেখে বোঝা গেল বেচাকেনা ভালোই। মধুমিতা সিনেমা হলের পাশে দেখা গেল আরও একটি রেস্তোরাঁ হচ্ছে। দায়িত্বরত মোহাম্মদ ইউসুফ জানালেন, মাসখানেকের মধ্যেই চালু হবে এটি। এই উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, মতিঝিলে জনসমাগম বাড়ছে, তাই এখানে ব্যবসা শুরুর সিদ্ধান্ত নেওয়া।
কথা হচ্ছিল রহমান চেম্বার নামে একটি বহুতল ভবনের নিরাপত্তাকর্মীর সঙ্গে। তিনি জানিয়েছেন, এখন মতিঝিলের ভবনগুলো খুব একটা খালি পাওয়া যায় না। পাঁচ-সাত বছর আগে কিছুটা ফাঁকা থাকলেও এখন ফাঁকা স্পেস ভাড়া হয়ে যায় দ্রুত। মাস দু-এক আগেও তাদের ভবনের দশতলায় একটি ট্রাভেল এজেন্সি এসেছে।
ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিটের (ডিএমটিসিএল) তথ্য অনুযায়ী, মেট্রোরেলে প্রতিদিন তিন লাখেরও বেশি মানুষ যাতায়াত করছেন, যার একটি বিশাল অংশই নামছেন মতিঝিল এবং প্রেস ক্লাব স্টেশনে। ডিএমটিসিএল বলছে, মেট্রোরেল চালুর ফলে উত্তরা থেকে মতিঝিলে যাতায়াতের সময় দু-তিন ঘণ্টা থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৪০ মিনিটের নিচে। সময় ও কর্মঘণ্টার এই সাশ্রয়ই আসলে মতিঝিলকে আবার ঢাকার মূল বাণিজ্যিক হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করছে।
জনতা ব্যাংকে কর্মরত এক নারী কর্মকর্তা বললেন, মেট্রো চালুর আগে অনেক সকালে বাসা থেকে বের হতে হতো অফিস ধরার জন্য। কিন্তু এখন উত্তরা থেকে হাতে এক ঘণ্টা সময় নিয়ে বের হলেই দিব্যি অফিসে পৌঁছানো যায়। কখনো কখনো সময় বেঁচেও যায়।
বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এআরআই) এবং বিশ্বব্যাংকের সমীক্ষা পর্যালোচনায় দেখা গেছে, মেট্রোরেল চালুর আগে ঢাকায় যানজটের কারণে দৈনিক প্রায় ৩৮ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হতো। তবে মেট্রো চালুর পর উত্তর ঢাকা থেকে মতিঝিলগামী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দৈনিক গড়ে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা সময় বাঁচছে, যা সরাসরি কর্মীদের কর্মদক্ষতা বাড়িয়ে দিয়েছে।
মতিঝিলে অফিস, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, রেস্তোরাঁর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে চালু হয়েছে দূরপাল্লার বাস কাউন্টারও। ঢাকা-কক্সবাজার রুটে চলাচল করা একটি বাস কাউন্টারের ব্যবস্থাপক সাদেক আহমেদ বাবু জানিয়েছেন, দুই মাস হলো কাউন্টারটির বয়স। মতিঝিলেই কেন কাউন্টারটি করা হলো জানতে চাইলে তার একবাক্যে জবাব, মেট্রোরেল। তার মতে, যাতায়াত সহজ হওয়ায় এখন মতিঝিল আবারও বাণিজ্যিক হাবে পরিণত হচ্ছে।
মতিঝিল ঘুরে দেখা গেল, এসবের বাইরেও সম্প্রতি বিভিন্ন ব্যাংকের এটিএম বুথ, মিষ্টির দোকানের চেইন শপ হয়েছে এখানে। আগে যেসব জায়গা সন্ধ্যার পর মোটামুটি ফাঁকা থাকত, এখন অনেক রাত পর্যন্ত জেগে থাকে এই এলাকা। মেট্রোস্টেশন চালুর পর গুলশান-বনানী ছেড়ে অনেক বড় প্রতিষ্ঠান আবারও ফিরছে মতিঝিলে। তবে সরেজমিনে দেখা গেছে, পুরনো প্রতিষ্ঠান ফেরার চেয়ে এখানে নতুন চালু হওয়া অফিসের সংখ্যা বেশি।
নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মতিঝিলে নতুন কোনো প্রতিষ্ঠান তাদের অফিস চালু করছে, এর মানে মতিঝিল আবারও মানুষের গ্রহণযোগ্যতা ফিরে পেতে শুরু করেছে।
রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীদের মতে, মতিঝিল পুরনো রূপে ফেরার সঙ্গে সঙ্গে এই এলাকার বাণিজ্যিক স্পেসের চাহিদা আবারও বাড়তে শুরু করেছে। রিয়েল এস্টেট এবং প্রপার্টি লিস্টিং পোর্টালগুলোর তথ্যানুযায়ী, গুলশান-বনানীতে প্রাইম বাণিজ্যিক ভবনের ভাড়া প্রতি বর্গফুট প্রায় ১৬০ থেকে ২২০ টাকা পর্যন্ত। বিপরীতে মতিঝিলে
মানসম্মত অফিসের ভাড়া গড়ে ৮০ থেকে ১৩০ টাকা। এ কারণে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত পরিচালনা খরচ সাশ্রয় করতে অনেক মাঝারি ও বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান মতিঝিলে ফেরার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিহ্যাব জানিয়েছে, মেট্রোস্টেশন চালু হওয়ার পর থেকে পুরানা পল্টন, মতিঝিল, দিলকুশা এলাকায় নতুন করে কমার্শিয়াল স্পেস খোঁজা এবং লিজিংয়ের হার বিগত সময়ের তুলনায় গড়ে ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ বেড়েছে। পাশাপাশি কোথাও কোথাও এই স্পেসগুলোর ভাড়াও বেড়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আবাসন খাতের উদ্যোক্তা এবং প্রপার্টি অ্যাসেট ম্যানেজারদের মতে, মেট্রো চালুর পর এর স্টেশনগুলোর ৩০০-৫০০ মিটারের মধ্যে বাণিজ্যিক ভবনের ভাড়ার চাহিদা এখন ঊর্ধ্বমুখী।
রিহ্যাবের সিনিয়র সহসভাপতি আবদুর রাজ্জাক আগামীর সময়কে বলেছেন, একসময় মতিঝিল একটা বড় ধাক্কা খেয়েছে যানজটসহ অন্যান্য কারণে। ফলে অনেক বড় প্রতিষ্ঠান অন্যত্র চলে গিয়েছিল। এখন খরচ বাঁচাতে কারও কারও মতিঝিলে ফেরাটা অস্বাভাবিক নয়, নতুন কিছু প্রতিষ্ঠানও হচ্ছে মতিঝিলে। এ ছাড়া মেট্রো একটা সুবিধা তো দিচ্ছেই।
নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, মেট্রোরেলের সংযোগ মানুষ এবং প্রতিষ্ঠানকে মতিঝিলমুখী করছে এবং মতিঝিলকে একটি সমন্বিত হাবে রূপান্তর করেছে। তবে তাদের শঙ্কা এখনো মতিঝিলে ড্রেনেজ, যত্রতত্র পার্কিং ও পথচারীদের হাঁটার সুব্যবস্থার অভাব রয়েছে, যা ভবিষ্যতে মতিঝিলকে আবারও নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে। এ বিষয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আকতার মাহমুদ বলেছেন, যাতায়াতে সুবিধা হওয়ায় কিছু মানুষ বা প্রতিষ্ঠান মতিঝিলে ফিরছে। তাই এখন থেকেই সিটি করপোরেশনকে এই এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসন, পরিবহন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে গুরুত্ব দিতে হবে। তাহলে মতিঝিলই হয়ে উঠতে পারে ঢাকার সবচেয়ে সুপরিকল্পিত বাণিজ্যিক এলাকা।



