এই নির্বাচনের সঙ্গে সেই নির্বাচনের কী কী তফাত

১৯৯১ সালের পর এবারই প্রথম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন।
৩৫ বছর পর আবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটাভুটি হলো। ১৯৯১ সালের পর এবারই প্রথম একাধিক প্রার্থী থাকায় সংসদ সদস্যদের সরাসরি ভোটে নির্বাচনের ফল নির্ধারিত হয়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের বিশেষ অধিবেশনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ক্ষমতাসীন বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জয়ী হয়েছেন।
নির্বাচনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পেয়েছেন ২৫৫ ভোট। তার প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্য সমর্থিত প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট।
নির্বাচনে মোট ভোটার ছিলেন ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য। তাদের মধ্যে ভোট দিয়েছেন ৩৪৩ জন। ভোটদানে বিরত ছিলেন ছয়জন সংসদ সদস্য। দুপুর ২টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়।
১৯৯১ সালে ফলাফল কী ছিল
এর আগে রাষ্ট্রপতি পদে সর্বশেষ ভোট হয়েছিল ১৯৯১ সালে। ওই নির্বাচনে ক্ষমতাসীন বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাসের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিলেন বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী।
ওই সময়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। আর বদরুল হায়দার চৌধুরী পান ৯২ ভোট।
সেই নির্বাচনে সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্যসহ মোট ভোটার ছিলেন ৩৩০ জন। ভোট দিয়েছিলেন ২৬৪ জন। অর্থাৎ ৬৬ জন সংসদ সদস্য ভোটদানে বিরত ছিলেন। জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামী, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিসহ (সিপিবি) কয়েকটি দল ওই নির্বাচনে ভোটদানে বিরত ছিল।
অন্যদিকে, ২০২৬ সালের নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ৩৪৯ জন। ভোট দিয়েছেন ৩৪৩ জন। ফলে এবারের ভোটে অংশগ্রহণের হার ছিল অনেক বেশি।
৩৫ বছর কেন ভোট হয়নি
১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর গত ৩৫ বছরে আটবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে প্রতিবারই একক প্রার্থী থাকায় সংসদ সদস্যদের ভোট দিতে হয়নি। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া থাকলেও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোটের প্রয়োজন পড়েনি।
এবার বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিপরীতে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের সমর্থনে কর্নেল (অব.) অলি আহমদ প্রার্থী হওয়ায় দীর্ঘ সময় পর আবার ভোটের প্রয়োজন হয়।
ব্যবধানেও বড় পরিবর্তন
১৯৯১ সালে আবদুর রহমান বিশ্বাস ও বদরুল হায়দার চৌধুরীর মধ্যে ভোটের ব্যবধান ছিল ৮০। এবার মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও অলি আহমদের মধ্যে ব্যবধান ১৬৭।
অর্থাৎ ১৯৯১ সালের তুলনায় এবারের নির্বাচনে ভোটের ব্যবধান দ্বিগুণেরও বেশি। একই সঙ্গে এবারের নির্বাচনে ভোটদানের হারও ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে ১৯৯১ সালে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ভূমিকা, দলীয় আনুগত্য ও নিরপেক্ষতা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছিল। ঠিক এবারও নির্বাচনেও সেই প্রশ্নগুলো নতুন করে সামনে এসেছে। বিশেষ করে সংসদীয় ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির অবস্থান এবং সরকার ও বিরোধী দলের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই নির্বাচনের রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে।
প্রতিক্রিয়ায় কী পার্থক্য
১৯৯১ সালে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা বলেছিলেন, রাষ্ট্রপতিকে দলের ঊর্ধ্বে রাখা উচিত ছিল।
শেখ হাসিনা বলেছিলেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে গোপন ভোট হলে ফলাফল কী হতো, আমাদের জানা। সংসদ সদস্যদের প্রকাশ্য ভোটে তিনি (বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী) হেরে গেলেও জনগণের কাছে বিজয়ী হয়েছেন।
প্রতিক্রিয়ায় শেখ হাসিনা আরও বলেছিলেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি সরকারের নৈতিক পরাজয় হয়েছে।অন্যদিকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর বিএনপি প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংসদের ভেতরে জামায়াতে ইসলামীর আমির ও প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে কোলাকুলি করেছেন। পরে মির্জা ফখরুলকে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে অভিনন্দন জানান বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।
পোস্টে তিনি লেখেন, আগামী দিনগুলোতে রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবে ইনসাফ কায়েম, গণতন্ত্রকে সমুন্নতকরণ এবং দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তার সর্বোচ্চ যোগ্যতা ও প্রজ্ঞাকে কাজে লাগাবেন এমন আশা ব্যক্ত করেন বিরোধীদলীয় নেতা।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেননি ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন থেকে নির্বাচিত স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। এই নির্বাচনের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এত বড় একটি গণঅভ্যুত্থান গেল, যার সঙ্গে জাতি হিসেবে আমাদের আত্মত্যাগ, অনেক স্বপ্ন জড়িত। তাহলে আমরা সবাই মিলে কেন একজন অরাজনৈতিক এবং গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনীত করতে পারলাম না।’











