ম্যানহোলের ঢাকনা কোথায় যায়, কীভাবে ফেরে

সংগৃহীত ছবি
ম্যানহোলের ঢাকনা প্রায়ই উধাও হয়ে যায়, কর্তৃপক্ষ সেগুলো আবার নতুন করে স্থাপন করেন। চুরি আর প্রতিস্থাপনের চক্র থামাতে এবার ফাইবার-রেজিনের ঢাকনায় ভরসা রাখছে সিটি করপোরেশন। সেই বদলে যাওয়ার গল্প লিখেছেন নাজির হোসেন।
শিশু ইসমাইল হোসেন নীরবকে মনে আছে? ২০১৫ সালের ৮ ডিসেম্বর রাজধানীর শ্যামপুরে ঢাকনাবিহীন ম্যানহোলে পড়ে গিয়েছিল। এই ড্রেন সেই ড্রেন হয়ে শেষমেশ বুড়িগঙ্গা নদীর শেষপ্রান্ত থেকে উদ্ধার হয়েছিল তার অচেতন দেহ। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ। নীরবের দুই হাত, মুখ, নাকের ডগাসহ নানা জায়গায় ছিল জখমের চিহ্ন। ড্রেনের মধ্যে দিয়ে ছোট্ট শরীরটি যেতে যেতে নিশ্চয়ই ভয়ে আর ব্যথায় ডাকছিল ‘মাকে’। ও হয়তো এ-ও বলছিল, ‘তোমরা ম্যানহোলে ঢাকনাটা কেন খুলে রেখেছ? আমিতো এর গভীর অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছি!’
নীরবের মৃত্যুও এ শহরের নগর পিতাদের নীরবতা ভাঙতে পারেনি। ভাঙলে হয়তো এমন ঘটনা আর ঘটত না। তবে বাস্তবে আজও প্রতিনিয়ত ঘটছে এমন ঘটনা। নীরবের পরও বহু প্রাণ হারিয়ে গিয়েছে ম্যানহোলের গভীর অন্ধকারে। মূলত ম্যানহোলের ঢাকনা চুরিই এর জন্য দায়ী। ঢাকনাগুলো কোথায় চলে যায়, আবার কীভাবেইবা ফিরে আসে? মাস তিনেক আগের ছোট্ট আরও একটা উদাহরণ দিই।
রাজধানীর টিকাটুলী এলাকার শেরেবাংলা স্কুলের মোড়। তিনটি সরু রাস্তা মিলেছে এখানে। সরু হলেও ব্যস্ততম সড়ক। হঠাৎ একদিন দেখা গেল মোড়ের ম্যানহোলটির ঢাকনা উধাও। পরদিনও চিত্র প্রায় একই, তবে সামান্য তফাত আছে। সেটা কী? এবার ম্যানহোলটির উধাও হওয়া ঢাকনার জায়গায় যুক্ত হয়েছে বাঁশের কঞ্চিতে টানানো লাল কাপড়ের নিশান। সপ্তাহখানেক এমনই চলল। পথচারী বা গাড়ির চালকরা চলতে শুরু করলেন সন্তর্পণে।
ঢাকায় চলাফেরা করে শহরের কোনো এক মূল রাস্তায় কিংবা পরিচিত-অপরিচিত কোনো অলিগলিতে ম্যানহোলের ঢাকনা নাই— এমন দৃশ্য প্রতিদিনের না হলেও এটি হরহামেশাই দেখা যায়। ব্যাপারটা শুধু এখানেই সীমাবদ্ধ থাকে না, ঢাকনা না থাকায় সেখানে যেন কেউ পড়ে না যায় সেজন্য প্রথমে কোনো এক হৃদয়বান ব্যক্তি আশপাশ থেকে গাছের একটি ডাল নিয়ে ঢাল হিসেবে সেখানে পুঁতে দেন। তারপর সেটি নেতিয়ে পড়লে কেউ একজন হয়তো একটা বাঁশ ঠায় দাঁড় করিয়ে মাথায় পলিথিন ব্যাগ বা কুড়িয়ে পাওয়া একখণ্ড কাপড় বেঁধে রাখেন, যা দেখে বাকিরা বুঝে নেয় একটু ‘ডানে’ বা ‘বামে’ সরে পথ চলতে হবে।
