পাঠকের ভয়
সুন্দরবনের রহস্যময় নারী
- সুন্দরবনের গহিনে পরিত্যক্ত গ্রাম। সেখানে বেদির মতো জায়গাটা কীসের ইঙ্গিত দিচ্ছে? রহস্যময় ওই নারীর পরিচয়ই বা কী? লিখেছেন সোহানুর রহমান

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
করোনার পরের বছর। মন থেকে সে দুঃসহ স্মৃতি মুছে ফেলতে কয়েকজন মিলে ঘুরতে গিয়েছিলাম সুন্দরবনে। আমরা মোংলায় পৌঁছাই তখন বিকালের শেষ আলো ফুরিয়ে আসছে। নদীর ঘাটে তখন কাদার গন্ধ, ভাটার স্রোত আর দূরের কালচে বন এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা তৈরি করেছে।
আমাদের অপেক্ষায় ছিল একটি ছোট ট্রলার। যে রিসোর্টে উঠব, সেটি সুন্দরবনের বেশ গভীরে। তখনকার হাতেগোনা কয়েকটি রিসোর্টের মধ্যে সবচেয়ে ভেতরের দিকে। ট্রলার ছাড়তেই অন্যরা গল্প-আড্ডায় মেতে উঠল। আমি গিয়ে বসলাম মাঝির পাশে। স্থানীয় মানুষ। রোদে পোড়া মুখ। কিন্তু প্রথমেই যেটা চোখে পড়ল, তার একটি চোখ নেই।
কথা বলতে বলতে কৌতূহল চেপে রাখতে পারলাম না। জিজ্ঞাসা করলাম, ‘চোখটা কীভাবে গেল?’ লোকটা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। নদীর কালো পানির দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর ধীরে ধীরে বলল, ‘এই চোখ সুন্দরবন নিয়েছে।’
শুরুতে একটু দ্বিধা করলেও চাপাচাপি করতেই খুলে বলল ঘটনাটা। সেটা আজও মনে পড়লে বুকের ভেতরটা ঠান্ডা হয়ে যায়।
লোকটা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। নদীর কালো পানির দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর বলল, ‘এই চোখ সুন্দরবন নিয়েছে।’
তখন সে একেবারে তরুণ। সুন্দরবন থেকে গোলপাতা কেটে এনে বিক্রি করত। তবে সেটা ফরেস্টের লোকদের না জানিয়ে, লুকিয়ে। একপর্যায়ে দেখা গেল এ ধরনের বাওয়ালির সংখ্যা এত বেড়ে গেছে, গোলপাতার খোঁজে বনের গহিনে চলে যেতে হতো। তখন হয়তো আশপাশে আর কেউ থাকতও না।
একদিন সে একাই রওনা দেয়। ভেবেছিল বিকালের আগেই ফিরে আসবে। ওই সময় বন ছিল এখনকার তুলনায় আরও গভীর। এত ঘন গাছ, এত জট পাকানো ডালপালা যে, দিনেই অনেকটা অন্ধকার হয়ে গিয়েছে পরিবেশ। চারদিকে শুধু কাদার গন্ধ, নোনা বাতাস আর অদ্ভুত চাপা অন্ধকার।
বনের বেশ গভীরে সে খুঁজে পেল বিশাল গোলপাতার ঝাড়। মানুষের পা পড়ে না বলেই হয়তো সেগুলো এত ঘন ছিল। একমনে গাছ কাটতে লাগল সে। হঠাৎ খেয়াল করল, চারপাশে কেমন অস্বাভাবিক শব্দ হচ্ছে। শসশস করে গাছের মাথা কাঁপছে। ওপরে তাকিয়ে দেখল, পাতার ফাঁক দিয়ে আকাশ কালো হয়ে এসেছে। দুপুরবেলা, অথচ মনে হচ্ছে সন্ধ্যা নেমে গেছে। তারপর শুরু হলো প্রবল ঝড়।
