ব্রাজিলের ভক্ত যখন আর্জেন্টিনায়

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ব্রাজিলের কঠিন ভক্ত জাফর সাদেক আর্জেন্টিনা গিয়েছিলেন দক্ষিণ আমেরিকার সর্বোচ্চ পর্বত মাউন্ট অ্যাকনকাগুয়া জয় করতে। বুয়েনস আইরেস বিমানবন্দরে নেমেছিলেন ব্রাজিলের জার্সি পরে। তারপর কী ঘটল, লিখেছেন নিজেই
বুয়েনস আইরেসের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নেমেই বুঝেছিলাম, আমার পোশাকটা অনেকের নজর কাড়ছে। এ বছর, অর্থাৎ ২০২৬ সালের জানুয়ারির কথা। আমি আর্জেন্টিনায় গিয়েছিলাম পর্বতারোহী হিসেবে। মাউন্ট অ্যাকনকাগুয়ার চূড়ায় উঠেছিলামও। ব্রাজিলের একনিষ্ঠ সমর্থক হিসেবে বাংলাদেশ থেকে রওনা হওয়ার সময়ই ঠিক করেছিলাম, আর্জেন্টিনার মাটিতে প্রথম পা রাখব প্রিয় দলের জার্সি গায়েই।
বিমানবন্দরে কয়েকজন কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল, কেউ কেউ মুচকি হেসেছিলও।
বুয়েনস আইরেস থেকে প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার দূরে মেন্দোসা প্রদেশে গিয়েছিলাম অভিযানের প্রস্তুতির জন্য। আন্দিজ পর্বতমালার পাদদেশে গড়ে ওঠা পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর শহর মেন্দোসা একসময় ইনকা সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলের অংশ ছিল।
এক বিকেলে মেন্দোসার একটি পার্কে হাঁটছিলাম। গায়ে তখনো ব্রাজিলের জার্সি। হঠাৎ একজন স্থানীয় যুবক এসে কথা বলতে শুরু করলেন। তার গায়ে আর্জেন্টিনার জার্সি। প্রথমেই জানতে চাইলেন, আমি কোথা থেকে এসেছি। বাংলাদেশ বলতেই উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন।
বিশ্বকাপের সময় বাংলাদেশের আর্জেন্টিনা-উন্মাদনার কথা তিনি জানতেন। বাংলাদেশের বাড়ির ছাদে ছাদে বিশাল আর্জেন্টাইন পতাকা, রাস্তা জুড়ে উৎসব, এসবের ছবি ও ভিডিও নাকি আর্জেন্টিনায়ও ছড়িয়ে পড়েছিল। আমরা দুজন একসঙ্গে ছবি তুললাম। একজন আর্জেন্টিনার জার্সিতে, আরেকজন ব্রাজিলের।
বুয়েনস আইরেসেও একই অভিজ্ঞতা হয়েছে। শহরের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর সামনে বাংলাদেশের পতাকা হাতে ছবি তুলছিলাম। অনেকেই এগিয়ে এসে জানতে চাইত, আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি কি না। তারপর শুরু হতো বাংলাদেশ নিয়ে আলোচনা।
আর্জেন্টিনার সাধারণ মানুষ বাংলাদেশের নাম খুব ভালোভাবেই জানে। বিশেষ করে ২০২২ সালের বিশ্বকাপের পর দুই দেশের মধ্যে এক ধরনের অদৃশ্য বন্ধন তৈরি হয়েছে। কেউ বাংলাদেশের ক্রিকেটের খোঁজ নিচ্ছেন, কেউ বলছেন তারা বাংলাদেশের ম্যাচের খবর রাখেন।
বুয়েনস আইরেসের প্রাণকেন্দ্র প্লাজা দে মায়ো এবং আশপাশের এলাকায় সন্ধ্যার পর এক অন্যরকম পরিবেশ তৈরি হয়। বিশেষ করে সপ্তাহান্তে রাস্তার এক পাশ বন্ধ করে সাংস্কৃতিক আয়োজন চলে গভীর রাত পর্যন্ত। কোথাও গান, কোথাও নাচ, কোথাও ছোট ছোট শিল্পীগোষ্ঠীর পরিবেশনা। রাস্তার ধারে ক্যাফে, আড্ডা আর উৎসবের আবহ। আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা হেঁটে এসব উপভোগ করেছি।
একদিন বুয়েনস আইরেসের ওন্সে এলাকায় হাঁটতে গিয়ে কয়েকজনকে দেখে মনে হলো তারা বাংলাদেশি হতে পারেন। কাছে যেতেই পরিচয় হলো। বাদল ভাই, মামুন ভাইসহ আরও কয়েকজন আমাকে এমন আন্তরিকতা দেখিয়েছেন, যেন আমি তাদের বহুদিনের পরিচিত। শ তিনেক বাংলাদেশি সেখানে বসবাস করেন।
আর্জেন্টিনার খাবারের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরিচিত হয়েছি ‘আসাদো’র সঙ্গে। এটি মূলত বিশেষ পদ্ধতিতে রান্না করা গরুর মাংস, অনেকটা স্টেকের মতো।
তাদের জীবনযাপনও আমাকে মুগ্ধ করেছে। অসংখ্য উন্মুক্ত পার্কে পরিবার নিয়ে ঘুরতে যাওয়া, খোলা আকাশের নিচে দুপুর বা রাতের খাবার খাওয়া, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা— এসব যেন তাদের দৈনন্দিন সংস্কৃতির অংশ।
দেশটির বিভিন্ন রাস্তা, দেয়াল ও চত্বরে দেখা যায় কিংবদন্তিদের উপস্থিতি। ডিয়েগো ম্যারাডোনা, লিওনেল মেসি, গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা— তাদের ছবি, দেয়ালচিত্র ও স্মারক ছড়িয়ে আছে সর্বত্র।
অভিযানের ফাঁকে আমি বোকা জুনিয়র্সের ঐতিহাসিক এলাকা ঘুরে দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম। লা বোকা নামের এ এলাকার রেস্তোরাঁ-বাড়ি সব কিছুতেই ফুটবল সংস্কৃতির ছাপ। আরেকটি মজার অভিজ্ঞতা হয়েছিল একটি আইসক্রিমের দোকানে। আর্জেন্টিনার আইসক্রিম বিশ্ব জুড়েই বিখ্যাত। সেখানে বসে আইসক্রিম খাওয়ার সময় দোকানের মালিক আমার সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলেন। বাংলাদেশি শুনেই তিনি মোবাইলে গত বিশ্বকাপের সময় বাংলাদেশের বিভিন্ন শহরে আর্জেন্টিনার সমর্থকদের উল্লাসের দৃশ্যের ভিডিও দেখালেন।
ব্রাজিলের ভক্ত হয়েও আর্জেন্টিনার মাটিতে দাঁড়িয়ে আমি বুঝেছি, ফুটবল কখনো কখনো প্রতিদ্বন্দ্বিতার চেয়েও বড় কিছু।





