বড় অক্সফোর্ড ছিল ভারতেই
নালন্দার ৯০ লাখ বই পুড়ছিল ৩ মাস ধরে

আগামীর গ্রাফিক্স
জ্ঞান-বিজ্ঞানের তীর্থস্থান অক্সফোর্ড। নামেই কেমন একটা বুর্জোয়া বুর্জোয়া ভাব! চোখ কপালে উঠে যায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের। পৃথিবীর সব জ্ঞান যেন সেখানেই! শিক্ষকরা একেকজন দার্শনিক! অথবা ঋষি-মনীষী গোছের কেউ হবেন! মাথাভর্তি বিদ্যা! পশ্চিমা শাসনগুণে আধুনিক বিশ্বের এ ধারণা আমাদের হাজার বছরের পুরোনো। অথচ অবাক-বিস্ময়টি হলো; ইতিহাসের অন্দরমহলেই চাপা পড়ে আছে এর চেয়েও বড় সত্যটি। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়। ভারতবর্ষের জ্ঞান-তপস্যার বাতিঘর। অক্সফোর্ডের অন্তত ৫০০ বছরেরও বেশি আগের বিদ্যাপীঠ। শুধু ভারত নয়; দিবাকর হয়ে উঠেছিল পুরো এশিয়ার। সিংহল (শ্রীলঙ্কা), ইন্দোনেশিয়া, জাপান, তিব্বত, তুরস্ক, পারস্য পেরিয়ে সে আলো ছড়িয়েছিল সুদূর চীনেও। ছিল তালপাতায় লেখা ৯০ লাখ পান্ডুলিপির আকাশছোঁয়া রাজধানী। ‘তিন কুঠুরী’ পাঠাগার। রত্নসাগর, রত্নদধি, রত্নরঞ্জক। ইতিহাস বলে, শাসক রোষানলে পড়ে পৃথিবীর জ্ঞানকোষ খ্যাত বিরাট বিরাট ওই লাইব্রেরিগুলো পুড়তে সময় লেগেছিল তিন মাস! ৪২৭ সালের কথা। মতান্তরে ৩০০ খ্রিষ্টাব্দ। আজকের অক্সফোর্ড তখন আতুড়ঘরেও নেই!
গুপ্ত সাম্রাজ্যের প্রথম কুমারগুপ্তের রাজত্বকালে (৪১৫-৪৫৫ খ্রিষ্টাব্দ) প্রতিষ্ঠিত হয় নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়। নালন্দার নাম ভারতীয় লেখক ও কবি অভয় কে তার ‘হাউ ইট চেঞ্জড দ্য ওয়ার্ল্ড’ বইয়ে লিখেছেন- নালম (পদ্ম যা জ্ঞানের প্রতীক) এবং ‘দা’ (যার অর্থ দেওয়া)-র সংমিশ্রণ থেকে এসেছে। এর অর্থ হলো জ্ঞানের সম্প্রসারণ। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে দালাই লামা একবার বলেছিলেন, ‘আমাদের সমস্ত জ্ঞানের উৎস নালন্দা থেকে এসেছে।’ একদিন-দুদিন নয়; টানা ৭০০ বছর ধরে মানব সমাজে সভ্যতার আলো ছড়িয়েছিল নালন্দা। পৃথিবীতে এমন বিশ্ববিদ্যালয় তখন আর একটিও ছিল না। অক্সফোর্ডের মতোই পৃথিবীজোড়া খ্যাতি ছিল নালন্দার। স্থাপত্যে ছিল অনন্য। পোড়ামাটির ভাঁজে ভাঁজে ছিল নান্দনিক শৈলী। বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরির তিনটি ভবন ছিল। একটি ছিল নয় তলার (রত্নদধি)। ইতিহাসবিদদের মতে, দর্শন, জ্যোতির্বিদ্যা, যুক্তিবিদ্যা, গণিত, চিকিৎসাশাস্ত্রসহ সেখানে ছিল ৯০ লাখ বই। বিশেষ করে আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় বিশ্ব-দিকপাল হয়ে উঠেছিল নালন্দা। গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানে সাফল্যও তখন ঈর্ষণীয়। শব্দবিদ্যা, পাণিনি, সাংখ্যতত্ত্ব, সংস্কৃত, ভাষাতত্ত্ব, জাদুবিদ্যা, বৌদ্ধশাস্ত্র, চতুর্বেদ, আইন বিষয়ও ছিল পাঠক্রমে। দীক্ষা নিতেন সারা পৃথিবীর দশ হাজারেরও বেশি ছাত্র। বিশ্বের প্রথম আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়। আজকের আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণা সেই নালন্দা থেকেই। সমকালের বিদ্বানদের ভাষায় নালন্দা ছিল মধ্যযুগের ‘আইভি লিগ’। যুক্তরাষ্ট্রের স্বনামধন্য ৮ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামষ্টিক নাম (হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়, ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়, প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়, কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়, ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়, ডার্টমাউথ কলেজ, কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়)।
