ঢাকা-দিল্লির নতুন সমীকরণ সমাধানের খোঁজে দুই দেশ
- দুই দেশের সম্পর্কে একধরনের ভারসাম্যহীনতা বা একপেশে অবস্থান ছিল : সাকিব আলী, সাবেক কূটনীতিক

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর নিয়ে জট যেন কোনোভাবেই কাটছে না। ভারতীয় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ২৩ থেকে ২৫ আগস্ট সফরের সম্ভাব্য তারিখ নিয়ে আলোচনা চলছে, তাদের বরাতে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও এসেছে একই খবর। অথচ ঢাকা বলছে, সফর নিয়ে তাদের কোনো তাড়াহুড়ো নেই। বরং ‘অনুকূল কূটনৈতিক পরিবেশ’ নিশ্চিত হওয়া এবং বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ভারতে আশ্রয় নেওয়া শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার প্রশ্নে অগ্রগতি— এসব বিষয় সামনে রেখেই দিল্লি সফরের সিদ্ধান্ত হতে পারে।
অর্থাৎ, এটি এখন শুধু একজন প্রধানমন্ত্রীর প্রতিবেশী দেশ সফরের সূচি নির্ধারণের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের নতুন সমীকরণ, পারস্পরিক আস্থার সংকট এবং অতীতের সম্পর্কের কাঠামো বদলানোর প্রশ্ন।
ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসার ছয় মাসের মাথায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম ভারত সফর নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরেই দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে। ক্ষমতায় আসার পরপরই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার তাকে দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ জানায়। সেপ্টেম্বরে দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনেও বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কিন্তু আমন্ত্রণ থাকলেও সফরের পথ মসৃণ হয়নি।
গত সপ্তাহে ঢাকা ইঙ্গিত দিয়েছিল, প্রধানমন্ত্রীর সফরের জন্য আরও অনুকূল কূটনৈতিক পরিবেশ প্রয়োজন। বাংলাদেশের বার্তাও বেশ স্পষ্ট— ঢাকা আর আগের অবস্থানে নেই। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক হবে সমমর্যাদা, পারস্পরিক স্বার্থ ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে। সম্পর্ক কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা সরকারের সঙ্গে নয়, গড়ে উঠতে হবে দুই রাষ্ট্র ও দুদেশের জনগণের মধ্যে।
এর মধ্যেই সামনে এসেছে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের প্রশ্ন। চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তিনি ভারতে আশ্রয় নেন। বাংলাদেশ বলছে, তাকে ফেরত দেওয়ার বিষয়টিও দিল্লির সঙ্গে আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে তারেক রহমানের সফর নিয়ে অনিশ্চয়তার কেন্দ্রে এখন শুধু কূটনৈতিক সময়সূচি নয়, রাজনৈতিক আস্থার প্রশ্নও বড় হয়ে উঠেছে। দিল্লিও খোঁজার চেষ্টা করছে, প্রধানমন্ত্রীর সফর কি শুধু শেখ হাসিনা ইস্যুতেই আটকে আছে, নাকি এর পেছনে আরও কোনো বিষয় প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে। অন্যদিকে ঢাকারও প্রশ্ন— ভারত কি এখনো বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে পুরনো ধ্যান-ধারণা আঁকড়ে আছে, নাকি অতীতের হিসাব পেছনে ফেলে নতুন বাস্তবতায় নতুন উদ্যমে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে চায়?
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান একটি বেসরকারি টেলিভিশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, বাংলাদেশ কখনো বলেনি যে প্রধানমন্ত্রী দিল্লি সফরে যাবেন না। তবে সফর নিয়ে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা দুই দেশই চিহ্নিত করে সমাধানের চেষ্টা করছে।
তার ভাষায়, ভারতকে বাংলাদেশ যে মূল বার্তাটি দিতে চায়, তা হলো— বাংলাদেশ আর আগের জায়গায় নেই। বদলে যাওয়া এই বাংলাদেশকে ভারত যত দ্রুত বুঝবে ও গ্রহণ করবে, ততই দুই দেশের জন্য মঙ্গল হবে।
তবে জটিলতার মধ্যেও সফর নিয়ে নানা ইঙ্গিত মিলছে। গত শুক্রবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বললেন, সফর নিয়ে ভারতের পক্ষ থেকে বলার মতো কোনো মন্তব্য নেই।
আগস্টের প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের বক্তব্যেও ইঙ্গিত পাওয়া যায়, ব্রিকসের আয়োজনের চেয়ে দ্বিপক্ষীয় সফরকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে ঢাকা। ১৪ আগস্ট পর্যন্ত দুই দেশের কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সূত্রগুলো সম্ভাব্য তারিখ হিসেবে ২২ বা ২৩ আগস্টের কথাও বলছিল। এখন ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে ২৩ থেকে ২৫ আগস্টের কথা শোনা গেলেও ঢাকার অবস্থান থেকে স্পষ্ট কোনো নিশ্চয়তা আসেনি।
ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক নিয়ে কাজ করেন এমন অনেকের মতে, দুই পক্ষই এখন নিজেদের অবস্থানে অটল থেকে অন্যপক্ষের ওপর চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে নিজস্ব স্বার্থ আদায়ের চেষ্টা করছে। এর পেছনে রয়েছে পারস্পরিক বিশ্বাসের ঘাটতি। এ আস্থার সংকট কাটানো না গেলে শুধু একটি সফর আয়োজন করলেই সম্পর্কের সব জট খুলবে না।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিল্লি সফরের অনিশ্চয়তা নিয়ে সাবেক কূটনৈতিক সাকিব আলী বললেন, দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের সম্পর্কে একধরনের ভারসাম্যহীনতা বা একপেশে অবস্থান ছিল, যার সঙ্গে ভারত হয়তো অনেকটাই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল। এখন বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন কিছু প্রত্যাশা ও শর্তের কথা বলছে। ফলে সেগুলো দিল্লির কাছে নতুন এবং কিছুটা অপ্রত্যাশিতও মনে হতে পারে।
তার মতে, সফরকে কেন্দ্র করে অচলাবস্থা না বাড়িয়ে কীভাবে আরও সহজ ও কার্যকর উপায়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়া যায়, সে পথ খুঁজতে হবে।
বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীও সম্প্রতি বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর ‘খুব শিগগির’ হওয়া উচিত। দুই দেশের বিদ্যমান অনেক সমস্যার সমাধান শীর্ষপর্যায়ের বৈঠক ও সরাসরি আলোচনার মাধ্যমেই সম্ভব।






