আঙুলে কালি, টাইমলাইনে উচ্ছ্বাস, সঙ্গে অপতথ্যও

সংগৃহীত ছবি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট কেন্দ্র করে সোশ্যাল মিডিয়ায় বিপুল পরিমাণ তথ্য ছড়িয়ে পড়েছে, যার একটি বড় অংশই ভুল ও বিভ্রান্তিকর। আর এর মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি করা ছবি ও ভিডিওর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। এসব কনটেন্টে কোথাও ভোট বর্জনের ডাক, কোথাও কেন্দ্র দখল বা আগের রাতে ভোট সম্পন্ন হওয়ার অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে— যার অনেকগুলোর সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
একই সময়ে লক্ষ্য করা গেছে, ভোটারদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নিয়েও সোশ্যাল মিডিয়া সরব ছিল। অনেকে আঙুলে অমোচনীয় কালির ছবিসহ পোস্ট করেছেন। প্রথমবার ভোট দেওয়ার অনুভূতি লিখেছেন অনেক তরুণ ভোটার। কেউ কেউ অতীতের নির্বাচনগুলোর সঙ্গে এবারের পরিবেশের তুলনাও করেছেন। আক্ষেপ করে বলেছেন, বিগত নির্বাচনগুলোয় কেন্দ্রে গিয়েও ভোট দিতে পারেননি। এবারই প্রথম সুষ্ঠুভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন।
আবার অনেকে লিখেছেন, ফেসবুকে যত গুজব, কেন্দ্রে গিয়ে তার কিছুই দেখতে পাননি। সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটগ্রহণ হয়েছে। ফলে আবারও সামনে এসেছে অনলাইন তথ্য যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তা।
অপতথ্যের ঢেউ
অনলাইন ভেরিফিকেশন ও মিডিয়া গবেষণা প্লাটফর্ম ‘ডিসমিসল্যাব’ আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে জানিয়েছে, সকাল থেকে তারা অন্তত ১০টি অপতথ্য শনাক্ত করেছে। আর গত ২৪ ঘণ্টায় এ সংখ্যা ৩০টি।
অন্যদিকে বিবিসির লাইভ ব্লগে ‘বিবিসি ভেরিফাই’ টিমের শ্রুতি মেনন লিখেছেন, ‘এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে লক্ষণীয় দিকটি হলো, সামাজিক মাধ্যমে এআই দিয়ে বানানো বিপুল পরিমাণ রাজনৈতিক কনটেন্ট ছড়িয়ে পড়া। জানুয়ারি থেকে আমি ডজন-ডজন ফেসবুক পেজ পর্যবেক্ষণ করছি এবং এআই দিয়ে তৈরি শত শত রাজনৈতিক ভিডিও দেখেছি, যেগুলোর অনেকগুলোর কোথাও উল্লেখ নেই যে এগুলো কৃত্রিমভাবে তৈরি।’
‘এই ক্লিপগুলোতে দেখা যায়, অতিমাত্রায় বাস্তবসম্মত কিন্তু কাল্পনিক সংবাদ উপস্থাপকদের, কম্পিউটার-নির্মিত ‘সাধারণ নাগরিকদের’ এবং পুলিশের মতো পোশাক পরা ব্যক্তিদের। প্রযোজনার মান এতটাই ঝকঝকে যে প্রথম নজরে ভিডিওগুলো বাস্তব বলে মনে হয়। একটি ভিডিও— যেটি আমি গুগলের নিজস্ব এআই শনাক্তকারী টুল SynthID ব্যবহার করে এআই-নির্মিত বলে নিশ্চিত করেছি— প্রায় ৮০ লাখ বার দেখা হয়েছে। সেখানে নীল রঙের ইউনিফর্ম পরা, সরকারি কর্মকর্তার মতো দেখতে একজন মানুষকে পক্ষপাতদুষ্ট রাজনৈতিক বার্তা দিতে দেখা যায়।’
শ্রুতি মেনন আরও লেখেন, ‘আরেকটি বহুল প্রচারিত ভিডিও, যেটি প্রায় দুই লাখ বার দেখা হয়েছে, তাতে দেখা যায় কৃত্রিমভাবে তৈরি এক দোকানদার কেন তিনি একটি নির্দিষ্ট প্রার্থীর পক্ষে ভোট দেবেন না তা ব্যাখ্যা করছেন। বাংলাদেশের নির্বাচনী আচরণবিধি অনুযায়ী, বিভ্রান্তিকর এআই-নির্মিত কনটেন্ট তৈরি বা শেয়ার করা নিষিদ্ধ। তবে অনলাইনে এমন কনটেন্ট কীভাবে নজরদারি বা প্রয়োগ হচ্ছে তা নিয়ে স্পষ্টতা এখনও খুব সীমিত।’
