মানুষের মতোই কথা বলে তিমি, বলছে গবেষণা

ছবি: স্পার্ম হোয়েল (তিমি)।
মানুষ আর স্পার্ম তিমি- দুই প্রজাতির জীবনযাত্রা যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন জগতের। একটি স্থলভাগে বসবাস করে, অন্যটি সমুদ্রের গভীরে বিচরণকারী বিশালাকৃতির প্রাণী। তবু সাম্প্রতিক এক গবেষণা দেখাচ্ছে, এই দুই ভিন্ন জগতের প্রাণীর যোগাযোগ ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে বিস্ময়কর মিল।
নতুন এই গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে প্রোসেডিং অব দ্য রয়েল সোসাইটি বি জার্নালে।
এতে দেখা গেছে, স্পার্ম তিমিরা যে ‘কোডা’ নামে পরিচিত ক্লিকধ্বনির বা শব্দের মাধ্যমে যোগাযোগ করে, তা শুধু এলোমেলো শব্দ নয়; বরং এতে রয়েছে মানুষের ভাষার মতো জটিল গঠন, নিয়ম এবং ধ্বনিগত বৈচিত্র্য। গবেষকদের মতে, তিমিদের এই যোগাযোগব্যবস্থা মানব ভাষার ধ্বনিবিজ্ঞান ও ধ্বনিতত্ত্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সাদৃশ্য বহন করে।
স্পার্ম তিমিরা ছোট ছোট ক্লিকের সমষ্টি ব্যবহার করে কথা বলে। কখনো এই ক্লিকগুলো ছোট বা দীর্ঘ হয়, কখনো স্বরের ওঠানামা ঘটে-যা মানুষের ভাষায় স্বরবর্ণ পরিবর্তনের মতো কাজ করে। গবেষণায় দেখা গেছে, এই ধরণের প্যাটার্ন ম্যান্ডারিন, ল্যাটিন কিংবা স্লোভেনীয় ভাষার মতো মানব ভাষার সঙ্গে মিল রেখে চলে।
তিমিদের জীবন মানুষের থেকে আলাদা হলেও তাদের সামাজিক আচরণে আশ্চর্য মিল। তারা পরিবারভিত্তিক সমাজে বাস করে, বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, এমনকি একে অপরের বাচ্চাদের দেখাশোনা করে
অর্থাৎ, তিমিরা যেন নিজেদের মতো করে এক ধরনের ‘বর্ণমালা’ তৈরি করে নিয়েছে, যা দিয়ে তারা বিভিন্ন অর্থ প্রকাশ করতে পারে।
এই আবিষ্কারের পেছনে কাজ করছে ‘প্রজেক্ট সেটি’ নামের একটি গবেষণা উদ্যোগ। দীর্ঘদিন ধরে ডোমিনিকা উপকূলে স্পার্ম তিমিদের ওপর গবেষণায় এই সাফল্য মেলে। আধুনিক প্রযুক্তি, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে বিজ্ঞানীরা এখন ধীরে ধীরে এই রহস্যময় ভাষা উন্মোচনের চেষ্টা করছেন।
একসময় বিজ্ঞানীরা জানতেনই না যে স্পার্ম তিমি কোনো শব্দ করে যোগাযোগ করে, কিন্তু এখন তাদের ভাষার জটিলতা নতুন করে বিস্মিত করছে গবেষকদের।
প্রকল্পটির প্রতিষ্ঠাতা ডেভিড গ্রুবার বলেন, এই আবিষ্কার মানুষের জন্য এক ধরনের বিনয়ের শিক্ষা। তার মতে, মানুষই একমাত্র প্রজাতি নয়, যাদের সমৃদ্ধ যোগাযোগ, সামাজিকতা ও সংস্কৃতি রয়েছে।
তিনি ধারণা দেন, তিমিরা হয়তো কোটি কোটি বছর ধরে প্রজন্মের পর প্রজন্মে তথ্য আদান-প্রদান করে আসছে, আর মানুষ এখন কেবল সেই জটিলতা বোঝার প্রযুক্তি হাতে পেয়েছে।
স্পার্ম তিমিদের জীবনযাপনও বেশ ব্যতিক্রমী। তারা খাবারের সন্ধানে প্রায় ৫০ মিনিট পর্যন্ত গভীর সমুদ্রে ডুব দেয় এবং মাত্র ১০ মিনিটের জন্য ভেসে ওঠে। এই অল্প সময়েই তারা একে অপরের খুব কাছে এসে যোগাযোগ করে। গবেষকদের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, তিমিরা প্রায় মাথা মিলিয়ে ‘কথা বলে’, যা জটিল ও সূক্ষ্মবার্তা আদান-প্রদানের ইঙ্গিত দেয়।
গবেষণার প্রধান লেখক গাসপার বেগুস বলেন, তিমিদের জীবন মানুষের থেকে আলাদা হলেও তাদের সামাজিক আচরণে আশ্চর্য মিল। তারা পরিবারভিত্তিক সমাজে বাস করে, বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, এমনকি একে অপরের বাচ্চাদের দেখাশোনা করে এবং সম্মিলিতভাবে সন্তান জন্মদানের সময় পাশে থাকে।
এই গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, স্পার্ম তিমির যোগাযোগ কেবল কয়েকটি ক্লিকের সমষ্টি নয়; বরং এতে রয়েছে বহুস্তরীয় গঠন, যা আগে পুরোপুরি বোঝা যায়নি। এই জটিলতা ইঙ্গিত দেয় যে তাদের ভাষা অনেক বেশি সমৃদ্ধ এবং সংগঠিত।
বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এই আবিষ্কার ভবিষ্যতে মানুষ ও তিমির মধ্যে প্রকৃত অর্থে যোগাযোগ স্থাপনের সম্ভাবনাকে এক ধাপ এগিয়ে দিয়েছে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে অন্তত ২০ ধরনের তিমির সংকেত বোঝার লক্ষ্য নিয়েছে প্রজেক্ট সেটি। তিমিদের সঙ্গে সরাসরি ‘কথা বলা’ এখনো দূরের বিষয়, তবুও গবেষকরা এটিকে অসম্ভব মনে করছেন না।
ডেভিড গ্রুবারের ভাষায়, বর্তমানে মানুষ যেন একটি দুই বছরের শিশুর মতো- কিছু শব্দ বুঝতে পারছে মাত্র। তবে প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে হয়তো খুব শিগগিরই এই বোঝাপড়া আরও গভীর হবে।



