মৃত্যুর কাছাকাছি পৌঁছে ফিরে আসার অভিজ্ঞতা আসলে কী?

মৃত্যুর কাছে পৌঁছে ফিরে আসা কেউ কেউ বলেছেন এক অন্ধকার সুড়ঙ্গের শেষে ঝলমলে আলো দেখেছেন। ছবি: সায়েন্স ফটো লাইব্রেরি
মৃত্যুর খুব কাছে গিয়ে আবার ফিরে আসার গল্প যুগে যুগে মানুষের কৌতূহল জাগিয়েছে। কেউ বলেন, তিনি এক অন্ধকার সুড়ঙ্গের শেষে ঝলমলে আলো দেখেছেন। কেউ দেখেছেন জীবনের সব স্মৃতি চোখের সামনে বজ্রগতিতে ভেসে উঠছে। কেউ আবার দাবি করেন, নিজের শরীরের বাইরে উঠে দূর থেকে নিজেকেই দেখেছেন। শুনতে সিনেমার দৃশ্য মনে হলেও, পৃথিবীর অসংখ্য মানুষ এমন অভিজ্ঞতার কথা বাস্তবেই জানিয়েছেন। এই অভিজ্ঞতার নাম নিয়ার-ডেথ এক্সপেরিয়েন্স, অর্থাৎ মৃত্যুর কাছাকাছি অভিজ্ঞতা।
বিষয়টি শুধু রহস্যময়ই নয়, বিস্ময়করও। কারণ, যারা এমন অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরে আসেন, তাদের অনেকেই আগের মানুষ থাকেন না। তারা জীবনকে নতুনভাবে দেখতে শুরু করেন, মৃত্যুভয় কমে যায়, মানুষের প্রতি মমতা বাড়ে, অর্থসম্পদের প্রতি টান কমে। যেন মৃত্যুর দরজায় গিয়ে তারা জীবনের মানে শিখে ফেরেন।
কিন্তু এই অভিজ্ঞতা আসলে কেমন? সত্যিই কি মানুষ পরকালের ঝলক দেখে আসে, নাকি সবই বিপর্যস্ত মস্তিষ্কের খেলা?
সব নিয়ার-ডেথ অভিজ্ঞতা এক রকম নয়। অনেকের জন্য এটি শান্তি, আলো আর অপার আনন্দের অনুভূতি। আবার কারও জন্য এটি ভয়ংকর অন্ধকার, আতঙ্ক আর দুঃস্বপ্নের মতো। গবেষকদের ধারণা, প্রায় প্রতি পাঁচটি ঘটনার একটি নেতিবাচক হতে পারে।
ইতিবাচক অভিজ্ঞতার বর্ণনায় বারবার কিছু বিষয় ফিরে আসে। অনেকেই বলেন, শরীর হঠাৎ হালকা হয়ে গেছে। মনে হয়েছে, তারা বিছানায় পড়ে থাকা নিজের দেহের ওপর ভেসে আছেন। কেউ চিকিৎসকদের ব্যস্ততা ওপর থেকে দেখেছেন বলে দাবি করেন। কারও চোখের সামনে শৈশব থেকে বর্তমান পর্যন্ত জীবনের স্মৃতিগুলো মুহূর্তে ঝলসে উঠেছে। অনেকে বলেন, তারা এক দীর্ঘ সুড়ঙ্গের ভেতর দিয়ে এগোচ্ছিলেন, সামনে ছিল অদ্ভুত শান্তিময় আলো। সেই আলোতে ভয় ছিল না, ছিল এক গভীর টান। এমনকি কেউ কেউ এমন আনন্দের কথা বলেছেন, যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।
কিন্তু সবার গল্প এমন নয়। কেউ দেখেছেন ভীষণ অন্ধকার। কেউ শুনেছেন চিৎকার, অনুভব করেছেন বন্দিত্ব। কেউ বলেছেন, তারা যেন এক অনন্ত শূন্যতায় আটকে ছিলেন, যেখানে কিছুই নেই, শুধু নিঃসঙ্গতা। অনেকের কাছে এই অভিজ্ঞতা এতটাই তীব্র ছিল যে ফিরে এসে দীর্ঘদিন মানসিক কষ্টে ভুগেছেন।
