রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা আসলে কতটা?

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
নতুন রাষ্ট্রপতি পেয়েছে বাংলাদেশ, এই পদে অধিষ্ঠিত হতে যাচ্ছেন বিএনপির সদ্য সাবেক মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ব্যক্তি রাষ্ট্রপতি। সংবিধানে তার সেই ক্ষমতার আওতা ও পরিধিও নির্ধারণ করে দেওয়া আছে। বিদ্যমান সংবিধানে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সীমিত বলে আলোচনা বহু দিনের। বলা হয়, ক্ষমতা প্রয়োগে আসলে সরকার প্রধান বা প্রধানমন্ত্রীর মুখাপেক্ষী থাকতে হয় রাষ্ট্রপ্রধানকে।
তবে দুই বছর আগে জুলাই অভ্যুত্থানের পর সংবিধানসহ রাষ্ট্রের নানা কাঠামোয় সংস্কারে যে জুলাই সনদ প্রণীত হয়েছে, তাতে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য আনার সুপারিশ রয়েছে। তা বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধন হলে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়বে। তবে সংবিধান সংশোধন করে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়লেও প্রয়োগের ক্ষেত্রে তার পরিবর্তন দেখা যাবে কি না, তা নিয়ে সন্দিহান সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক।
সংবিধানে রাষ্ট্রপতির কী ক্ষমতা
১৯৯১ সালে সংবিধানে দ্বাদশ সংশোধনীর পর থেকে বাংলাদেশে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা চলমান। যেখানে রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর হাতে, রাষ্ট্রপতি হন রাষ্ট্রের প্রধান।
এ ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের সব কর্মকাণ্ডই চলে রাষ্ট্রপতির নামে। সংবিধানে বলা আছে, রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের অন্য সব ব্যক্তির ঊর্ধ্বে স্থান লাভ করবেন।
সংবিধানের ৪৮ (৩) অনুচ্ছেদে প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষমতা দেওয়া আছে রাষ্ট্রপতিকে। এ দুটি কাজ তিনি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়াই করতে পারবেন। বাকি সব দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ীই তাকে কাজ করতে হয়।
তবে সংবিধানে এটাও উল্লেখ রয়েছে, প্রধানমন্ত্রী আসলেই রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শ দিয়েছেন কি না, তা নিয়ে কোনো আদালতে কেউ প্রশ্ন তুলতে পারবেন না।
সংবিধান ও অন্য কোনো আইনের দ্বারা রাষ্ট্রপতি সব ক্ষমতা প্রয়োগ ও কর্তব্য পালন করবেন। এ ছাড়া রাষ্ট্রীয় ও পররাষ্ট্রনীতিসংক্রান্ত বিষয় রাষ্ট্রপতিকে অবহিত রাখবেন প্রধানমন্ত্রী।
সংবিধানের ৭২ অনুচ্ছেদ অনুয়ায়ী, প্রধানমন্ত্রীর লিখিত পরামর্শে রাষ্ট্রপতি জাতীয় সংসদের অধিবেশন আহ্বান করেন, স্থগিত করেন এবং মেয়াদ শেষে বা পরিস্থিতি বিবেচনায় সংসদ ভেঙে দেন।
অনুচ্ছেদ ৮০ অনুযায়ী, সংসদে পাস হওয়া কোনো বিল রাষ্ট্রপতির সম্মতির জন্য পেশ করা হলে তিনি ১৫ দিনের মধ্যে তাতে সম্মতি দেবেন অথবা পুনঃবিবেচনার জন্য সংসদে ফেরত পাঠাবেন।
৯৩ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সংসদ অধিবেশন না থাকলে বা ভেঙে গেলে কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে বিশেষ বিধানসংবলিত অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন রাষ্ট্রপতি, যা আইনের মতোই কার্যকর হবে।
৬১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা কর্মবিভাগগুলোর সর্বাধিনায়ক হবেন এবং আইনের মাধ্যমে তার প্রয়োগ নিয়ন্ত্রিত হবে।
অনুচ্ছেদ ৪৯ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি যেকোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের প্রদত্ত দণ্ড মার্জনা, বিলম্বন বা হ্রাস করার ক্ষমতা রাখেন।
আর অনুচ্ছেদ ১৪১ক অনুযায়ী, যুদ্ধ, বহিরাক্রমণ বা অভ্যন্তরীণ গোলযোগের কারণে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বা অর্থনীতি হুমকির মুখে পড়লে প্রধানমন্ত্রী অনুস্বাক্ষরিত নোটিসসাপেক্ষে ‘জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করতে পারেন রাষ্ট্রপতি।
অন্যদিকে, রাষ্ট্রপতিকে তার দায়িত্ব পালনের বিষয়ে কোনো আদালতে জবাবদিহি করতে হবে না। রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় তার বিরুদ্ধে কোনো আদালতে কোনোপ্রকার ফৌজদারি মামলা করা যাবে না। তাকে গ্রেপ্তারের বা কারাগারে নেওয়ার জন্য কোনো আদালত থেকে পরোয়ানা জারি করা যাবে না।
তবে সংবিধানে রাষ্ট্রপতিকে যে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, সীমিত হলেও অনেক ক্ষেত্রে তার প্রয়োগও দেখা যায়নি অতীতে।