সিইসি যা বললেন
বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর ইস্কাটন গার্ডেন উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দিতে যান প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীন। এ সময় এআই-জেনারেটেড ভিডিও নিয়ে সাংবাদিকরা তাকে প্রশ্ন করেন। জবাবে সিইসি বলেন, এসব কনটেন্টের বেশিরভাগই সীমান্তের বাইরে থেকে ছড়ানো হচ্ছে। দেশের ভেতরের উৎসগুলো নিয়ন্ত্রণে তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন। কিন্তু বাইরের উৎস নিয়ন্ত্রণের উপায় নেই।
তবে নির্বাচন সংক্রান্ত সঠিক তথ্য জানতে মূলধারার গণমাধ্যমগুলোর ওপর বিশ্বাস রাখার আহ্বান জানিয়েছেন সিইসি। তার ভাষ্য, ‘আমরা সত্য তথ্য দিয়ে অপতথ্য মোকাবিলার কৌশল নিয়েছি। গণমাধ্যমই সেই সত্য তথ্য প্রকাশ করবে। এ ক্ষেত্রে প্রথম সারির মিডিয়ার ওপর আমরা বেশি বিশ্বাস রাখি।’
ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেক
এবারের নির্বাচনে বিভিন্ন উৎসের অপতথ্য শনাক্তের পর তা নিজেদের ওয়েবসাইটে সরাসরি প্রকাশ করছে ডিসমিসল্যাব। বেলা সোয়া ১টার দিকে একটি পোস্টে তারা জানায়, ভোটকেন্দ্র দখলের চেষ্টা সংক্রান্ত একটি ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে। ফ্যাক্টচেকে দেখা যায়, খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় সেনাবাহিনীর নির্বাচনী মহড়ার দৃশ্য যোগ করে ওই ভিডিওটি ছড়ানো হয়।
অপরদিকে যশোর-২ আসনে রাতে ভোট সম্পন্ন হয়েছে দাবি করে ছড়ানো ভিডিওটি এআই দিয়ে বানানো। ডিসমিসল্যাব জানিয়েছে, ফেসবুকে ছড়ানো ভিডিওটিতে কয়েকজন ব্যক্তিকে কাগজে সিল দিতে দেখা যায়। গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যায় তারা অগোছালোভাবে সিল দিচ্ছে। বাংলাদেশের নির্বাচনে ব্যালট বাক্স হয় স্বচ্ছ, রঙিন নয়। এআই শনাক্তকরণ টুল ডিপফেক-ও-মিটারের মাধ্যমে যাচাই করলেও এটিকে প্রায় শতভাগ এআই কনটেন্ট হিসেবে চিহ্নিত করে।
ডিসমিসল্যাব তাদের লাইভ ব্লগে আরেকটি ভিডিওর কথা উল্লেখ করেছে। লিখেছে, মধ্যরাতে চকরিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভোট চুরি চলছে দাবিতে একটি ভিডিও সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়ে। ফ্যাক্টচেকে দেখা যায়, মূল ভিডিওটি অন্তত দুই বছরের পুরনো।
এবারের ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ২৯৯টি আসনে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ হয়েছে। ইসি (নির্বাচন কমিশন) সচিবালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মোট ২ হাজার ২৮ প্রার্থীর মধ্যে ১ হাজার ৭৫৫ জন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের। ২৭৩ জন স্বতন্ত্র। ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ৭ লাখ ৮৫ হাজার ২২৫ জন। তাদের মধ্যে প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ৪২ হাজার ৭৭৯, সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২ এবং পোলিং এজেন্ট ৪ লাখ ৯৪ হাজার ৯৬৪ জন। এবার পোলিং এজেন্টদের ঘিরেও অপতথ্য ছড়ানো হয়েছে।

