কন্যাদহ বাঁওড়ে নৌকাবাইচ
- আমাদের হাওর-বাঁওড়ের অভাব নেই। আর এগুলোতে বেড়ানোর সেরা সময় বর্ষা। শ্রাবণের মাঝামাঝিতে এখন বৃষ্টির রাজত্ব দেশ জুড়ে। এ সময় পাঠকদের তাই ঘুরিয়ে আনছি যশোর আর ময়মনসিংহের জলে টইটম্বুর দুই জলাধার থেকে

ছবি: সাব্বির মাহমুদ রাবাত
সে অনেক অনেক কাল আগের কথা। কন্যাদহ বাঁওড়ের বিপরীত দিকের দুই গ্রামের এক যুবক ও যুবতীর মধ্যে বিয়ে ঠিক হলো। বিয়ের দিনের আনুষ্ঠানিকতা শেষে সদ্য বিবাহিত বর ফিরছিলেন কনেকে নিয়ে। বাঁওড়ের মাঝামাঝিতে এসে বাধে বিপত্তি। আকস্মিক নৌকাডুবিতে প্রাণ হারান বর-কনে। ওপারের গ্রামের পিতা-মাতার কন্যা হারানোর শোক প্রশমিত হতে লেগেছিল অনেক দিন। সেই থেকে এই জলাশয়ের নাম ‘কন্যাদহ বাঁওড়’। যশোর অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষায় অবশ্য ডাকা হয় ‘কন্নিদা’ নামে। ‘দহ’ বলতে সাধারণত জলপূর্ণ স্থানকে বোঝানো হয়।
বর ও বউয়ের প্রাণহানিতে এই কাহিনির শেষ নয়। লোকগাথা মতে, বর ও কনের মৃতদেহ কখনোই পাওয়া যায়নি। এর পরের ঘটনা আরও চমকপ্রদ। গ্রামবাসী কদিন বাদেই লক্ষ করল, বাঁওড়ের পাশ ঘেঁষে হঠাৎ করেই ভেসে উঠেছে দুটি গাছ। বাঁওড়ের গা ঘেঁষে দণ্ডায়মান গাছটির নামকরণ করা হয় ‘বর গাছ’। পাশেই বাঁওড়ের জলের ওপর কিছুটা হেলানো অবস্থায় থাকা গাছটিকে গ্রামবাসী চেনে ‘বউ গাছ’ হিসেবে। এখনো বর-বউ গাছ হিসেবে বহুল পরিচিত বৃক্ষ দুটি। বর গাছের ছাল কাটলে বের হয় লাল আঠা। স্থানীয় জনসাধারণের কাছে এই লাল আঠা হলো রক্তের প্রতীক। অন্যদিকে, বউ গাছের বাকল কাটলে বেরিয়ে আসে সাদা আঠা। এই সাদা আঠাকে গ্রামবাসী আখ্যা দেয় দুধ হিসেবে। এই কাহিনির বয়সের কোনো যে গাছপাথর নেই। স্থানীয় বয়োবৃদ্ধরা সবাই এই গল্প শুনেছেন তাদের বাপদাদাদের কাছ থেকে। সেই থেকে লোকমুখে প্রজন্মান্তরে এভাবেই এই কাহিনি প্রবাহিত হচ্ছে তার পরের প্রজন্মের কাছে। গল্পকথকরা মরে যায়; রয়ে যায় গল্প।
নৌকাবাইচ বাদেও এই বাঁওড়কে ঘিরে থাকে আরও নানান উৎসব। মাঘী পূর্ণিমায় হয় বিশাল এক মেলা
এই বর-বউয়ের প্রাণহানিই অবশ্য এই বাঁওড়ের শেষ প্রাণহানি নয়। বছর ঘুরতেই একটা-দুটো প্রাণহানি এই বাঁওড়ের নৈমিত্তিক ঘটনা। বিশাল এই বাঁওড়ের পাড়ঘেঁষা ঘনবসতিই সম্ভবত এর মূল কারণ। পরিবারের লোকের চোখ এড়িয়ে বাঁওড়ে নামা শিশুদের দলই মূলত এসব দুর্ঘটনার শিকার হয়। ব্যতিক্রমও অবশ্য কম নয়। বছর কতক আগে বাঁওড়ের জলে এক কিশোর ডুবে যায়। বন্ধুদের সঙ্গে গোসল করতে নেমে ডুব দেওয়ার পরে তাকে পাওয়া যায়নি। একদিন বাদে তাকে বাঁওড়ের এক কোণে অজ্ঞান অবস্থায় জীবিত অবস্থায় পাওয়া যায়। মাঝের সময়টায় ঠিক কী ঘটেছিল, সেটি জানার প্রচণ্ড আগ্রহ ছিল এলাকার লোকের। ওই কিশোর নাকি কখনোই সেই রহস্য খোলাসা করেনি। বাজারের এক দোকানে বসে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে স্থানীয় এক বয়োজ্যেষ্ঠের নিকট শুনছিলাম ওই কিশোরের ঘটনা। কথা শেষ না হতেই সাইকেল সওয়ারি এক কিশোরকে দেখিয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ ভদ্রলোক বললেন, ‘এই সেই ছেলে।’ ওর সঙ্গে কথা বলার তীব্র আগ্রহে আমরা শশব্যস্ত হলেও ওর নাগাল পাওয়া গেল না। সাইকেলের প্যাডেল দুটোতে ডানা বেঁধে ও মুহূর্তেই হাওয়া!