সুন্দরবনের ঝড় অন্যরকম। সে একটা গাছ আঁকড়ে দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু বাতাস এত জোরে বইছিল যে, মনে হচ্ছিল গাছটাই ভেঙে যাবে। একটু সামনে আরেকটা মোটা গাছ দেখে দৌড় দিল। কিন্তু ঠিক মাঝপথে একটা বিশাল ডাল ভেঙে সোজা তার মাথায় পড়ল। তারপর আর কিছু মনে নেই। জ্ঞান ফিরল ঝিঁঝি পোকার শব্দে। চারপাশ অন্ধকার। ঝড় থেমে গেছে। কিন্তু সেই নিস্তব্ধতা আরও ভয়ংকর। দূরে কোথাও থেকে একটা ডাক শুনে শরীর শিরশির করে উঠল। সারা অঙ্গে মশার কামড়। মাথায় প্রচণ্ড যন্ত্রণা।
কিছুক্ষণ পর টের পেল, কাদামাখা শরীর নিয়ে একটা গাছের নিচে পড়ে আছে। উঠে প্রথমেই নৌকাটা খুঁজল। কাছেই ছিল। ভাটার কারণে পানি নেমে গেছে, নৌকার অর্ধেক কাদায় দেবে আছে। কষ্ট করে নৌকাটা টেনে তুলল। তারপর বৈঠা ধরল। তখন কত রাত, তার ধারণা নেই। চারপাশে শুধু কালো পানি আর বন। যতদূর চোখ যায় কোনো আলো নেই। শুধু বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ শব্দ। এদিকে মাথার যন্ত্রণা তখন অসহ্য হয়ে উঠেছে। তার মনে হচ্ছিল, যদি কোথাও কোনো গ্রাম পাওয়া যেত! একটু গরম চা, একটু বিশ্রাম।
ঠিক তখনই তার মনে হলো, ডান পাশে, সমুদ্রঘেঁষা বনের দিকে কয়েকজন মানুষ অন্ধকারে হাঁটছে। দূর থেকে অস্পষ্ট ছায়ার মতো লাগছিল। তার মনে পড়ল, সে শুনেছে বনের গভীরে নাকি ছোট ছোট লোকালয় আছে। পুরনো জেলেপাড়া, মৌয়ালদের বসতি। সে নৌকা ঘুরিয়ে সেদিকে গেল। কিন্তু কাছে পৌঁছে দেখল, মানুষগুলো নেই। যেন অন্ধকার গিলে ফেলেছে।
ঠিক তখনই তার মনে হলো, ডান পাশে, সমুদ্রঘেঁষা বনের দিকে কয়েকজন মানুষ অন্ধকারে হাঁটছে
নৌকা থেকে নেমে একটু এগোতেই দেখল গোলপাতা দিয়ে তৈরি ঘর। বেশ কয়েকটি। একটা পুরো গ্রাম। অথচ কোথাও কোনো শব্দ নেই। না মানুষের কথা, না শিশুর কান্না, না কুকুরের ডাক। পুরো গ্রামটা মৃত। সে হাঁটতে হাঁটতে ভেতরে চলে গেল। তারপর হঠাৎ চোখে পড়ল গ্রামের মাঝখানে একটা বেদির মতো জায়গা। যেন বলি দেওয়ার স্থান। আর সেখানে তখনো টাটকা রক্ত ঝরছে। মনে হচ্ছিল, কিছুক্ষণ আগেই এখানে কিছু একটা কাটা হয়েছে।
তার বুকের ভেতর হিম নেমে এলো। দৌড়ে ফিরে আসতে লাগল নৌকার দিকে। কিন্তু বারবার মনে হচ্ছিল কেউ তাকে দেখছে। অন্ধকারের ভেতর থেকে। নৌকার কাছে এসে সে থমকে দাঁড়াল। কাদার ওপর তার নিজের গ্রামের দিকে যাওয়ার পায়ের ছাপ ছাড়া আরও একজোড়া ছাপ। আর সেই ছাপ সোজা চলে গেছে নৌকার দিকে।
ভয় চেপে সে দ্রুত নৌকায় উঠল। ঠিক তখনই অন্ধকারের ভেতর থেকে ভেসে এলো নারীকণ্ঠ, ‘আমাকে নিয়ে যাও...।’
সে তাকিয়ে দেখল, অন্ধকারের মধ্যে একটা নারীমূর্তি দাঁড়িয়ে। মাথায় ঘোমটা। শরীরে গয়নাগাঁটির মতো কিছু ঝিলমিল করছে। চেহারা বোঝা যায় না। আর একমুহূর্ত দেরি করেনি। নৌকা ঠেলে দ্রুত সরে যেতে লাগল।
পেছন থেকে আবার সেই কণ্ঠ, ‘আমাকে নিয়ে যাও...’