সাধারণ মানুষ এসব ব্যবস্থা নিলেও কর্তৃপক্ষের চোখ তুলে তাকানোর সময় হয় না। এর মধ্যে যে কাজটা খুব হয়, খোলা ম্যানহোলের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কমবেশি সবাই ‘যথাযথ কর্তৃপক্ষের’ চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করেন। তারপর কোনো একদিন বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে যাওয়া ম্যানহোলের গর্তে কেউ পা পিছলে বা চাকা আটকে রিকশা যাত্রীসমেত পানিতে পড়ে আহত হন। কখনো এলাকার মানুষের কপাল ভালো হলে সরকারি কর্মকর্তার দামি গাড়ি জায়গামতো আটকে যায়। এমন ঘটনা ঘটলে নালিশ পৌঁছায় কর্তৃপক্ষের দুয়ারে।
জেনে নিই লোহার তৈরি ম্যানহোলের এ ঢাকনাগুলো হুটহাট কোথায় চলে যায়। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১১টির মতো ঢাকনা চুরি হয়। ডিএসসিসি কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, বছরে দুই হাজারের মতো ম্যানহোলের ঢাকনা চুরি হয়। যার বাজারমূল্য প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকা। দুই সিটি মিলে যা দাঁড়ায় ৭ থেকে ৮ কোটি টাকা।
বেশিরভাগ সময়ই ঢাকনাগুলো রাতের আঁধারে মাদকসেবনকারীরা চলার পথ ‘নিজেদের মনে করে’ নিয়ে যায়। বিক্রি করে চেনা জায়গায়।
নানা উপায়ে ঢাকনা না থাকার খবর সিটি করপোরেশনে পৌঁছায়। পরে প্রক্রিয়া মেনে ঢাকনা কেনা ও প্রতিস্থাপন করা হয়।
তবে আশার খবর এ চুরি ঠেকাতে ডিএসসিসি একটি উদ্যোগ নিয়েছে। তারা লোহার পরিবর্তে ফাইবার-রেজিনের ঢাকনা ব্যবহার শুরু করেছে সংস্থাটি। এরই মধ্যে ঢাকার বেশ কিছু এলাকায় বুয়েট টেস্টে মানোত্তীর্ণ এসব ঢাকনার পরীক্ষামূলক ব্যবহারও শুরু করেছে তারা। এ বিষয়ে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম আগামীর সময়কে বলেছেন, ম্যানহোলে ফাইবার-রেজিনের ঢাকনা ব্যবহারের কারণে চুরি কমেছে। খরচ সামান্য বেশি হলেও এটি কাজে আসছে। ভবিষ্যতে চেষ্টা করব নতুন করে এই ঢাকনার ব্যবহার বাড়াতে।
প্রাথমিকভাবে ডিএসসিসি তিন ক্যাটাগরির ফাইবারের ঢাকনা তৈরি করছে। যার মধ্যে মূল সড়কের জন্য ২৫-৩০ টন, অলিগলিতে ১৫-২০ এবং ফুটপাতে ৫-১০ টন ওজন নিতে সক্ষম এমন ঢাকনা তৈরি করা হচ্ছে।
নগর পরিকল্পনাবিদরাও ফাইবার-রেজিন ঢাকনা ব্যবহারের পক্ষে মত দিয়েছেন। পাশাপাশি এটিকে পরিবেশবান্ধব বলেও উল্লেখ করেছেন। এ বিষয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান আগামীর সময়কে বলেছেন, ফাইবারের ব্যবহারের কারণে ম্যানহোলের ঢাকনা চুরির ঘটনা কমছে। ভবিষ্যতে এটা লোহার ঢাকনাগুলোকে রিপ্লেস (প্রতিস্থাপন) করবে। ফলে খরচ সামান্য বেশি হলেও এটি কাজে আসছে, সেটাই স্বস্তির।
লোহার ঢাকনা চুরির কারণে দুর্ঘটনা ঘটে উল্লেখ করে এ নগর পরিকল্পনাবিদ বলেছেন, যেহেতু ফাইবারের ঢাকনা চুরি হচ্ছে না তাই দুর্ঘটনা কমবে। উত্তর সিটিও এখান থেকে ফাইবারের ঢাকনা তৈরির শিক্ষা নিতে পারে বলেও মনে করেন আদিল মুহাম্মদ খান। পর্যায়ক্রমে এটা দেশের অন্যান্য সিটিতেও ব্যবহার করা যেতে পারে বলে উল্লেখ করেন তিনি।



