মাইশেলফ রসু খাঁ
- হাই, হ্যালো... এরপর কথা শুরু। দুয়েক দিন দেখার পরেই প্রেমের সম্পর্ক। সম্পর্ক একটু গভীর হলে নিজের পরিচিত স্থানে নিয়ে ধর্ষণ ও শ্বাসরোধে হত্যা। ভয়ংকর এক সিরিয়াল কিলার রসু খাঁর গল্প শুনিয়েছেন সাইফুল ইসলাম

পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়ে গিয়েছিল যে, চাঁদপুরের নির্দিষ্ট কিছু এলাকার মানুষ সন্ধ্যার পর মেয়েদের একা বাইরে বের করে দেওয়া বন্ধ করে দিল। নদীর ঘাট, কাঁচা রাস্তা, বাজারের অন্ধকার গলি— সব জায়গায় ছড়িয়ে ছিল এক অদৃশ্য ভয়। এর পেছনে ছিল একজন মানুষ, রসু খাঁ। একসময় ছিঁচকে চোর হিসেবে পরিচিত এ মানুষটি হয়ে উঠেছিলেন নৃশংস খুনি। হঠাৎ নিখোঁজ তরুণীদের লাশ মিলত নদীর পাড়ে, ঝোপের ভেতর কিংবা নির্জন মাঠে। বেশিরভাগের হাত-পা বাঁধা, শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন।
২০০৮ সালের ডিসেম্বরের এক সকালে ডাকাতিয়া নদীর তীরে ভিড় জমেছিল। নদীর কাদামাটির পাশে পড়ে ছিল ১৯ বছরের এক তরুণীর মরদেহ। খুলনা থেকে আসা গার্মেন্টস শ্রমিক। পরিবারের লোকজন ভেবেছিলেন মেয়েটি প্রেম করে বিয়ে করার জন্য পালিয়েছে। কিন্তু সেই প্রেমই তাকে টেনে এনেছিল মৃত্যুর দিকে। পুলিশ তখনো বুঝতে পারেনি, এটি কোনো একক হত্যাকাণ্ড নয়; বরং আরও বড়, আরও অন্ধকার এক গল্পের দরজা খুলতে যাচ্ছে।
গল্পটা বাংলাদেশের কুখ্যাত সিরিয়াল কিলার রসু খাঁর। যিনি প্রেমিকার বন্ধুর হাতে মারধরের শিকারের পর ১০১ নারীকে ধর্ষণ ও হত্যার টার্গেট নিয়েছিলেন। এটা কোনো নাটক, সিনেমা বা গল্প নয়। ২০০৯ সালের ৭ অক্টোবর গ্রেপ্তার হওয়া রসু খাঁর নিজের স্বীকারোক্তি। দুর্ধর্ষ এ খুনির সিরিয়াল কিলিংয়ের গল্প জানতে তার অতীতে ঢুঁ মারা যাক।
সাভার ও টঙ্গী থেকে প্রেমের অভিনয় করে নানাভাবে নিম্নবিত্ত নারীদের চাঁদপুরসহ বিভিন্ন পরিচিত স্থানে নিয়ে যেতেন রসু। এরপর প্রায় সবাইকেই ধর্ষণের পর হত্যা করেন
রশিদ খাঁ ওরফে রসু খাঁর জন্ম চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ থানার মদনা গ্রামে। বাবা ক্ষেতমজুর আবুল হোসেন ওরফে মনু খাঁ। তার মৃত্যুর পর একরকম অভিভাবকহীন হয়ে পড়েন রসু। এ সময় ছোটখাটো চুরির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। ভবঘুরের বেশে টঙ্গী আসেন। এর মধ্যে বিয়েও করেন। ঘটক পাত্রী দেখতে না দেওয়ায় বিয়ের পর জানতে পারেন তার স্ত্রীর একটি চোখ নষ্ট। ক্ষুব্ধ বছর দুয়েক পর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে শ্বশুরবাড়ি রেখে শ্যালিকা রিনা বেগমকে বিয়ে করে টঙ্গী নিয়ে আসেন। রিনা গার্মেন্টসে কাজ নেন। এদিকে রসু চুরিসহ নানা ছোটখাটো অপরাধ চালিয়ে যান।
স্ত্রী গার্মেন্টেসে কাজ নেওয়ায় রসুর সঙ্গে সেখানে কাজ করা অনেক নারীর পরিচয় হয়। যাদের একজনের সঙ্গে প্রেমও হয়। একপর্যায়ে মেয়েটি তাকে রেখে অন্য একজনের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ালে ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে হুমকি দেন। তখন ওই মেয়ের প্রেমিকসহ কয়েকজন রসুকে বেদম পেটায়। সেই অপমান থেকেই তার মনে জন্ম নেয় ভয়ংকর প্রতিশোধস্পৃহা। সেদিনই রসু খাঁ প্রতিজ্ঞা নেন, ১০১ নারীকে ধর্ষণ ও হত্যা করার।
সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার ছিল, রসুর চেহারা বা আচরণে কোনো আতঙ্কের ছাপ ছিল না। যারা তাকে চিনতেন, তারা বলতেন— তিনি সহজভাবে কথা বলতেন, হাসতেন, আড্ডা দিতেন। যেন একেবারে সাধারণ একজন মানুষ। এ স্বাভাবিক মুখোশই তাকে আরও ভয়ংকর করে তুলেছিল। সিরিয়াল কিলারদের অনেকেই এমন, ভিড়ের মধ্যে থেকেও আলাদা করে চেনা যায় না।
যেভাবে খুন করতেন রসু
সাভার ও টঙ্গী থেকে প্রেমের অভিনয় করে নানাভাবে নিম্নবিত্ত নারীদের চাঁদপুরসহ বিভিন্ন পরিচিত স্থানে নিয়ে যেতেন রসু। এরপর প্রায় সবাইকেই ধর্ষণের পর হত্যা করেন। তার নৃশংসতার শিকার প্রায় সবাই ছিল ১৫ থেকে ৩৫ বছরের গার্মেন্টস শ্রমিক।
