বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেললাইন
ভারত ছেড়ে চীনে ভিড়ল বগুড়ার তরী
- অনুমোদনের ৮ বছর পর ভূমি অধিগ্রহণের জন্য অর্থ ছাড়
- হবে ১২৩ কিলোমিটার রেলপথ, মূল লাইন ৮৫ কিমি
- অনুমোদনের ৮ বছর পর ভূমি অধিগ্রহণের জন্য অর্থ ছাড়
- একনেকে পাস হলেই দরপত্র, প্রস্তুত হচ্ছে ডিপিপি

চলতি মাসের শেষ দিন, অর্থাৎ ৩০ জুন শেষ হতে যাচ্ছে প্রকল্পের মেয়াদ। পরিস্থিতি যখন এমন, তখনো স্বাক্ষরিত হয়নি ঋণ চুক্তি। তবে আশার কথা, ঋণ পাওয়া যাবে নিশ্চিত হয়েছে এমন নিশ্চয়তা। এ চিত্র বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেললাইনের। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হওয়ার কথা ছিল ভারতীয় অর্থায়নে। ভারত ঋণ বন্ধ করলে অন্তর্বর্তী সরকার সরিয়ে আনে প্রকল্পটি। তখন একই সঙ্গে থাকা রেলের আরও দুটি প্রকল্প আওতামুক্ত করা হয় ভারতীয় ঋণ চুক্তির। যদিও সে দুটি প্রকল্প একেবারে বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। আর টিকে থাকা বগুড়ার রেললাইনের জন্য চীনকে বেছে নিয়েছে বর্তমান সরকার। অবশ্য এসবের মাঝে প্রকল্প ব্যয় বাড়তে পারে ৭ হাজার কোটি টাকার মতো। চূড়ান্ত মূল্যায়নের পর নতুন উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) ঠিক করা হবে নতুন ব্যয়।
ভারতীয় অর্থায়ন থেকে সরে আসার পর এখন এ প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থ নেওয়া হচ্ছে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) থেকে। ২০১৫ সালে এশিয়া অঞ্চলের উন্নয়নকাজের জন্য চীনের উদ্যোগে যাত্রা শুরু ব্যাংকটির, যার প্রধান কার্যালয় চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে। পুরনো প্রকল্পে নতুন অর্থায়ন, মাঝে চলে গেছে সাত বছর। নতুন চুক্তির পর কাজ শুরু করতে সময় লাগবে অন্তত আরও এক বছর। ঋণ চুক্তি হতে পারে আগামী ডিসেম্বর বা জানুয়ারিতে। পুরনো বিশদ নকশা (ডিটেইলড ডিজাইন) ও সম্ভাব্যতা যাচাই মেনে নিয়েই ঋণ দেবে এআইআইবি। ফলে নির্মাণকাজ শুরুর আগে নতুন করে এ দুই কাজ আর করতে হবে না।
তবে খরচ বাড়ার কারণে সংশোধন করতে হবে ডিপিপি। সেই কাজ চলমান। সংশোধিত ডিপিপিতে চূড়ান্ত হবে নতুন নির্মাণ ব্যয়। ২০১৮ সালে নতুন এই ডুয়েলগেজ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পটি যখন একনেকে অনুমোদন হয়, তখন সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫ হাজার ৫৭৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা। পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে সেই ব্যয় গিয়ে ১২ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত দাঁড়াতে পারে বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের।
পরবর্তী প্রক্রিয়া সম্পর্কে রেল সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম আগামীর সময়কে বললেন, ‘এখন ডিপিপি চূড়ান্তের কাজ চলমান। আশা করছি, এই (জুন) মাসের মধ্যে ডিপিপি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে পারব। সেখান থেকে উঠবে একনেকে। আর একনেকে অনুমোদন পাওয়ার পরই ঠিকাদার নিয়োগের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হবে।’
টাকার বিপরীতে ডলার এবং নির্মাণসামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধির কারণে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে যাবে ৫০-৬০ শতাংশ। ২০১৭ সালে যখন প্রাথমিক ব্যয় নির্ধারণ করা হয়, সেটি ছিল ধারণামূলক ব্যয়। মাঝে চলে গেছে সাত-আট বছর। এখন ডিটেইলড ডিজাইন বা বিশদ নকশার ওপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করা হচ্ছে চূড়ান্ত ব্যয়।
এ বছরের ডিসেম্বর বা আগামী বছরের জানুয়ারিতে ঋণ চুক্তি স্বাক্ষর হতে পারে বলে জানালেন রেলওয়ের মহাপরিচালক (ডিজি) মো. আফজাল হোসেন। বললেন, ‘ঋণ নেওয়া এবং দেওয়ার বিষয়ে দুই পক্ষের নীতিগত সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে। ব্যয় রিভাইস হবে, এটিই স্বাভাবিক। তবে ব্যয় কত বাড়বে, সেটি চূড়ান্ত মূল্যায়নের পর বোঝা যাবে।’