বিজ্ঞানীরা এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি। তবে অনেক স্নায়ুবিজ্ঞানীর ধারণা, যখন শরীর ভয়াবহ সংকটে পড়ে, যেমন হৃদ্যন্ত্র বন্ধ হয়ে যাওয়া, মস্তিষ্কে অক্সিজেন কমে যাওয়া, বড় দুর্ঘটনা, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ—তখন মস্তিষ্কে অস্বাভাবিক তৎপরতা শুরু হয়। নানা ইন্দ্রিয়ের সংকেত এলোমেলোভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে। তখন বাস্তব আর মায়ার সীমারেখা ভেঙে গিয়ে মানুষ তীব্র দৃশ্য, শব্দ, অনুভূতি কিংবা শরীরের বাইরে থাকার অভিজ্ঞতা পেতে পারে।
গবেষকেরা মনে করেন, মস্তিষ্কের একটি অংশ—যা দেখা, শোনা ও শরীরের অনুভূতি একত্র করে বড় ভূমিকা রাখে। সেই অংশে অস্বাভাবিকতা তৈরি হলে মানুষ নিজেকে শরীরের বাহিরে ভাবতে পারে। তাই অনেক বিজ্ঞানীর মতে, এটি পরকাল নয়, বরং বিপর্যস্ত মস্তিষ্কের শেষ প্রতিক্রিয়া।
তবে সবচেয়ে আশ্চর্যের জায়গা অন্য জায়গায়। এই অভিজ্ঞতা মানুষকে বদলে দেয়। যারা ফিরে আসেন, তাদের অনেকেই বলেন, মৃত্যুকে আর আগের মতো ভয় লাগে না। অর্থ জমিয়ে রাখার লোভ কমে যায়। পরিবার, ভালোবাসা, সম্পর্ক, সহমর্মিতা এসবের মূল্য বেড়ে যায়। অনেকে অন্যের উপকারে জীবন দিতে চান। কেউ ধর্মের দিকে ঝোঁকেন, কেউ আধ্যাত্মিক হয়ে ওঠেন, কেউ শুধু বলেন, জীবন খুব ছোট, তাই এখন সত্যিকারের বাঁচতে হবে।
সব পরিবর্তন অবশ্য সুখের নয়। কারও মধ্যে গভীর মানসিক ধাক্কা থাকে। কেউ অনুভব করেন, আগের জীবনে আর মানিয়ে নিতে পারছেন না। দাম্পত্য সম্পর্কেও টানাপোড়েন দেখা যায়, কারণ মৃত্যুর মুখ দেখে ফেরা মানুষটির দৃষ্টিভঙ্গি অনেক সময় সম্পূর্ণ বদলে যায়।
আরও বিস্ময়কর তথ্য হলো, সত্যিকারের মৃত্যুর মুখে না পড়েও কেউ কেউ এমন অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। দীর্ঘদিনের গভীর ধ্যানচর্চাকারী কিছু বৌদ্ধ সন্ন্যাসী দাবি করেছেন, ধ্যানের মধ্যে তারা শরীরহীন অনুভূতি, আলো, শূন্যতা ও অপার শান্তি পেয়েছেন। তবে তারা ছিলেন বহু বছরের কঠোর সাধনায় অভ্যস্ত মানুষ। সাধারণ মানুষের জন্য তা সহজ নয়।
নিয়ার-ডেথ অভিজ্ঞতা তাই এখনো বিজ্ঞানের অন্যতম রহস্য। এটি কী মৃত্যুর ওপারের দরজা একটু খুলে দেখা, নাকি নিভে যাওয়ার আগে মস্তিষ্কের শেষ আলোকঝলক সেটি এখনো অজানা। কিন্তু যারা এই পথ ছুঁয়ে ফিরে এসেছেন, তাদের গল্প একটাই কথা বলে, মৃত্যুর ছায়া খুব কাছে এলে মানুষ প্রথমবার সত্যিকারের জীবনের মূল্য বুঝতে শেখে।
সূত্র: বিবিসি সায়েন্স ফোকাস



