অথচ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
যশোরের বেনাপোল সীমান্তের শূন্যরেখায় পড়ে আছে একদল নারী-পুরুষ। সঙ্গে তাদের শিশুসন্তান। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) দাবি, তারা অনুপ্রবেশকারী বাংলাদেশি। তাদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে নিজ দেশে। অন্যদিকে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) বলছে, ‘না, তারা বাংলাদেশি নয়। বরং জোর করে তাদের ঠেলে পাঠানো হচ্ছে বাংলাদেশে।’ অথচ ঠেলা-ধাক্কা খাওয়া সে মানুষগুলো জানে না, কোথায় তাদের আসল ঠিকানা?
ভারতের বিভিন্ন জায়গা থেকে ধরে এনে তাদের জড়ো করা হয়েছে সীমান্তে। এরপর চলে পুশইন ও পুশব্যাকের রাজনীতি। অথচ নিরুপায় সে মানুষগুলোর পেটে ক্ষুধা, গলায় তেষ্টা, চোখে ভয়— সেদিকে খেয়াল নেই কারও।
সীমান্তরেখার এই মানবেতর ঘটনাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘জোছনাকুমারী’ উপন্যাসের কথা। লেখক সেখানে কিছু প্রশ্ন রাখেন রূপক অর্থে, যা আজও অমীমাংসিত। ‘জোছনাকুমারী কি সত্যিই এক জোছনাকুমারী? মায়া দিয়ে গড়া যার শরীর, যাকে ধরতে-ছুঁতে পারে না কেউ? মাঝেমাঝে মানুষের মধ্যে নেমে এসে সে পরীক্ষা করে মানুষের স্নেহ-মমতা-দয়া আর ভালোবাসা, আর প্রতিবারই ফিরে যায় দুই চক্ষে অশ্রু নিয়ে?’ বেনাপোলের রঘুনাথপুর ও সাদীপুর নো ম্যানস ল্যান্ডের খোলা আকাশে সূর্য ওঠে, ডুবে যায় অস্তাচলে। গোধূলি শেষে জ্বলে সন্ধ্যা তারা, পাশে জ্বলজ্বলে চাঁদ। অথচ সেই আকাশ ঢেকে আছে অনিশ্চয়তার কালো মেঘে। বিপন্ন মানুষগুলো জানে না, আর কিছুক্ষণ পরের কথা। তারা জানে না, আদৌ বেঁচে থাকবে কি না?
সীমান্তকেন্দ্রিক রাজনীতি নতুন নয়। তবে পশ্চিমবঙ্গে রাজ্য সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে পাল্টে গেছে অনেক কিছু। ঘোষণা আসে, ‘বাংলাদেশ থেকে আসা নথিপত্রহীন অনুপ্রবেশকারীদের মোকাবিলা করাই হবে তাদের প্রধান অগ্রাধিকার।’
এরপরই ক্রমশ তাপ উঠছে বর্ডার লাইনে। বাংলাদেশ সরকারের কড়া জবাব, জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাইয়ের মাধ্যমে ভারত সরকার কোনো তালিকা পাঠালে আইন অনুযায়ী রিপ্যাট্রিয়েশন প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তেমন কোনো তালিকা আসেনি। এভাবেই চলছে দুই দেশের রাষ্ট্র পরিচালকদের কথা ছোড়াছুড়ি। অথচ বলির পাঁঠা সেই অসহায় মানুষ। সীমান্তের কাঁটাতারে দাঁড়িয়ে তাই শক্তি চট্টোপাধ্যায় যেন শোনাতে চাচ্ছেন তার ‘দাঁড়াও’ কবিতাটি।
‘মানুষ বড়ো কাঁদছে, তুমি মানুষ হয়ে পাশে দাঁড়াও
মানুষই ফাঁদ পাতছে, তুমি পাখির মতো পাশে দাঁড়াও
মানুষ বড় একলা, তুমি তাহার পাশে এসে দাঁড়াও।’




