প্রাণ ও প্রকৃতি
কাঠময়ূরের খোঁজে

বাংলাদেশের অরণ্যে কাঠময়ূরের দেখা পাওয়া ভার। তবে বছরের পর বছর মোহনীয় এই পাখির পিছু লেগে থেকে একে দারুণভাবে ক্যামেরায় বন্দি করেছেন জহির মাহমুদ সোহাগ
যতদূর মনে পড়ে, ২০১৯ সালের ২৬ মার্চ থেকে অফিস-বাসা সামলে সময় বের করে নিয়মিত অরণ্যটিতে যাতায়াত শুরু করি। অবশ্য বন-বাদাড়, ঝিরি-ঝর্ণায় ঘুরে বেড়ানোর নেশা আমার কৈশোর থেকেই। সেই দুর্নিবার টানই হয়তো আমার মতো একজন এমেচার বার্ডওয়াচার আর আলোকচিত্রীকে বারবার টেনে নিয়ে গেছে এই জঙ্গলে। জায়গাটা ভ্রমণপিয়াসী আর বন্যপ্রাণীপ্রেমীদের খুবই পরিচিত। চট্টগ্রামের বিখ্যাত চিরসবুজ বন, হাজারীখীল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য। ফটিকছড়ির প্রায় ১ হাজার ২০০ হেক্টর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই অরণ্য সীতাকুণ্ড-বারৈয়াঢালা-রামগড়ের বিশাল ফরেস্ট বেল্টেরই অংশ।
আমরা একটু ওপরের দিকে উঠতেই হঠাৎ জঙ্গল কাঁপিয়ে একটা কর্কশ কণ্ঠ— ‘খঁক... খঁক... খঁক...!’
এবার আসি মূল গল্পে। ১৯ এপ্রিল দ্বিতীয়বারের মতো সেখানে যাই। বিশাল জঙ্গলের কোথায় কী আছে, কিছুই জানা নেই। আগেরবারের অভিজ্ঞতা থেকে সহজ আর নিরাপদ পথ ধরেই এগোচ্ছিলাম। তখন ফরেস্টের ভেতরে আশীষ দার দোকানলাগোয়া ট্রেইলটাই সবচেয়ে পরিচিত। যতক্ষণ সাহস পাচ্ছিলাম, ভেতরে ঢুকছি। সঙ্গে ছিল বাবলু নামের এক তরুণ।
আমরা একটু ওপরের দিকে উঠতেই হঠাৎ জঙ্গল কাঁপিয়ে একটা কর্কশ কণ্ঠ—
‘খঁক... খঁক... খঁক...!’
ডাকটা এমন ছিল, যেন লুকিয়ে থাকা কোনো প্রাণী আমাদের দেখে সতর্কবার্তা দিচ্ছে।
আমরা দুজনই ভয়ে বসে পড়লাম। বুকের ভেতর ধুকপুকানি বাড়ছে। তারপরও এদিক-ওদিক তাকাচ্ছি, যদি কিছু দেখা যায়! না, কিছু নেই। শুধু সেই অদ্ভুত ডাকটা ধীরে ধীরে দূরে সরে গেল জঙ্গলের গভীরে।
ফিরতি পথে দেখা হলো স্থানীয় এক লোকের সঙ্গে। পরে জেনেছিলাম, তার নাম কুম্ভরাম।
আমরা হাঁপাতে হাঁপাতে ঘটনাটা বলতেই তিনি হেসে লোকাল টানে বললেন,
—তোঁয়ারা ডরাইয়ু না হনো?
তারপর দুই হাত ছড়িয়ে দেখালেন,
—এই পইখ ইবা এথ’র!
মানে, পাখিটা এত বড়!
কিন্তু নাম বলতে পারলেন না।
পরে চিটাগং বার্ড ক্লাব (CBC)-এর আহসান উদ্দীন চৌধুরী ভাইয়ের থেকে পাখিটার নাম জানি— কাঠময়ূর।
সেদিন থেকেই শুরু হলো আমার দীর্ঘ জঙ্গলযাত্রা।
২০২০ সালে কোভিডের আগ পর্যন্ত অন্তত ১৪-১৫ বার গেছি হাজারীখীলে। প্যান্ডেমিকের পর আবার যাওয়া শুরু করি। ২০২১ আর ২০২২ সালের নভেম্বর পর্যন্ত কম করে হলেও ৩০-৩৫ বার গেছি সেখানে। একটাই লোভ, একবার চোখে দেখব তাকে। একটা ছবি তুলব।
প্রায়ই জঙ্গলের গভীর অন্ধকার থেকে তার সেই ট্রেডমার্ক ডাক শুনতাম। তারপর এলো, ২০২২ সালের ৪ নভেম্বর।
সেদিন প্রথম তাকে দেখি। তাও প্রায় ১০০ হাত দূর থেকে।
ঝোপের আড়ালের অন্ধকার পথে দাঁড়িয়ে থাকা সেই পাখিটাকে তখন আমার কাছে নক্ষত্রের মতো লাগছিল।
শেষ পর্যন্ত যা তুললাম, সেগুলো ফ্রেমিং, এক্সপোজার, ফোকাস কোনো বিচারেই ‘ছবি’ না।
তারপর ২০২৩ সালের মার্চে কয়েকবার ছবি তুলতে সক্ষম হই। আগের চেয়ে ভালো হয়েছিল। কিন্তু মন তো আর তাতে ভরে না! অবশেষে ২০২৪ সালের অক্টোবরে সে যেন সত্যিই আমাকে ধন্য করল।
ভ্যাপসা, বিরক্তিকর এক দুপুর। আমি খেজুর আর বাদাম খেতে খেতে সময় কাটাচ্ছি। হঠাৎ ঝোপের আড়াল থেকে শুকনো পাতার ওপর ‘খচ... খচ...’ শব্দ।
মুহূর্তেই শরীর টানটান হয়ে গেল।
পরের মুহূর্তেই সবুজ ঘাসের ওপর ভেসে উঠল পান্নাখচিত দীর্ঘ এক লেজ।
আমি বুঝে গেলাম— সে এসেছে।
কোলের ওপর রাখা ক্যামেরা হাতে তুলে নিলাম। তিনি তখন আমার সামনে দিয়ে ১২-১৫ গজ দূরত্বে রাজকীয় ভঙ্গিতে হেঁটে যাচ্ছেন। শাটারের শব্দে একটু সতর্ক হচ্ছিলেন বটে; কিন্তু মনে হলো, আমাকে ঠিক দেখছেন না।
আমি যেন পাঁচ বছরের অপেক্ষা মিটিয়ে দেখছি এক বনপরীকে। আহ... কী অপার্থিব সৌন্দর্য!




