কৃষক গড়েছেন ব্যতিক্রমী কলেজ

কলেজ চত্বরে শিক্ষার্থীরা চারাগাছের পরিচর্যা করছেন
ছাত্রজীবনে সানোয়ারকে প্রতিদিন প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে মাইলের পর মাইল পার হয়ে দূরদূরান্তের স্কুল-কলেজে লেখাপড়া করতে হয়েছে। তাদের গ্রাম বা আশপাশের কোথাও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল না। আর সে সময় থেকে তার চিন্তা ছিল গ্রামে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার।
টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলা মহিষমারা গ্রামের জামাল হোসেনের ছেলে মোহাম্মদ সানোয়ার হোসেন (৫৩) মধুপুর কলেজ থেকে ১৯৯৩ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর নেমে পড়েন কৃষিকাজে। প্রথমে পৈতৃক কিছু জমিতে শুরু করেন কৃষিকাজ। এরপর আশপাশের কিছু মানুষের জমি ইজারা নিয়ে তার কৃষি খামার সম্প্রসারণ করেন। ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন সফল কৃষক।
জাতীয় পর্যায়ে পুরস্কারপ্রাপ্ত কৃষক সানোয়ার ২০১৩ সালে বাবার কাছ থেকে এক বিঘা জমি নিয়ে গ্রামে কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। নাম দেন মহিষমারা কলেজ। এরপর ধীরে ধীরে কলেজের জন্য আশপাশের আরও চার বিঘা জমি কেনেন। তবে অন্যসব কলেজ থেকে এটি ব্যতিক্রম। এখানে প্রচলিত শিক্ষার পাশাপাশি হাতে-কলমে কৃষিশিক্ষা বাধ্যতামূলক। প্রথমে শিক্ষার্থীরা একে বাড়তি ঝামেলা মনে করলেও ধীরে ধীরে এতে অভ্যস্ত হয়ে যান। বর্তমানে সেখানে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা প্রায় ৩০০। রয়েছেন ১৩ জন শিক্ষক এবং দুজন কর্মচারী। মাস-পাঁচেক আগে কলেজটি এমপিওভুক্ত হয়।
সানোয়ার বলেছেন, এই কলেজের লক্ষ্য শুধু চাকরিপ্রার্থী তৈরি করা নয়, বরং আত্মনির্ভরশীল কৃষি উদ্যোক্তা গড়ে তোলা।
মহিষমারা গ্রামের শহিদুল ইসলাম বললেন, ‘একসময় সফল কৃষক সানোয়ার হোসেনের প্রতিষ্ঠিত কলেজে পড়াশোনা করতাম। কলেজের কৃষি খামার ও হাতে-কলমে শিক্ষার ব্যবস্থা দেখে সেখানে ভর্তি হই। কৃষিকাজ করে আজ সফলতা অর্জন করেছি।’
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের কলেজ ভবনের চারপাশে বিভিন্ন ধরনের সবজি উৎপাদনের কৌশল হাতে-কলমে শেখানো হচ্ছে। সেখানে আদা, হলুদ, কচুসহ কয়েক ধরনের সবজির বাগান রয়েছে। বাগানে আছে চার জাতের আনারস, ড্রাগন ফল ও কফিগাছ। কলেজের শিক্ষার্থীরাই এসব চাষ করেছেন।
মহিষমারা গ্রামের সিরাজুল ইসলাম মনে করেন, এই কলেজের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এটি একটি সমন্বিত কৃষিশিক্ষা কেন্দ্র। কলেজ ক্যাম্পাস জুড়ে রয়েছে বিভিন্ন ফল-ফসল ও বনজ গাছের সমাহার।
কলেজের শিক্ষার্থী রুবেলের ভাষ্য, ‘কৃষিভিত্তিক শিক্ষা ও উদ্যোক্তা তৈরির এই উদ্যোগ স্থানীয়ভাবে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। লেখাপড়া শেষ করে আমরাও উদ্যোক্তা হয়ে কৃষিতে কর্মসংস্থান তৈরি করব।’
এসব বিষয়ে সানোয়ার হোসেন বললেন, ‘দেশের শিক্ষাব্যবস্থা মানুষকে চাকরির দিকে ঠেলে দেয়। একজন শিক্ষিত মানুষ অন্যের অধীনে কাজ করতে চান, স্বাধীনভাবে কিছু করতে চান না। মানুষের সুপ্ত প্রতিভা ও আত্মনির্ভরশীল মানসিকতা বিকাশের জন্যই আমি এই কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছি।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর টাঙ্গাইলের অতিরিক্ত উপপরিচালক মো. শোয়েব মাহমুদ জানিয়েছেন, সানোয়ার একজন উদ্যোক্তা কৃষক। তার কলেজের শিক্ষার্থীদের তিনি হাতে-কলমে কৃষিকাজ শেখাচ্ছেন। তাকে দেখে অনেকেই উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন বাণিজ্যিক কৃষিতে।
মহিষমারা কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাক জানালেন, কলেজটির প্রতিষ্ঠাতা ছাত্রজীবনে দূরদূরান্তের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে পড়াশোনা করেছেন। সেই কষ্টের কথা মনে রেখে স্থানীয় ছেলেমেয়েদের কষ্ট লাঘব করার জন্য এলাকায় একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন।
অধ্যক্ষ আরও বললেন, ‘এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আমরা সহশিক্ষা হিসেবে কৃষিকে উৎসাহ দিয়ে থাকি। এক কথায় এখানে আমরা উদ্যোক্তা তৈরি করি।’






