কারাবন্দী চিকিৎসক লিখবেন ১০০ ফরেনসিক রিপোর্ট!

প্রতীকী ছবি
চট্টগ্রামের বন্দরটিলার একটি বাসা থেকে গত বছরের ২৭ মে উদ্ধার করা হয় শাকেরা ইয়াসমিনের রক্তাক্ত মরদেহ। এ ঘটনায় তার পরিবার একটি অপমৃত্যুর মামলা করে বন্দর থানায়। মামলা করার পর নিহতের স্বামী মোহাম্মদ ইয়াকুবকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ২৮ মে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল মর্গে ওই নারীর ময়নাতদন্ত হয়। কিন্তু বছর পার হলেও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। ফলে মামলার অগ্রগতি বলতে গেলে শূন্য।
এই মামলার বাদী শাকেরার ভাই হারুনুর রশিদ। শাকেরার ভাগ্নে ফয়সাল ইমাম বললেন, ‘মেডিকেলে কয়েকবার গেছি। শুনেছি যে ডাক্তার ফরেনসিক রিপোর্ট দেবেন, তিনি কারাগারে। এ কারণে রিপোর্ট দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।’
শুধু শাকেরা হত্যা মামলই নয়, এ রকম অন্তত ১০০ মামলা আটকে রয়েছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের (চমেক) ফরেনসিক বিভাগের প্রভাষক চিন্ময় বড়ুয়ার অনুপস্থিতিতে। চিন্ময় বড়ুয়া ১০ মাস ধরে কারাগারে। একাধিক প্রতারণা মামলার আসামি তিনি। বিদেশে লোক পাঠানো এবং অর্থ আত্মসাৎ-সংক্রান্ত অভিযোগে করা এসব মামলায় তার পাশাপাশি আসামি স্ত্রী শর্মিলা বড়ুয়াও।
ব্যক্তিগত অপরাধের অভিযোগে চিন্ময়ের কারাবাসের জন্য ভুগতে হচ্ছে সাধারণ বিচারপ্রার্থীদের। দিনের পর দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ধরনা দিয়েও ফরেনসিক রিপোর্ট পাচ্ছেন না অসংখ্য বিচারপ্রার্থী।
নিয়ম অনুযায়ী, যে চিকিৎসক মরদেহের বিভিন্ন অঙ্গের নমুনা সংগ্রহ করেন, তিনিই ফরেনসিক প্রতিবেদন দেন। সে হিসেবে চিন্ময় বড়ুয়ার হাতে নগরের ৫৭ মামলা ও চট্টগ্রাম জেলার ৩৫ মামলা মিলিয়ে মোট ৯২টি ফরেনসিক প্রতিবেদন ঝুলে রয়েছে, জানালেন নগর পুলিশের (সিএমপি) কর্মকর্তারা। চমেকের সূত্র বলছে, এর বাইরেও কয়েকটি মরদেহের ফরেনসিক প্রতিবেদন চিন্ময়ের জন্য রয়েছে আটকে। সব মিলিয়ে এ সংখ্যা প্রায় ১০০।
এ সম্পর্কে জানতে চাইলে চমেকের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন আগামীর সময়ের কাছে নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করলেন। তিনি বললেন, ‘চিন্ময় বড়ুয়া বছরখানেক ধরে কারাগারে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী তার চাকরিও সংকটে। এ অবস্থায় সবচেয়ে বেশি যে সমস্যা হচ্ছে ফরেনসিক প্রতিবেদন। তিনি যে ভিসেরা সংগ্রহ করেছেন, সেগুলোর রিপোর্ট তাকে দিতে হবে। আমরা আদালতে একটি আর্জি জানিয়েছিলাম, কারাফটকে রেকর্ডপত্র দেখে চিন্ময় যদি রিপোর্ট প্রদান করেন তাহলে আপাতত সমাধান সম্ভব।’
চিন্ময়ের অনুপস্থিতির কারণে সবচেয়ে বেশি সমস্যার মধ্যে পড়েছে পুলিশ। তারা মামলাগুলোর অভিযোগপত্র দিতে পারছে না। এমনকি ফরেনসিক রিপোর্ট না পাওয়ায় গ্রেপ্তার হওয়া আসামিদের জামিন দেওয়াও সম্ভব হচ্ছে না। পুলিশের পক্ষ থেকে বারবার চমেক কর্তৃপক্ষকে তাগাদা দেওয়া হচ্ছে, আর তারা জানাচ্ছে চিন্ময় বড়ুয়ার কারাবাসের বিষয়টি।
এ অবস্থায় মাসখানেক আগে নগর পুলিশ, জেলা পুলিশ ও চমেক কর্তৃপক্ষ জরুরি বৈঠকে বসে। পরে আদালতকে আর্জি জানানোর সিদ্ধান্ত হয়। সে অনুযায়ী আদালতে চমেক কর্তৃপক্ষ আবেদন জানায়। কিছুদিন আগে আদালত সেই আবেদন মঞ্জুর করে কারাফটকে রেকর্ডপত্র নিয়ে গিয়ে চিন্ময়ের কাছ থেকে ফরেনসিক রিপোর্ট নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত দিয়েছেন।
জানতে চাইলে সিএমপির সহকারী কমিশনার (গণসংযোগ) আমিনুর রশিদ বললেন, ‘শতাধিক রিপোর্ট চিন্ময়ের কারণে পাওয়া যায়নি। এজন্য মামলার অগ্রগতি থমকে রয়েছে। আদালত আদেশ দেওয়ায় এখন কারাফটকে রেকর্ডপত্র নিয়ে গিয়ে রিপোর্ট সংগ্রহ প্রক্রিয়াধীন। আশা করি, সমস্যা কেটে যাবে।’