রসু খাঁর ১১ শিকারের অন্যতম একজন খুলনার দৌলতপুরের সজলা গ্রামের সাহিদা বেগম। ২০০৮ সালে গার্মেন্টস শ্রমিক সাহিদাকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে চাঁদপুরে নিয়ে এসে ধর্ষণের পর খুন করে লাশ ফেলে পালিয়ে যান রসু। এরপর ২০০৯ সালের ৭ জুলাই গাজীপুর থেকে তিন সন্তানের জননী পারভীন আক্তারকে ফরিদগঞ্জের হাঁসা গ্রামে নিয়ে যান। তারপর ভাগ্নে জহির ও সঙ্গী ইউনুসসহ নির্যাতনের পর মুখে কাপড় গুঁজে হাত-পা বেঁধে গলা টিপে হত্যা করে পাশের খালে ফেলে দেন। এর আগে ২০০৭ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি ফরিদগঞ্জের গোবিন্দপুর ইউনিয়নের হাঁসা গ্রামে সঙ্গী ইউনুস ও শাহীনকে নিয়ে এক নারীকে ধর্ষণ ও হত্যা করেন। একই বছর বন্ধু মানিকের স্ত্রীর প্ররোচনায় অন্য একজন নারীকে একই গ্রামে নির্যাতন শেষে হত্যা করে ডোবায় ফেলে দেন।
রসুর শিকার হিসেবে তার শ্যালকের স্ত্রীর কথাও শোনা যায়। এ ছাড়া ২০০৭ সালের ১৯ জুন ফরিদগঞ্জের ৯ নম্বর ইউনিয়নের ভাটিয়া গ্রামে নদীর পাড়ে নিয়ে এক নারীকে ধর্ষণ শেষে শ্বাসরোধে হত্যা করে পানিতে ফেলে দেন।
১১ জন নারীকে প্রেমের অভিনয় ও বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ ও হত্যার স্বীকারোক্তি দেন রসু খাঁ। এর মধ্যে ফরিদগঞ্জে ছয়টি, চাঁদপুর সদরে চারটি ও হাইমচরে একটি।
যেভাবে গ্রেপ্তার
অদ্ভুতভাবে, এতগুলো হত্যার পরও রসু ফাঁসেন খুনের মামলায় নয়, গাজীপুরে স্থানীয় এক মসজিদের সিলিং ফ্যান চুরি করতে গিয়ে। তখন স্থানীয় একজন তার মোবাইল ফোন ও সিম রেখে দেন। রসু ওই চুরির মামলায় দুই-তিন মাস জেল খাটেন। তখন রসুর মোবাইল ও সিম ব্যবহার করতে থাকেন স্থানীয় ওই যুবক। সেই সিমের খোঁজ পান পারভীন হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মীর কাশেম। ওই নাম্বারে ফোন দিয়ে কথা বলেন ও ধীরে ধীরে জানতে পারেন সিমের আসল মালিক সম্পর্কে।
পুলিশ সোর্সের খবরে ২০০৯ সালের ৭ অক্টোবর টঙ্গীর বাসা থেকে রসুকে গ্রেপ্তার করা হয়। ফরিদগঞ্জ থানায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে ১১ হত্যাকাণ্ডের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দেন তিনি। এগুলো তিনটি থানার ১০টি অজ্ঞাতপরিচয় লাশের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। ওই সময়ে পুলিশ বলেছিল, রসুর খুনের পদ্ধতি প্রায় একইরকম ছিল। শ্বাসরোধ করে পানিতে লাশ ফেলে দেওয়া হতো। প্রায় প্রতিটি শিকারের শরীরে কামড়ের দাগ এবং ছুরি দিয়ে বুকে ও গোপনাঙ্গে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়।
রসু এখন কোথায়
১৮ বছর আগে ‘সিরিয়াল কিলার’ হিসেবে আলোচনায় আসা রসুকে ২০১৮ সালে পারভীন হত্যা মামলায় চাঁদপুরের আদালতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ২০২৪ সালে হাইকোর্ট রসু খাঁর মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল রাখেন। ওই মামলায় মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত অন্য দুই আসামির সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তারা রসু খাঁর ভাগ্নে জহিরুল ইসলাম ও সহযোগী মো. ইউনুছ।
তবে ফাঁসির সেই আদেশ এখনো কার্যকর হয়নি। রসু খাঁ এখন গাজীপুরের কাশিমপুর হাই-সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের সেলে আছেন। তার সর্বশেষ অবস্থা জানতে চাইলে গাজীপুরের কাশিমপুরের হাই-সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার আবদুল্লাহ আল মামুন আগামীর সময়কে জানান, ফাঁসির আদেশ পাওয়া রসু খাঁকে (৫২) কিছুদিন আগে কুমিল্লার কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে কাশিমপুর হাই-সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। তিনি ফাঁসির আসামিদের সেলে আছেন। তবে কোনো স্বজন এ কারাগারে এখনো দেখতে আসেননি রসু খাঁকে।




