মৃত স্বামীকে ‘যেভাবে ফিরিয়ে আনলেন’ এক মার্কিন নারী

হলোগ্রাফিক প্রযুক্তিতে স্বরণসভায় স্বামীকে ফিরিয়ে আনেন পাম ক্রনরাথ। ছবি: জর্জ জনসন
যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনের বাসিন্দা ৭৮ বছর বয়সী পাম ক্রনরাথের জীবনে গত বছর নেমে আসে গভীর শোক। প্রায় ৬০ বছরের দাম্পত্য জীবনের সঙ্গী বিল ক্রনরাথের মৃত্যুর পর তিনি একটি প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে চেয়েছিলেন— স্বামীর জন্য একটি ‘সুপার ওয়েক (বড় স্মরণসভা)’ আয়োজন করবেন। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি তাকে নিয়ে গেল এক অপ্রত্যাশিত জগতে; হলোগ্রাম প্রযুক্তির জগতে।
পাম নিজেকে প্রযুক্তিপ্রেমী বলে পরিচয় দেন। ইন্টারনেটের শুরুর যুগ থেকেই তার কর্মজীবন শুরু। কয়েক বছর আগে একটি মেডিকেল কনফারেন্সে তিনি প্রথমবার লাইভ হলোগ্রাম প্রযুক্তি দেখেন— একজন ডাক্তারকে পূর্ণাঙ্গ মানব আকৃতিতে দূর থেকে সম্প্রচার করা হচ্ছিল। সেই অভিজ্ঞতা তার মনে গেঁথে ছিল। স্বামীর মৃত্যুর পর হঠাৎই মনে হলো, এই প্রযুক্তি কি স্মৃতিচারণে ব্যবহার করা যায়?
প্রথমে পাম পরিকল্পনা করেছিলেন, প্রায় দুই হাজার ডলার খরচ করবেন। কিন্তু বাস্তবে প্রকল্পটি এতটাই জটিল হয়ে ওঠে যে খরচ বেড়ে দাঁড়ায় অন্তত ১০ থেকে ১৫ গুণ। তিনি যোগাযোগ করেন এ ধরনের প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান প্রোটো হলোগ্রাম ও হাইপারনেলের সঙ্গে, যারা সাধারণত সেলিব্রিটি পর্যায়ে কাজ করে থাকে। পাম বলেন, ‘যখন শুনলাম তারা মাইকেল জ্যাকসনের এস্টেটের সঙ্গে কাজ করে, তখন ভাবলাম— আমার মতো একজন সাধারণ মানুষের কাজ তারা কীভাবে করবে!’
বিলের মৃত্যুর পর নতুন করে কোনো ভিডিও বা ভয়েস রেকর্ড করা সম্ভব ছিল না।
তাই পাম নিজেই ৬০ বছরের স্মৃতির ভিত্তিতে একটি স্ক্রিপ্ট লিখলেন, যেভাবে তিনি বিশ্বাস করেন, বিল কথা বলতেন। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল কণ্ঠস্বর তৈরি করা। পুরনো রেকর্ডিং ছিল শক্তিশালী, কিন্তু জীবনের শেষদিকে কণ্ঠ দুর্বল হয়ে গিয়েছিল। প্রযুক্তিবিদরা এমন একটি ভারসাম্য তৈরি করার চেষ্টা করেন, যা পরিবারের কাছে স্বাভাবিক মনে হয়।
স্মরণসভায় প্রায় ২০০ জন মানুষ উপস্থিত ছিলেন। কেউই জানতেন না, কী হতে যাচ্ছে।
হঠাৎই বড়পর্দায় কোমর পর্যন্ত জীবন্ত আকারে উপস্থিত হয় বিলের হলোগ্রাম— হাসিমুখে কথা বলতে শুরু করেন, ‘আমি আসলে আজ এখানে ভ্যালহালায় নেই… মজা হবে তো?’ অনেকে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যান। কেউ কেউ বিশ্বাসই করতে পারেননি এটি প্রযুক্তি। হলোগ্রামটি শুধু বক্তৃতা দেয়নি; একটি সাজানো প্রশ্নোত্তর পর্বেও অংশ নেয়, যেখানে বিলের ভাতিজা প্রশ্ন করছিলেন। এমনকি নিজের বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে মজাও করেন। অনেকেই ভেবেছিলেন, এটি লাইভ কথোপকথন।
পামের এক ছেলে শুধু একটি ছোট পার্থক্য খেয়াল করেন, ‘তার কণ্ঠটা একটু আলাদা।’ পামের কাছে সেটিই প্রমাণ; তারা প্রায় নিখুঁতভাবে বিলকে তুলে ধরতে পেরেছেন। তবে পাম স্পষ্ট করে বলেন, এই হলোগ্রাম তার স্বামীকে প্রতিস্থাপন করেনি। ‘এটা পুরনো ছবি বা ভিডিও দেখার মতোই… যখন কষ্ট লাগে, তখন মনে হয় সে এখনো আমার পাশে আছে।’ সাত মাস পরও তিনি সেই ভিডিও দেখেন, বিশেষ করে একটি মুহূর্ত তাকে ছুঁয়ে যায়, যখন হলোগ্রাম বলে— ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি।’
এ ধরনের প্রযুক্তি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগও রয়েছে।
সেন্টার ফর ডেথ অ্যান্ড সোসাইটির সঙ্গে যুক্ত ইলেইন ক্যাসকেট বলেন, এতে শোককে ‘সমস্যা’ হিসেবে দেখানো হতে পারে, যার প্রযুক্তিগত সমাধান দরকার। সেন্টার ফর ডিজিটাল ট্রাস্ট অ্যান্ড সোসাইটির গবেষক জেনিফার ক্রিন্স সতর্ক করে বলেন, এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহারে সম্মতি, নৈতিকতা এবং মানুষের আবেগের দুর্বলতার বিষয় বিবেচনা করা জরুরি।
সব বিতর্কের মাঝেও পামের কাছে বিষয়টি ছিল একেবারেই ব্যক্তিগত।
‘এটি কোনো প্রদর্শনী ছিল না। এটি ছিল বিলকে সম্মান জানানো; তার রসবোধ, তার মমতা আর মানুষকে ভালোবাসার ক্ষমতাকে ধরে রাখার চেষ্টা।’ প্রযুক্তি যতই এগিয়ে যাক, এ ঘটনা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে, আমরা কি শুধু কী সম্ভব তা দেখব, নাকি কী সঠিক, সেটিও ভাবব?
সূত্র : বিবিসি