এলওসিমুক্ত বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ
বাংলাদেশ-ভারত দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক দৃঢ় করতে শুরু হয়েছিল রেলপথ সম্প্রসারণের এক আশাব্যঞ্জক যাত্রা— লাইন অব ক্রেডিটের (এলওসি) আওতায়। তিনটি বড় চুক্তির ভিত্তিতে বাস্তবায়নের কথা ছিল আটটি অবকাঠামো প্রকল্প। যার ছয়টিই ছিল রেল খাতে। কিন্তু ২০২৪ সালে দেশে রাষ্ট্রক্ষমতার পটপরিবর্তন এবং ভারতে কৌশলগত অগ্রাধিকার পুনর্মূল্যায়নের জেরে অনিশ্চিত হয়ে পড়ে এই কর্মসূচির গতি। রেলের তিনটি প্রকল্পে অর্থায়ন বন্ধ করে দেয় ভারত। এর মধ্যে রংপুরের কাউনিয়া থেকে দিনাজপুরের পার্বতীপুর পর্যন্ত মিটারগেজ লাইনকে ডুয়েলগেজ লাইনে রূপান্তর এবং খুলনা থেকে দর্শনা নতুন ডাবল লাইন রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প বাতিল করে দেওয়া হয় একেবারে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) অর্থায়ন খোঁজার সময় আগ্রহ প্রকাশ করে এআইআইবি। রেলের মতামত জানতে চেয়ে চিঠি দেয় ইআরডি। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ১৩ আগস্ট রেলের ডিজি স্বাক্ষরিত চিঠিতে অর্থায়নের বিষয়ে জানানো হয় সম্মতি।
রেলওয়ের ডিজি মো. আফজাল হোসেন বলছেন, এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে ঢাকা হয়ে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের স্থাপন হবে স্বল্পতম দূরত্বের যোগাযোগ। বগুড়া ও সিরাজগঞ্জে রেলপথে দূরত্ব কমবে প্রায় ১৩৫ কিলোমিটার।
শুরু ১৬ বছর আগে
প্রথমবারের মতো ২০১০ সালে এডিবির অর্থায়নে বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পটির প্রাক-সমীক্ষা করা হয়। ২০১৭ সালে ভারতের এলওসি অর্থায়নে নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয় রেলপথটির। এরপর ২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবর একনেক সভায় দেওয়া হয় অনুমোদন। কাজ শেষের পরিকল্পনা ছিল ২০২৩ সালের জুনের মধ্যে। যদিও ডিপিপি অনুযায়ী প্রকল্পের সর্বশেষ মেয়াদ বাড়িয়ে করা হয়েছে ২০২৬ সাল।
প্রকল্পের নথির তথ্য বলছে, প্রাথমিকভাবে বাস্তবায়নের মধ্যে ভারতের ঋণ দেওয়ার কথা ছিল ৩ হাজার ১৪৬ কোটি ৫৯ লাখ টাকা; কিন্তু ভারত শেষ পর্যন্ত কোনো ঋণ ছাড় করেনি।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ বুয়েট অধ্যাপক শামছুল হক মনে করছেন, ‘প্রকল্পটির নতুন করে সম্ভাব্যতা যাচাই করে দেখা দরকার। ২০১৮ সালে এক ধরনের বাস্তবতায় প্রকল্পটি ফিজিবল (নির্মাণের জন্য উপযুক্ত) ছিল। কিন্তু এখন দিগুণ ব্যয়ে প্রকল্পটি ফিজিবল কি না, সেটি যাচাই করে দেখা দরকার।’
অনুমোদনের ৮ বছরে জমি অধিগ্রহণের অর্থ ছাড়
প্রকল্প অনুমোদনের আট বছরের মাথায় এসে ভূমি অধিগ্রহণ কার্যক্রম শুরু হয়। গত বছরের ১৬ জুন অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণ বাবদ মোট ১ হাজার ৯২০ কোটি ১০ লাখ ছাড় করে।
প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, এই প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে ঢাকার সঙ্গে বগুড়ার রেলপথে দূরত্ব কমবে প্রায় ১১২ কিলোমিটার। সেইসঙ্গে বগুড়া-ঢাকা যাতায়াতে সময় বাঁচবে তিন ঘণ্টা। পুরো রেলপথে ৮৫ দশমিক ৬ কিলোমিটার মূল লাইনের সঙ্গে ৩৭ দশমিক ৪৯ কিলোমিটার লুপ লাইন নির্মাণ করা হবে। এ ছাড়া প্রকল্পের আওতায় রেলপথে করতোয়া ও ইছামতি নদীতে দুটি বড় সেতু নির্মাণ করা হবে। আর ছোট-বড় মিলিয়ে মূল ২৫টি রেলসেতু থাকবে। আর ৯১টি আরসিসি বক্স কালভার্ট, একটি সড়ক ওভারপাস, একটি রেল উড়ালপথ এবং একটি সড়ক আন্ডারপাস নির্মাণ করা হবে।
নতুন এই রেলপথ সিরাজগঞ্জ জংশন, কৃষ্ণদিয়া, রায়গঞ্জ, চান্দাইকোনা, ছোনকা, শেরপুর, আরিয়া বাজার এবং রানীরহাট এলাকায় মোট আটটি স্টেশন নির্মাণ করা হবে। এ ছাড়া নির্মাণ করা হবে বিভিন্ন ক্যাটাগরির ১০৬টি লেভেল ক্রসিং গেট।






