বগুড়ায় ৭০ টাকার কাঁচামরিচ ঢাকায় ২০০
- উৎসে দাম না বাড়লেও বৃষ্টির অজুহাতে ঊর্ধ্বমুখী
- গ্রামের বাজারে মানভেদে ৭০-৮০ টাকা
- রাজধানীর খুচরা বাজারে ১৮০-২০০ টাকা
- ধনেপাতার কেজি ২৫০ টাকা

ফাইল ছবি
কিছুদিন আগেও ৩০ থেকে ৫০ টাকা কেজিতে কেনা যেত কাঁচামরিচ। এখন তা ডাবল সেঞ্চুরি করেছে, মাঝেমধ্যে ছাড়িয়ে যায় ৩০০ থেকে সাড়ে ৩০০ টাকা। অথচ উৎসে এর মূল্য খুব একটা বাড়েনি; বগুড়ার মতো বেশি উৎপাদন হওয়া এলাকায় এখনো মানভেদে ৭০ থেকে ৮০ টাকার মধ্যে ঘুরছে বাজারদর। এমনকি ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না ঘাম ঝরানো চাষি। শুধু হাতবদলেই মধ্যস্বত্বভোগীর পকেটে কোটি কোটি টাকা। বঞ্চিত কৃষক, পকেট কাটা পড়ছে ভোক্তার।
রান্নার অপরিহার্য এই উপাদানের দাম বাড়লেই সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েন সাধারণ মানুষ। বাজারে গিয়ে অনেকেই এক কেজির বদলে ৫০ বা ১০০ গ্রাম কাঁচামরিচ কিনে ফিরছেন বাড়ি। গত তিন বছরে, বিশেষ করে ২০২৪ ও ২০২৫ সালেও একাধিকবার এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যখন কাঁচামরিচের দাম ছাড়িয়ে যায় ২০০ টাকা। প্রশ্ন উঠেছে— প্রতি বছর একই সংকট কেন ফিরে আসে?
ক্রেতা জহিরুল ইসলাম। দামাদামি করছিলেন মরিচের দোকানে। দর বেশি বলে তর্কে জড়ান ব্যবসায়ীর সঙ্গে। তিনি দাবি করেন, তিন দিন আগে ও ১৪০ টাকায় নিয়েছি, এখন কেন ২০০ টাকা? পরে তিনি আধা কেজির বদলে কিনলেন ২৫০ গ্রাম।
অজুহাত দেখালেন ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, বৃষ্টিতে অধিকাংশ সবজি পানিতে ডুবে যাওয়ায় বাড়ছে দাম।
কৃষিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশে প্রতি বছর মে থেকে অক্টোবর মাসে কাঁচামরিচের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার প্রধান কারণ হলো উৎপাদন ও সরবরাহ সংকট। এ সময়ে অতিবৃষ্টি, জলাবদ্ধতা এবং বন্যার কারণে অনেক এলাকায় মরিচের ক্ষেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ফলে উৎপাদন কমে যায়। তাই বাড়ে দাম।
‘বগুড়ার ১৩টি উপজেলার ৪৯ হাজার ৪৪০ বিঘায় কাঁচামরিচ, বেগুন, পটোলসহ বিভিন্ন ধরনের ফসল চাষ করা হলেও চাষিরা বাজারে নিতে পেরেছেন ২১ হাজার ৪৫০ বিঘার ফসল’— তথ্য দিল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র।
প্রশ্ন হলো, তাতে কতটা বেড়েছে দাম? বগুড়ায় আগামীর সময়ের প্রতিনিধি খোঁজখবর নিয়ে জানালেন, শহরের পাইকারি বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৮০ টাকায়। আর খুচরা বাজারে কেউ কেউ বিক্রি করছেন ১০০ টাকায়। তবে কৃষকপর্যায়ে দাম ৫০ টাকার কাছাকাছি।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪ সালের গ্রীষ্ম থেকেই কাঁচামরিচের দামে অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতি শুরু হয়। তীব্র তাপপ্রবাহে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মরিচক্ষেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলন কমে যাওয়ায় বাজারে সরবরাহ কমতে থাকে। এর মধ্যে ঈদুল আজহার আগে চাহিদা বাড়ায় আরও চড়ে দাম। রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে মে মাসে কাঁচামরিচ ২০০ থেকে ২২০ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়। জুনে কোথাও কোথাও দাম ৩০০ থেকে ৩৬০ টাকায় পৌঁছায়। ২০২৫ সালেও পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন হয়নি।