গুরু-শিষ্যদের জন্য ছিল পৃথক আবাসন। ভিন্ন ভিন্ন বিভাগ, শ্রেণিকক্ষ। শিক্ষকদের জন্য ছিল পডিয়াম। শিক্ষার্থীরা বসতেন বৌদ্ধ আসনে সামনে। প্রার্থনা হল, পড়ুয়াদের বক্তৃতা কক্ষ, আড্ডা-অবসর সবই ছিল আলাদা আলাদা। এখনকার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক হলগুলোর মতো ভিনদেশি ছাত্রদের পৃথক আবাসন ব্যবস্থার প্রথম ধারণাও নালন্দার।
মূলত বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাবেই গড়ে ওঠে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়। আশপাশের শহর বলতে বৌদ্ধ ধর্মের পীঠস্থান ‘বোধগয়া’। রাজকীয় জীবন ফেলে আত্মশুদ্ধির টানে এখানেই ধ্যানে বসেছিলেন ভগবান বুদ্ধ। বর্তমান বিহারের (মগধ) পাটনার রাজগীরের নিকটবর্তী বড়গাঁওয়ে গড়ে ওঠে নালন্দা। উচ্চ শিক্ষার মহাগড় খ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়টিকে বৌদ্ধমঠ বা মহাবিহারও বলা হতো সেসময়। প্রায় সাড়ে তিন বর্গমাইলজুড়ে এই মহাবিহারের অবস্থান ছিল। চারদিকে সুউচ্চ প্রাচীর। সাত-আটটি বৃহৎ হলঘর। প্রায় ৩০০টি শ্রেণিকক্ষ। একেকটি কক্ষে বসতেন ৩০০ জন। এক থেকে দুই হাজারের মতো খ্যাতিমান অধ্যাপকের মিলনমেলা। শিক্ষার্থীদের মতো ভিনদেশি পণ্ডিতও ছিলেন সেখানে। নালন্দার অধীনে প্রায় ২০০টি গ্রাম ছিল। গ্রামগুলোর আয় (খাজনা), সাধারণ ও বিত্তশালী ব্যক্তিদের দান এবং রাজানুকূল্যে চলত নালন্দার খরচ।
সহজ ছিল না ভর্তি প্রক্রিয়া:
প্রাচীন নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া কিন্তু অত সহজ ছিল না। প্রবেশিকা পরীক্ষা নামে যথেষ্ট কঠিন প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেতেন শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরা সব অধ্যাপকরা বসতেন মৌখিক পরীক্ষা নিতে। মৌখিক পরীক্ষা যারা নিতেন সেই অধ্যাপকদের সমন্বয়ে তৈরি হতো একটি টিম। ভর্তি ছিল মেধার ভিত্তিতে। ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সব ধরনের শিক্ষার্থীকেই সুযোগ দেওয়া হতো। শিক্ষার্থীর কাছ থেকে কোনো বেতন নেওয়া হতো না। থাকা-খাওয়া ফ্রি। এমনকি পোশাক-পরিচ্ছদও বিনামূল্যে। নিয়মে ছিল কঠোর। নির্দিষ্ট সময়, নির্দিষ্ট নির্ঘণ্ট মেনে চলতে হতো শিক্ষক ও শিক্ষার্থী সবাইকেই।
বক্তিয়ার খিলজির আক্রমণ:
ইতিহাসবিদদের একপক্ষের মতে, ১১৯৩ সালে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি নালন্দা আক্রমণ করেন। হত্যা, ধ্বংসের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি তিনটি পুড়িয়ে দেন। বৌদ্ধ ধর্মের বিকাশ-প্রসারে ক্ষুব্ধ হয়েই ওই হামলা চালান খিলজি। পাশ্ববর্তী রাজাদেরও হাত ছিল ওই হামলার পেছনে। ইতিহাসের এ দিকটি নিয়ে কমতি নেই বিতর্কে। অন্যপক্ষের বিশ্বাস, বখতিয়ার খিলজি বঙ্গে আসেন ১২০৪ সালে। তাহলে ১০৪ বছর আগে থেকেই তিনি কীভাবে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংস করেছিলেন? তবে উত্তর ভারতের দৌর্দণ্ড প্রতাপশালী শাসক
