ম্যালেরিয়ার ঝুঁকিতে ঢাকা, আগেই সতর্ক করেছিলেন বিশেষজ্ঞরা
- সবচেয়ে বেশি শনাক্ত উত্তরায়
- সর্তক বার্তা দেওয়া হয় ডব্লিওইএচওকে

প্রতীকী ছবি
হালকা জ্বর অনুভব করে গত বৃহস্পতিবার শেষ অফিস করেছেন বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান। শরীরের অবস্থা খারাপ হলে সোমবার ভর্তি হন হাসপাতালে। অবশেষে ম্যালেরিয়ার কাছে হার মেনে শুক্রবার ভোরে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। এ ঘটনার পর নগরবাসীর মধ্যে এক ধরনের উদ্বেগ- পাহাড়ি অঞ্চল ভেদ করে খোদ রাজধানীতে কি ম্যালেরিয়া মশার বিস্তার ঘটছে।
‘আগামীর সময়’ এর তাৎক্ষণিক অনুসন্ধানে জানা যায়, গবেষকরা ইতোপূর্বে সরকার এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে (ডব্লিউএইচও) সর্তক করেছিলেন, বর্তমান ম্যালেরিয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে ঢাকা।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, গত সপ্তাহে রাজধানীতে ম্যালেরিয়া মশার বিস্তারের গবেষণার একটি রিপোর্ট ঢাকার উত্তর সিটি কর্পোরেশনের কাছে তুলে দিয়েছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক বিশিষ্ট কীটতত্ববিদ ও মশা গবেষণা বিশেষজ্ঞ ড. কবিরুল বাশার। ওই রিপোর্টে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে অস্তিত্ব পাওয়া গেছে ম্যালেরিয়ার মশার। সববেচে বেশি অস্তিত্ব ছিল উত্তরায়। এ বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে ঢাকাস্থ ডব্লিউএচও’র কার্যালয়ে ই-মেইল বার্তা দিয়েও সর্তক করেছেন ড. কবিরুল বাশার।
মশা গবেষণা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার মন্তব্য করেন, ‘সার্ভে করতে গিয়ে গত সপ্তাহে ঢাকার উত্তরার বিভিন্ন স্থানে অ্যানোফিলিস মশা (ম্যালেরিয়া) পেয়েছি ছয় প্রজাতির। এছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে তিন ধরনের ম্যালেরিয়ার ১০০-এর বেশি মাহক মশার অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। ম্যালেরিয়া মশা আছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের আরবান এরিয়ায়। ফলে ঢাকাতে এর অস্তিত্ব থাকবে না, সেটি ভাবা ঠিক নয়।’
প্রসঙ্গত, ম্যালেরিয়ার প্রধান বাহক হলো স্ত্রী প্রজাতির অ্যানোফিলিস মশা। এ মশাগুলো প্লাজমোডিয়াম নামক পরজীবী বহন করে, যা ম্যালেরিয়া রোগ সৃষ্টি করে মানুষের শরীরে। সাধারণত, সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত কামড়ায় এ মশা।
জানা যায়, ২০২৫ সালে দেশে ম্যালেরিয়ায় মৃত্যু হয় মোট ১৬ জনের। ২০১৬ সালের পর দেশে ম্যালেরিয়ায় এত বেশি মৃত্যু দেখা যায়নি আর কোনো বছরে। ওই বছর মারা যাওয়া ১৬ জনের মধ্যে ৯ জনই মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সদস্য। মূলধারার জনগোষ্ঠীর মধ্যে ম্যালেরিয়ায় মৃত্যুর সংখ্যা কিছুটা কমলেও নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে রাজধানীতে ম্যালেরিয়ায় বাণিজ্য সচিবের মৃত্যু। তবে গবেষকরা বলছেন, যেহুতু বাণিজ্য সচিব ১৫ দিন আগে আফ্রিকা সফর করেছেন সেহুতু ধারণা করা হচ্ছে, সেখানেই তিনি আক্রান্ত হতে পারেন ম্যালেরিয়া মশার মাধ্যমে।
এদিকে বর্তমানে কেবল ম্যালেরিয়ার বাহক অ্যানোফিলিস নয়, আরও নানা প্রজাতির মশার বিস্তার বাড়ছে আশঙ্কাজনকভাবে। গবেষকদের দাবি, ম্যালেরিয়ার মশা এখন ছড়িয়ে পড়ছে আগের চেয়ে অনেক বেশি নতুন নতুন এলাকায়। যদিও সরকার ২০২৪-২০৩০ সালের কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী স্থানীয়ভাবে ম্যালেরিয়া সংক্রমণ শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে ২০৩০ সালের মধ্যে। বর্তমানে দেশে ম্যালেরিয়ামুক্ত বলে দাবি করা হয় ৫১ জেলাকে।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মোহাম্মদ জাহেদুর রহমান এক গবেষণায় দেখিয়েছেন, গত ৩০ বছরে বাংলাদেশের বার্ষিক গড় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার ছিল প্রতিবছর ০.০১৮৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বিশেষ করে শীতকাল আগের চেয়ে উষ্ণ হচ্ছে, যা দীর্ঘায়িত করছে মশার বংশবিস্তারের মৌসুমকে।
গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, মশার প্রজননের জন্য আদর্শ তাপমাত্রা ২৬ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। মশা ও পরজীবী উভয়ের জন্যই অত্যন্ত অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে বাংলাদেশের বর্তমান গড় তাপমাত্রা (২৫ থেকে ৩১ ডিগ্রি সেলসিয়াস)। ফলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশে ম্যালেরিয়া ও অন্যান্য মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি থাকার সম্ভাবনা রয়েছে আরও দীর্ঘ সময় ধরে।
‘ডিসপারিটিজ ইন রিস্কস অব ম্যালেরিয়া অ্যাসোসিয়েটেড উইথ ক্লাইমেটিক ভ্যারিয়াবিলিটি অ্যামাং উইমেন, চিলড্রেন অ্যান্ড এলডারলি ইন দ্য চিটাগং হিল ট্র্যাক্টস অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক একটি গবেষণায় দেখা গেছে, আবহাওয়ার পরিবর্তন পার্বত্য অঞ্চলে ম্যালেরিয়ার ঝুঁকিকে প্রভাবিত করছে বিভিন্নভাবে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে মশার প্রজনন ও জীবাণুর বিকাশ হয় দ্রুত।
গবেষণায় উঠে এসেছে, শিশু ও বয়স্কদের সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়বে অতিরিক্ত বৃষ্টির সময়, আর তাপমাত্রা বৃদ্ধির সময় ম্যালেরিয়ার প্রবণতা বেশি দেখা যায় নারীদের মধ্যে।
জানা যায়, দেশে একসময় বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সমস্যা ছিল ম্যালেরিয়া। তবে গত দেড় দশকে সরকার ও উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টায় অনেক কমে এসেছিল আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার। ২০১০ সালে ৫৫ হাজারের বেশি মানুষ আক্রান্ত হলেও ২০১২ সালে তা কমে নেমে আসে ৬ হাজারে। তবে দীর্ঘস্থায়ী হয়নি এই সাফল্যের ধারা; ২০২৩ সালে আক্রান্ত হন ১৬ হাজার ৫৬৭ জন এবং ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা দাঁড়ায় ১০ হাজার ১৫৬ জনে। সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকায় এখনও পুরোপুরি ঝুঁকি দূর হয়নি এই রোগের।

