ইমদাদুল হক মিলনের গল্প
শালিক ছানাটি কাঁদছিল
- বড়দের জন্য অনেক লিখেছেন তিনি। তোমাদের জন্যও কিন্তু কম লেখেননি। বলছি গুরুজন মিলনপাখির কথা। এই যে পড়ো, তার একটি একেবারেই নতুন লেখা। সঙ্গে ছবি এঁকে দিলেন মিষ্টিপাখি রজত

খামারবাড়ির বাংলোটি দোতলা। কাল বিকালে মা-বাবার সঙ্গে এখানে এসেছে রূপম। সকালবেলায় বাবা দাঁড়িয়েছিলেন দোতলার বারান্দায়। চৈত্র মাসের শেষদিক। সকালবেলার রোদে ঝকমক করছে চারদিক। বারান্দায় দাঁড়িয়ে রূপমকে ডাকলেন বাবা। ‘তাড়াতাড়ি এসো রূপম। দেখো কী সুন্দর দৃশ্য!’
মায়ের সঙ্গে বসে গল্প করছিল রূপম। বাবার ডাকে ছুটে গেল। ‘কী হয়েছে, বাবা?’
‘ওই দেখো, আমগাছে গোশালিকের বাসা। বাসায় তিনটি ছানা।’
রূপম পাখি ভালোবাসে। ফুল আর প্রজাপতি ভালোবাসে। গাছপালা, নদী, মাঠ তার খুব প্রিয়। ছেলে প্রকৃতি পছন্দ করে বলে বাবা তৈরি করেছেন এই খামার। সাতশ বিঘার ওপর বহু রকম ফলের বাগান। বিশাল লম্বা লেকে করা হয়েছে মাছের চাষ। ধান চাষ করা হয় অনেক জমিতে। সারা বছরই কোনো না কোনো ফল পাওয়া যাচ্ছে। আমগাছগুলোতে প্রচুর আম ধরেছে এবার। অনেক লোক কাজ করে এই খামারে। ফাঁকা জায়গাগুলোতে শুধুই ফুলের গাছ। হাওয়ায় সবসময়ই ফুলের গন্ধ।
বারান্দার পাশেই বড় একটা আমগাছ। বাবার কথামতো গাছটির দিকে তাকাল রূপম। শক্ত দুখানা ডালার মাঝখানে গোশালিকের বাসাটি দেখতে পেল। বাসার মুখে ঠোঁট বাড়িয়ে আছে তিনটি ছানা। প্রথমে ফিরে এলো মা পাখিটি। তার ঠোঁটে খাবার। ঠিক তার পরপরই এলো বাবা পাখিটি। তার ঠোঁটেও খাবার। ওই দেখে ছানাগুলোর যে কী আনন্দ আর হুড়োহুড়ি! কে কার আগে মা-বাবার ঠোঁট থেকে খাবার নেবে, ওই নিয়ে চিঁ চিঁ করছে। তাদের হাঁ করা মুখে খাবার পুড়ে দিচ্ছে মা-বাবা।
রূপম মুগ্ধ হয়ে এই দৃশ্য দেখতে লাগল।
খানিক পর বেড়াতে বেরোল রূপম। নিজেদের খামারে এলেও তাকে একা কখনো বেশিদূর যেতে দেন না মা-বাবা। তাদের সঙ্গে ঢাকা থেকে আসে কাজের ছেলে রতন। রতন থাকে রূপমের সঙ্গে। কিন্তু রূপম এটা পছন্দ করে না। সে বড় হয়েছে। ক্লাস সেভেনে পড়ে। নিজেদের খামারে একা একা বেড়াবে, তাতে অসুবিধা কী? মা-বাবা এসব বুঝতেই চান না। ঝোপঝাড়ে সাপ থাকতে পারে, এই ভয়।
সাপের ভয় রূপমেরও আছে। এ জন্য বেড়াতে বেরোলে হাতে একটা সরু লাঠি রাখে। রতনের হাতেও ও রকম একটা লাঠি থাকে।
বেলা ১১টা বাজে। রূপম লেকের দিকে যাচ্ছে, পেছন পেছন আছে রতন। লেকের মাছগুলো মানুষের সাড়া পেলেই পাড়ের কাছে চলে আসে। ভাবে, তাদের খাবার দেওয়া হবে। মাছেদের খাবার সকালবেলা দেওয়া হয়; আবার দেওয়া হয় সন্ধ্যাবেলা। তারপরও অবুঝ মাছগুলো এমন করে।
লেকের ধারে বেশিক্ষণ দাঁড়াল না রূপম। আমবাগানের দিকে হাঁটতে লাগল। চৈত্রের রোদ বাঘের মতো। বেশ গরম। রূপম একটু ঘেমেছেও। দেখে রতন বলল, ‘এই রোদে ঘোরাঘুরির দরকার নেই। চলো এখন ফিরি। বিকেলবেলা বেড়াতে এসো। তখন রোদের তাপ কমে যাবে।’
রূপম বিরক্ত হলো। ‘মা-বাবার মতো তুমিও সবসময় একরকম কথা বলবে না। রোদে হাঁটলে কী হয়? আমার তো কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। তোমার হলে তুমি চলে যাও। আমি একা একা বেড়াব।’
রতন আর কথা বলল না। মুখ গোমড়া করে রূপমের পেছন পেছন হাঁটতে লাগল।
আমবাগানের দিকে আসতেই শুকনো পাতায় সর সর করে শব্দ হলো। রূপম থমকে দাঁড়াল। হাতের লাঠি বাগিয়ে ধরল। রতনও বাগিয়ে ধরল তার লাঠি। তারপর দুজনেই হেসে ফেলল। একটা মাঝারি সাইজের গোসাপ খাবারের আশায় ঘুরে বেড়াচ্ছিল এদিকে। ওদের সাড়া পেয়েই ছুটে পালিয়েছে।
তখনই ঘটল আরেক কাণ্ড। দুটো গোশালিক ছটফট করতে করতে উড়ে এলো সেই আমগাছ থেকে। রূপমদের মাথার ওপর দিয়ে চক্কর খেতে খেতে চিৎকার করতে লাগল। পাখি দুটো এমন করছে কেন, বুঝতে পারল না রূপম। অবাক হয়ে রতনের দিকে তাকাল। রতনও বুঝতে পারছে না কিছু। তাদের দেখেই কি এমন করছে পাখি দুটো?
ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করল রূপম। তীক্ষন চোখে পাখি দুটোর দিকে তাকিয়ে রইল। দুটো পাখিই ডাকতে ডাকতে ছুটে যাচ্ছে আমগাছটির দিকে, আবার ফিরে আসছে রূপমদের কাছে। যেন রূপমকে কিছু বলতে চায়।
রতনের দিকে তাকিয়ে রূপম বলল, ‘পাখি দুটোর মনে হয় কোনো বিপদ হয়েছে। চলো তো দেখি।’
ওরা ছুটে এলো আমগাছটির তলায়। যা ভেবেছে তা-ই। আমতলায় জমে আছে প্রচুর শুকনো পাতা। সেখানে পড়ে আছে একটি শালিক ছানা। হাছড়পাছড় করছে আর চিঁচিঁ করে ডাকছে। কাঁদছে আসলে। বাসা থেকে মুখ বাড়িয়ে অন্য ছানা দুটোও চিঁচিঁ করছে। একজন পড়ে গেছে দেখে কাঁদছে অন্যরাও। মা-বাবা পাখি দুটো তখনো আগের মতো চিৎকার করছে। রূপমদের মাথার ওপর দিয়ে উড়ছে। আবার কখনো গিয়ে বসছে বাসার সামনে।
রূপম দিশেহারা হলো। কী করা যায় এখন? ছানাটিকে অবশ্যই বাঁচাতে হবে। তুলে দিতে হবে বাসায়।
কিন্তু কীভাবে?
এ সময় মা-বাবা পাখি দুটো একটু যেন বেশিই চঞ্চল হলো। সমানে উড়তে লাগল রূপমদের মাথার ওপর দিয়ে। চিৎকার-চেঁচামেচি আরও বেড়ে গেল। কারণটা তারপরই বুঝে গেল রূপম। পেছনে তাকিয়ে দেখে, গোসাপটা পা টিপে টিপে এদিকেই এগোচ্ছে। তার মানে সুযোগ পেলেই শালিক ছানাটি
মুখে নিয়ে উধাও হয়ে যাবে। দুজনের দুরকম বিপদ। একজনের খাদ্যের, আরেকজনের বাঁচার।
লাঠির শব্দ করে গোসাপ তাড়াল রূপম। রতনকে জিজ্ঞেস করল, ‘গাছে চড়তে পারো?’
রতন হেসে বলল, ‘খুব ভালো পারি।’
‘শালিক ছানাটি বাসায় তুলে দিতে পারবে?’
‘অবশ্যই পারব।’
‘তা হলে তাই করো।’
এক হাতের তালুতে ছানাটি নিল রতন। অন্য হাত দিয়ে আমগাছের এডাল-ওডাল ধরে তরতর করে উঠে গেল শালিক পাখির বাসার কাছে। মা-বাবা পাখি তখনো আগের মতো ওড়াউড়ি করছে। আগের মতোই ডাকাডাকি করছে। রতনের হাতের তালুতে ছানাটিও চিঁচিঁ করছে। বাসায় থাকা অন্য ছানা দুটিরও একই অবস্থা। রূপম তাকিয়ে আছে রতনের দিকে। বুক ঢিবঢিব করছে। পা পিছলে পড়ে যায় কি না রতন! অথবা ডালা ধরতে গিয়ে ফসকে যায় কি না হাত! তা হলে তো সর্বনাশ!
সেসবের কিছুই হলো না। রতন ঠিকই ছানাটি তুলে দিল বাসায়। তিনটি ছানা জড়াজড়ি করে এমন অবস্থা করল তখন, যেন আনন্দের সীমা নেই তাদের। মা-বাবা পাখি দুটোও শান্ত হয়েছে। ঠোঁট ঘষে ছানাদের আদর করতে লাগল। রতন গাছ থেকে নেমে এলো। ছানাটি বাসায় তুলে দিতে পেরে সে খুব খুশি। রূপমের সঙ্গে আমতলায় দাঁড়িয়ে মুগ্ধ চোখে শালিক পাখির বাসার দিকে তাকিয়ে রইল।