খিলজিই নালন্দা ধ্বংস করেছিলেন; তা রীতিমতো রূপকথার গল্পের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ভারতবর্ষের বিভিন্ন জনপদে। প্রচলিত লোককাহিনি অনুসারে, তুর্কি সেনাপতি খিলজি একসময় গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। দরবারের হাকিম বা চিকিৎসকরা তাকে সুস্থ করতে ব্যর্থ হন। তখন কেউ তাকে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য রাহুল শ্রীভদ্রের কাছে পরামর্শ নিতে বলেন। কিন্তু খিলজি প্রথমে কোনো ভারতীয় চিকিৎসকের ওষুধ খেতে রাজি হননি। পরে তিনি শর্ত দেন যে, রাহুল শ্রীভদ্র যেন তাকে সরাসরি ওষুধ না খাইয়ে সুস্থ করেন। কথিত আছে, খিলজিকে পবিত্র কোরআন শরীফের কিছু পাতা পড়ার পরামর্শ দেন আচার্য রাহুল শ্রীভদ্র। চালাকি করে সেই পাতার কোণায় ওষুধ মাখিয়ে দিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল, পাতা উল্টিয়ে পড়তে পড়তে তার অজান্তেই সেবন করে ফেলবেন। ফলও আসে হাতে হাতে- সুস্থ হয়ে ওঠেন খিলজি। নিজের দরবারের চিকিৎসকদের চেয়ে একজন ভারতীয় বৌদ্ধ পণ্ডিতের জ্ঞান ও চিকিৎসা দক্ষতা বেশি—এই ঈর্ষা থেকে খিলজি পরবর্তীতে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংস করেন। এ নিয়ে বিতর্কও রয়েছে ঢের। অনেক ইতিহাসবিদ বিশ্বাস করেন, বখতিয়ার খিলজির নালন্দা ধ্বংসের বিষয়টি সরাসরি সমসাময়িক নথিতে সেভাবে প্রমাণিত নয়। ভারতের পুরাতাত্ত্বিক এইচ. ডি. সাঙ্কালিয়া তার ১৯৩৪ সালের ‘দ্য ইউনিভার্সিটি অফ নালন্দা’ বইয়েও অবশ্য বৌদ্ধ ধর্ম উৎখাতকেই হামলার অন্যতম কারণ হিসেবে তুলে ধরেছেন। লিখেছেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্গ-সদৃশ ক্যাম্পাস ও দিনে দিনে বিদ্যাচর্চার শিরোমণি বা কেন্দ্রস্থল হয়ে ওঠাও হামলার কারণ হতে পারে।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘এটি নালন্দার ওপর প্রথম হামলা ছিল না। প্রথম হামলা হয় পঞ্চম শতকে। পরবর্তীতে বাংলার গৌড় রাজা আবার হামলা চালিয়ে গুরুতর ধ্বংস ঘটায় অষ্টম শতকে। যতদিনে খিলজি আক্রমণ চালায়, ততদিনে বৌদ্ধ ধর্ম ছিল ভারতে হ্রাসের দিকে। তাই এই তৃতীয় আক্রমণ ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্যুঘাত।’
পালিয়ে বাঁচতে পেরেছিলেন: চারদিকে আগুন। দাউ দাউ করে জ্বলছে সুসজ্জিত গ্রন্থাগারগুলো। চোখের সামনে পুড়ছে নালন্দার ‘হৃৎপিণ্ড’। হাজার হাজার শিক্ষার্থী আর শিক্ষকের আত্মচিৎকার। প্রাণ বাঁচাতে দিশেহারা বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের দিগ্বিদিক ছুটোছুটি। আগুনের লেলিহান শিখায় ছেয়ে গেছে মগধের আকাশ। বখতিয়ার খিলজির ক্রোধে ‘পৃথিবীর জ্ঞানসাগরে’ তখন আগুনের টগবগে ঢেউ। এর মধ্যেই প্রাণবাজি রেখে কতগুলো পান্ডুলিপি নিয়ে পালিয়ে বাঁচতে পেরেছিলেন কয়েকজন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী। বর্তমানে তা যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসের কাউন্টি মিউজিয়াম অফ আর্ট এবং তিব্বতের ইয়ারলিং মিউজিয়ামে সংরক্ষিত। তিব্বতের বৌদ্ধ পণ্ডিত তারানাথের গবেষণায়, নয় তলা ওই গ্রন্থাগার থেকেই অমূল্য কতগুলো তালপাতার পুথি নিয়ে পালাতে সক্ষম হয়েছিলেন ভীতসন্ত্রস্ত সন্ন্যাসীরা।