কন্যাদহ বাঁওড়ের অবস্থান সীমান্তবর্তী জেলা যশোরের শার্শা উপজেলায়। উলাশী ইউনিয়নের যে গ্রামে এই বাঁওড়ের অবস্থান, সেটির নামও কন্যাদহ। আগের রাতে শার্শা উপজেলা পরিষদ ডাকবাংলোতে থান গেড়েছিলাম রাবাত ভাই আর আমি। রাবাত ভাইয়ের মোটরসাইকেলে চেপে উপজেলা সদর থেকে ১১ কিলোমিটার দূরত্বের কন্যাদহ বাঁওড়ে যেতে খুব একটা বেগ পেতে হলো না। বাঁওড়ের সৃষ্টি মূলত নদীর ছেড়ে আসা বাহু থেকে। কন্যাদহ বাঁওড়ের আঁতুড়ঘর বেতনা নামক আন্তঃসীমান্ত নদী। চলার পথে কাস্তের মতো অসংখ্য বাঁক নিয়ে বাংলাদেশ-ভারতের নানান জনপদ ছুঁয়ে গেছে এই নদী। বেতনার গতিপথ পরিবর্তনের ফলেই সৃষ্টি হয়েছে কন্যাদহের এই বাঁওড়।
আমরা যেদিন বাঁওড় দেখতে গিয়েছিলাম, সেদিন সৌভাগ্যবশত আয়োজন করা হয়েছিল নৌকাবাইচের। বাঁওড়ের দুপাশে লোকের উপচে পড়া ভিড়। দূরদূরান্ত থেকে মোটরসাইকেলে চেপেও এসেছে লোকে। নির্দিষ্ট জায়গা থেকে নৌকাগুলো ছেড়ে যাওয়ার পরে বাঁওড়ের পুরো ছবি নেওয়ার উদ্দেশ্যে ড্রোনাচার্য হিসেবে পরিচিত রাবাত ভাই ড্রোন ওড়াতেই আমাদের ঘিরে ধরল চাকবাঁধা মানুষ। ড্রোনের সাহায্য নিয়ে রেসের অগ্রগতি দেখতে উৎসুক মানুষের চোখ নিবদ্ধ হলো মোবাইলের স্ক্রিনে। এর মধ্যে এক পিচ্চি জিজ্ঞেস করল, ‘এই ভিডিও ইউটিউবে পাব?’ আমি প্রত্যুত্তরে জানালাম, ‘পাবা। তবে লাইক-কমেন্ট করতে ভুলবা না যেন!’ একটুও না ঘাবড়ে যশোরের আঞ্চলিক ভাষায় পিচ্চির সপ্রতিভ উত্তর, ‘তালি পরে সাবস্ক্রাইব করা আর বাকি থাকবে কেন? সেটাও করে নেব নে!’ নৌকাবাইচ বাদেও এই বাঁওড়কে ঘিরে থাকে আরও নানান উৎসব। মাঘী পূর্ণিমায় বিশাল এক মেলা হয় বাঁওড়কে কেন্দ্র করে। ওই মেলাকে কেন্দ্র করে আশপাশের কয়েক গ্রাম হয়ে ওঠে উৎসবমুখর।
বিশাল কলেবরের এই বাঁওড় ঘুরে দেখতে বেশ সময় লাগে। মোটরসাইকেলে চেপে এপার-ওপারে চরকির মতো ঘুরে বেড়ালাম আমরা দুজন। ফাঁকে ফাঁকে নৌকাবাইচের আগ্রগতির দিকেও চোখ রাখছি। লোককাহিনির বদৌলতে অমর বর-বউ গাছ দেখতে হলে যেতে হবে কন্যাদহ নারায়ণ মন্দিরের পাশে। কালের সাক্ষী হয়ে গাছ দুটো এখনো বেঁচে আছে।
বয়সের সঙ্গে সঙ্গে এরা রূপ নিয়েছে মহিরুহে। সাম্প্রতিককালের আম্ফান ঝড়ে একটি গাছ নুয়ে পড়েছে। তবে গাছ দুটিকে ঘিরে রাখা লোকগাথা এদের বাঁচিয়ে রাখবে আরও বহু বছর। এই গাছ দুটোকে এখনো পূজা করে স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। মানত করে দিয়ে যাওয়া নৈবেদ্যের দেখা এখনো গাছের গোড়ায় দেখতে পাওয়া যায়। বর-বউ গাছের মধ্যে বউ গাছের একটু আলাদা কদর আছে। সন্তানধারণে বিলম্ব হলে নারীরা এসে মানত করেন বউ গাছের কাছেই। কন্যাদহ বাঁওড় দেখে ফেরার সময় স্বাদ নিয়ে আসতে পারেন জামতলার ‘সাদেক গোল্লা’ খ্যাত বিখ্যাত মিষ্টির।