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘সংসদে পাস হওয়া প্রত্যেকটি বিল সম্মতির জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হয়। রাষ্ট্রপতি চাইলে যেকোনো বিলে অসম্মতি জানিয়ে তা সংশোধনের জন্য সংসদে পাঠাতে পারেন। কিন্তু এমন দৃষ্টান্ত সচরাচর দেখা যায় না। বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ রাষ্ট্রপতি থাকাকালে কেবল একটি বিল সংসদে ফেরত পাঠিয়েছিলেন সংশোধনের জন্য।’
রাষ্ট্রপতির আরেকটি ক্ষমতার উদাহরণ দিয়ে তিনি বললেন, ‘কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত বা প্রস্তাব থাকলে তা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো বা পর্যালোচনার জন্য উপস্থাপন করতে পারেন রাষ্ট্রপতি। কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাসে এ ধরনের কোনো নজির নেই।’
রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানো হলেও তার প্রয়োগ দেখা যাওয়া নিয়ে সন্দিহান শাহদীন মালিক বলেন, ‘কাগজে-কলমে আইন পাস করে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানো হলেও প্রয়োগের ক্ষেত্রে ফল আসবে না। আমাদের ৫৬ বছরের ইতিহাসে ২২ জন বিচারপতি পরিবর্তন হয়েছেন। এরমধ্যে একজন ছিলেন ১০ বছর। সেই হিসাবে অন্য ২১ জন গড়ে দুই বছরের মতো করে সময় পেয়েছেন। ক্ষমতা প্রয়োগের প্রসঙ্গ আসলে এই বদল আরও বাড়তে পারে।’
জুলাই সনদে কী আছে
ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রপতির স্বাধীন এখতিয়ার বাড়ানো এবং একই সঙ্গে কিছু ক্ষমতার ওপর জবাবদিহি নিশ্চিত করার সুপারিশ রয়েছে জুলাই জাতীয় সনদে। এর মধ্যে রয়েছে—
এক. স্বাধীনভাবে নিয়োগদানের ক্ষমতা : জুলাই সনদে রাষ্ট্রপতির স্বাধীন সিদ্ধান্তের পরিধি বাড়িয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংবিধিবদ্ধ ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রধান ও সদস্য নিয়োগের ভার সরাসরি তার ওপর ন্যস্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। জুলাই সনদের এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, আইন কমিশন, বাংলাদেশ শক্তি নিয়ন্ত্রণ কমিশনে স্বাধীনভাবে নিয়োগ দিতে পারবেন রাষ্ট্রপতি।
দুই. দণ্ড মার্জনার শর্ত : সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি যেকোনো দণ্ডপ্রাপ্ত আসামির সাজা মওকুফ বা মার্জনা করতে পারেন। জুলাই সনদে প্রস্তাব করা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি যদি কারও মৃত্যুদণ্ড বা সাজা মার্জনা করতে চান, তবে তার আগে ভুক্তভোগীর পরিবার বা ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষের সম্মতি গ্রহণ বাধ্যতামূলক হবে।
তিন. জরুরি অবস্থা ঘোষণায় ভারসাম্য : প্রধানমন্ত্রীর একক স্বাক্ষরে বা পরামর্শে সরাসরি জরুরি অবস্থা জারির বিধান সংশোধন করে রাষ্ট্রপতির ওপর শর্ত দেওয়া হয়েছে। কেবল প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ নয়, জরুরি অবস্থা ঘোষণার জন্য ক্যাবিনেট সদস্য, বিরোধীদলীয় নেতা ও উপনেতার অনুমোদন প্রয়োজন হবে। এ ছাড়া জরুরি অবস্থাকালীন নাগরিকদের মৌলিক অধিকার সম্পূর্ণ খর্ব করা যাবে না।
চার. অভিশংসন প্রক্রিয়া : রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসন বা অপসারণ করার প্রক্রিয়াকে আরও শক্ত করা হয়েছে জুলাই সনদে। যাতে রাজনৈতিক উদ্দেশে তাকে হুট করে সরানো না যায়। প্রস্তাবিত দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভার (উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষ) উভয় কক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ (২/৩) সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে অভিশংসন পাস হতে হবে।
রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধিতে জুলাই সনদে যেসব সুপারিশ করা হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়ন হলেও প্রয়োগের ক্ষেত্রে পরিবর্তন নিয়ে খুব একটা আশাবাদী নন শাহদীন মালিক।
বরং নিয়োগের নানা ক্ষেত্রে একটি দূরত্ব তৈরির আশঙ্কা তুলে ধরে তিনি বলছিলেন, ‘রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি হলে একধরনের সমন্বয়হীনতা তৈরি হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির দেওয়া নিয়োগ সরকারের পছন্দ না-ও হতে পারে। আবার বিভিন্ন ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে দ্বন্দ্বও দেখা দিতে পারে।’
তার মতে, ‘আইন করে ক্ষমতা না বাড়িয়ে বরং যতটুকু ক্ষমতা দেওয়া আছে তা স্বাধীনভাবে প্রয়োগের সুযোগ রাষ্ট্রপতির জন্য সংরক্ষণ করতে হবে। এক্ষেত্রে আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন আনা উচিত।’












