ইয়েমেনি ‘স্পাইডার-ম্যান’ সম্পর্কে যা জানা গেল

শনিবার উদ্ধারকারীরা আল কাকা ইবনে আবতারের মরদেহ আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখের হ্রদ থেকে তুলে আনেন।
যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেনের ধুলোবালি আর সংঘাতের খবরের বাইরেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পর্দায় একটা অন্যরকম রোমাঞ্চের জন্ম দিয়েছিলেন ৩০ বছর বয়সী এক তরুণ। নাম তার আল-কাকা ইবনে আনতার, কিন্তু ভার্চুয়াল দুনিয়া আর ইয়েমেনের তরুণ প্রজন্মের কাছে তিনি ছিলেন এক অকুতোভয় ‘স্পাইডার-ম্যান’। কোনো নিরাপত্তা দড়ি নেই, নেই কোনো আধুনিক সেফটি গিয়ার- কেবলমাত্র নিজের শারীরিক শক্তি, অবিশ্বাস্য ভারসাম্য আর বুকভরা সাহস নিয়ে তিনি খালি হাতে বেয়ে উঠতেন ইয়েমেনের প্রাচীন দুর্গের দেয়াল, খাড়া পাহাড় কিংবা বিপজ্জনক সব বহুতল ভবনের চূড়া।
কিন্তু গত শুক্রবার ইয়েমেনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এক ঐতিহাসিক প্রাকৃতিক বিস্ময় ‘হারদাহ বাঁধ’ আগ্নেয়গিরির খাড়া পাথুরে দেয়ালে তাঁর সেই চিরচেনা স্পাইডার-ম্যানের ম্যাজিক আর খাটল না। মুহূর্তের এক অসতর্কতা, হাত ফসকে যাওয়া এবং তার পর এক বুক কাঁপানো পতন ইয়েমেনের এই জনপ্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সারের জীবনের গল্পে চিরতরে টেনে দিল এক মর্মান্তিক সমাপ্তি।
ধালের প্রদেশের এই হারদাহ বাঁধ মূলত একটি মৃত আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পর্যটকদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। এই জ্বালামুখের ঠিক তলদেশেই রয়েছে একটি ফুটন্ত ও তপ্ত সালফারের হ্রদ। ইন্টারনেট দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়া এক শ্বাসরুদ্ধকর ভিডিওতে দেখা যায়, আনতার অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সেই আগ্নেয়গিরির প্রায় উল্লম্ব ও রুক্ষ পাথুরে দেয়াল বেয়ে ওপরের দিকে উঠছিলেন। ওপরের প্রান্ত ছুঁইছুঁই মুহূর্তে হঠাৎ করেই তিনি নিয়ন্ত্রণ হারান এবং প্রায় ১২০ মিটার চওড়া সেই গভীর খাদের তলদেশে ছিটকে পড়েন।
আগ্নেয়গিরির ভেতরের তীব্র তাপমাত্রা আর সালফারের কারণে পাথরগুলো এমনিতেই পিচ্ছিল ও ভঙ্গুর থাকে, যা সম্ভবত আনতারের হিসাবের বাইরে ছিল।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর ইয়েমেনের সিভিল ডিফেন্স অথরিটির ওয়াটার রেসকিউ টিম যে উদ্ধার অভিযানটি পরিচালনা করে, সেটিকে তারা তাদের ইতিহাসের অন্যতম বিপজ্জনক এবং জটিল মিশন হিসেবে বর্ণনা করেছে। বিষাক্ত গ্যাস, প্রচণ্ড উত্তাপ আর দুর্গম ভূপ্রকৃতির মাঝে ক্রেন ও দড়ির সাহায্যে নিচে নেমে উদ্ধারকর্মীরা প্রায় ৩০ মিটার বা ৯৮ ফুট গভীর সালফার লেকের পানির নিচ থেকে আনতারের নিথর দেহ উদ্ধার করতে সক্ষম হন।
এই অসাধ্য সাধনের জন্য উদ্ধারকারী দলের সদস্যদের পরবর্তীতে বিশেষ রাষ্ট্রীয় পদোন্নতিও দেওয়া হয়।
ইয়েমেনের মতো একটি দেশে আল-কাকা ইবনে আনতারের বিখ্যাত হয়ে ওঠার গল্পটা কেবল সস্তা বিনোদনের ছিল না। গত এক দশক ধরে যে দেশের যুবসমাজ কেবল বোমাবর্ষণ, যুদ্ধ আর মানবিক সংকটের খবর শুনে বড় হয়েছে, তাদের কাছে আনতার ছিলেন এক ইতিবাচক আশার আলো, স্বাধীনতার প্রতীক। তার ফেসবুক, টিকটক ও ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে ইয়েমেনের এক ভিন্ন রূপ তুলে ধরত।
দেশের মনোরম প্রাকৃতিক ল্যান্ডস্কেপ ও ঐতিহাসিক স্থানগুলোকে ব্যাকগ্রাউন্ড বানিয়ে তিনি যখন পার্কুর এবং অ্যাক্রোবেটিক স্টান্টের ভিডিও পোস্ট করতেন, তখন বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মানুষ মুগ্ধ হয়ে দেখত। দেশের পর্যটন খাতকে পুনরুজ্জীবিত করার পেছনেও তাঁর এই রোমাঞ্চকর ভিডিওগুলোর বড় অবদান ছিল।
তাঁর এই আকস্মিক ও অকাল মৃত্যুতে এখন অনলাইন দুনিয়ায় শোকের মাতম। ভক্তরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাঁদের প্রিয় ইয়েমেনি স্পাইডার-ম্যানের পুরনো ভিডিওগুলো শেয়ার করে শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন। অনেকেই বলছেন, আনতার তাঁদের শিখিয়েছিলেন কীভাবে সমস্ত ভয়কে জয় করে প্রতিকূল পরিবেশেও নিজের স্বপ্নকে সর্বোচ্চ চূড়ায় নিয়ে যাওয়া যায়।
তবে এই ট্র্যাজেডি একই সাথে ভার্চুয়াল দুনিয়ায় লাইক, ভিউ আর ফলোয়ারের জন্য নিজের জীবনকে তুচ্ছ করে এমন ঝুঁকিপূর্ণ স্টান্ট করার ভয়াবহতা নিয়ে বড় এক সতর্কবার্তাও দিয়ে গেল। ইয়েমেনের সেই জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখটি এখন থেকে কেবল একটি পর্যটন কেন্দ্রই নয়, বরং এক অদম্য সাহসী তরুণের বীরত্ব আর ট্র্যাজেডির এক জীবন্ত স্মারক হয়ে থাকবে।