তারপর শুধু বৈঠার শব্দ। আর ভয়। অনেকক্ষণ চালিয়েও সে কোনো লোকালয় পেল না। মনে হচ্ছিল বন তাকে গিলে ফেলেছে। সে স্থানীয়দের গোপন সংকেতের ডাকও দিল। যেটা মৌয়াল আর বনজীবীরা বিপদে একে অন্যকে জানাতে ব্যবহার করে। কোনো উত্তর এলো না। একসময় সে টের পেল, নৌকাটা অদ্ভুতভাবে ধীরে চলছে। ঠিক তখনই ছইয়ের ভেতর থেকে খসখস শব্দ। যেন কেউ নড়ছে। ভয়ে জমে গেলেও সাহস করে ছইয়ের পর্দা সরাল সে। ভেতরে কিছু নেই।
কিন্তু ফিরে এসে বসতেই মনে হলো, নরম কিছুর ওপর বসেছে। পেছনে হাত দিতেই তার বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল। দুটো হাত। বরফশীতল দুটো হাত নৌকার পেছন ধরে আছে পানির নিচ থেকে। ওই হাতের ওপর বসেছে সে। ঘুরে তাকাল।
কালো পানির মধ্যে একটা মুখ ভেসে আছে। শুধু চোখ আর নাক দেখা যায়। বাকি শরীর ডুবে। আর সেই চোখ দুটো তার দিকে তাকিয়ে আছে। নৌকা আটকে ধরে আছে সেই নারী।
ভয়ে সে পাগলের মতো বৈঠা মেরে নৌকা ঘোরাল। তারপর যত দ্রুত সম্ভব তীরে নিয়ে ভেড়াল। এবার আর কিছু না ভেবে নৌকা থেকে পাড়ে নেমে রুদ্ধশ্বাসে ছুটল। তার মনে হচ্ছিল, পেছন থেকে কেউ দৌড়ে আসছে। খুব দ্রুত। সে বুঝতে পারছে ব্যবধান কমছে। তারপর সে অনুভব করল, পিঠে বসে যাচ্ছে ধারালো নখ। একটার পর একটা খামচি। যেন চামড়া তুলে নেওয়া হচ্ছে।
চিৎকার করতে করতে সে দৌড়াতে লাগল। অন্ধকারে একটা ছোট গাছের ওপর গিয়ে পড়ল। তখনই একটা ডাল সোজা তার চোখে ঢুকে যায়। তারপর অন্ধকার। কয়েক দিন পর তার জ্ঞান ফেরে। স্থানীয়রা বনে কাজ করতে এসে তাকে অজ্ঞান অবস্থায় পেয়ে উদ্ধার করে।
একটা চোখ চিরতরে নষ্ট হয়ে গেছে তার। পিঠ জুড়ে গভীর আঁচড়ের দাগ। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, সেগুলো বাঘ বা অন্য কোনো প্রাণীর থাবার দাগের মতো ছিল না। স্থানীয়রা কেউ সেই দাগ চিনতে পারেনি।
লোকটা গল্প শেষ করে নদীর দিকে তাকিয়ে রইল। ট্রলারের ইঞ্জিন তখন অন্ধকার নদী কাঁপিয়ে এগিয়ে চলছে। দূরে সুন্দরবনের গাছগুলোকে মনে হচ্ছিল বিশাল কালো দেয়াল।
আমি শুধু তার ফাঁকা চোখটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। মনে হচ্ছিল, সুন্দরবন সত্যিই কিছু নিয়েছে তার কাছ থেকে। হয়তো এখনো সেই নারী জঙ্গলের অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে। কারও নৌকা থামার অপেক্ষায়, যে তাকে সঙ্গে নিয়ে যাবে।