বর্ষাকালে টানা বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও ক্ষেতের ক্ষতির কারণে কমে যায় মরিচের উৎপাদন। অনেক কৃষক সময়মতো বাজারে পণ্য আনতে পারেন না। পাইকারি বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খুচরা বাজারে দাম লাফিয়ে বাড়ে। জুলাই মাসে রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে কাঁচামরিচ ৩০০ টাকার বেশি দরে বিক্রি হয়। বছরের শেষ ভাগেও সরবরাহের ঘাটতি দেখা দিলে দাম আবার বাড়তে শুরু করে। ২০২৬ সালেও দাম বাড়ছে। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে কেজিতে প্রায় ৮০ টাকা বেড়ে রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে কাঁচামরিচ ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা এক সপ্তাহ আগেও ১২০ থেকে ১৪০ টাকা ছিল।
‘বর্ষা পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও সিন্ডিকেট অতিরিক্ত মুনাফার উদ্দেশ্যে কারসাজি করে। যার কারণে কাঁচামরিচের দাম অনেক সময় বেড়ে যায় কয়েকগুণ। কাঁচামরিচ একটি দ্রুত পচনশীল পণ্য হওয়ায় দীর্ঘদিন মজুদ রাখা কঠিন। তাই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির পেছনে দুর্বল বাজার ব্যবস্থাপনা ও পর্যাপ্ত নজরদারির অভাবও দায়ী। কার্যকর বাজার মনিটরিং, নিয়মিত তদারকি এবং আমদানি ব্যবস্থাপনা স্বাভাবিক রাখা গেলে এ সময়ের মূল্য অস্থিতিশীলতা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব’— আগামীর সময়ের কাছে অস্বাভাবিক দাম বাড়ার কারণ ব্যাখ্যা করলেন কৃষিবিদ জাহাঙ্গীর আলম।
বেড়েছে সবজির দাম: সপ্তাহের ব্যবধানে সবজির দাম কেজিতে বেড়েছে ৩০ থেকে ৪০ টাকা। বেগুন ও করলা ১২০, ঢেঁড়স, ঝিঙে ও চিচিঙ্গা ৮০ থেকে ১০০ টাকা। প্রতিটি লাউ ৮০ থেকে ১০০ টাকা, যা গত সপ্তাহেও ছিল ৬০-৭০ টাকা। শসা ২০০, পেঁপে ৪০, বরবটি ২০০, দেশি ধনেপাতা ২৫০ ও চালকুমড়া ৬০ টাকা।
কাঁঠালবাগান ঢালে ভ্যানে সবজি বিক্রি করছিলেন ৩৫ বছর বয়সী রাশেদুল হক। তিনি জানালেন, সব সবজির দামই তো চড়া। বৃষ্টি হইছে না। এই সুযোগ আড়তদাররা বাড়িয়ে দিয়েছেন দাম। সবজি কম দামে কিনতে পারি না। আমাদেরও তো কিছু লাভ করা লাগে। সবজির তুলনায় কাঁচামরিচের দর একটু বেশি, মানভেদে বিক্রি করছি ২০০ টাকা পর্যন্ত।
মেসের জন্য বাজার করছিলেন সোহান মিয়া। লাউয়ের দাম শুনে তিনি অবাক। তিনি জানালেন, দুদিন আগে যেখানে ৫০ থেকে ৬০ টাকায় কিনেছেন। হঠাৎ সেটির দাম ৯০ টাকা। তাই লাউ না কিনে খুঁজলেন কম দামি সবজি।
চালের বাজার প্রায় আগের মতোই। প্রতি কেজি সরু চাল (নাজির/মিনিকেট) ৭২ টাকা এবং মোটা চাল (স্বর্ণা/চায়না ইরি) ৫০ টাকা। তবে মানভেদে প্রতি কেজি মোটা চাল ৫০ থেকে ৬০ টাকা এবং পাইজাম ও লতা চাল ৫৫ থেকে ৬৮ টাকার মধ্যে বিক্রি হতে দেখা গেছে।
মাংস ও মাছের বাজারে দেখা যায়, প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি ১৯০ থেকে ২০০ টাকা, সোনালি মুরগি ৩৪০ থেকে ৩৫০ টাকা এবং হাইব্রিড ধরনের সোনালি মুরগি ৩১০ থেকে ৩২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া এক-দেড় কেজি আকারের রুই মাছ কেজিপ্রতি ৩৫০ টাকার আশপাশে এবং আকারে আরও বড় রুই মাছ ৪০০ টাকার কাছাকাছি দামে বিক্রি হচ্ছে।




