মাঝ দরিয়ার দিনপঞ্জি

পটুয়াখালীর কুয়াকাটা থেকে গভীর সাগরে জেলেদের সঙ্গে একটি মাছ ধরার বোটে চড়ে বসেছিলেন তৌহিদ জসি। ১০ দিনের যাত্রায় গভীর সমুদ্রে জেলেদের সংগ্রাম আর মাছ ধরার রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা খুব কাছ থেকে দেখেছেন। দিনপঞ্জি থেকে সেই গল্প শুনিয়েছেন পাঠকদের
৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫
দুপুর ১২টার দিকে জোয়ার শুরু হতেই আমাদের বোটটি ঘাট ছেড়ে সমুদ্রের পানে ছুটে চলল। ডেকে বসতেই খেয়াল করলাম মোবাইল নেটওয়ার্ক সম্পূর্ণ উধাও— চারপাশে শুধু অন্তহীন জলরাশির হাতছানি। এর কিছুক্ষণ পরেই দুপুরের খাবারের ডাক। গরম ভাতের সঙ্গে মুরগির মাংস।
খলিল ভাইয়ের ভাষ্য, প্রথম জাল ফেলার পরই শুরু হবে তাজা মাছ খাওয়ার মহোৎসব। খাওয়া শেষে খলিল ভাইয়ের সঙ্গে জিপিএস স্ক্রিনের সামনে বসে আলোচনা শুরু করলাম— আমরা ঠিক কোন রুটে এগোচ্ছি। সাগরে বহু বছরের অভিজ্ঞতা খলিল ভাইয়ের। আবদুর রহিম ভাই নামে এক দারুণ মজার মানুষও এসে আমার সঙ্গে আড্ডা জমালেন।
বিকালের দিকে তিনিই নিয়ে গেলেন বোটের কোল্ড স্টোরেজের দিকে। বরফশীতল কিছু তাজা স্কুইড বের করা হলো। এরপর সেই স্কুইডগুলো ভালোভাবে পরিষ্কার করে দারুণভাবে ভেজে মুড়ির সঙ্গে মাখিয়ে তৈরি হলো আমাদের বৈকালিক নাশতা। হঠাৎ করেই বোটের ইঞ্জিনে তীব্র একটা ঝাঁকুনি এবং এরপরই ইঞ্জিনের গর্জন অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেল। সবার মধ্যে কিছুটা চাঞ্চল্য তৈরি হলো। অচিরেই জানা গেল, ইঞ্জিনের তেলের পাইপে গ্যাস জমে যাওয়ায় এই বিপত্তি। বোটে জুয়েল নামে একজন ডেডিকেটেড মেরিন ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন, দ্রুত ত্রুটি সারানোর কাজে লেগে গেলেন তিনি।
পশ্চিমে সূর্য তখন ধীরে ধীরে হেলে পড়েছে।
এদিকে বোটের রান্নাঘরে রাতের খাবারের আয়োজন করছেন বাবুর্চি নূর মোহম্মদ ভাই। গরম ভাত আর সাধারণ মাছের তরকারি। এদিকে জুয়েল ভাই দক্ষতার সঙ্গে ইঞ্জিনের পাইপের গ্যাস ও তেল পাসের সমস্যা পুরোপুরি ঠিক করে ফেললে বোট আবার পূর্ণগতিতে সচল হলো।
৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫
আমি ইচ্ছে করেই রাতে কেবিনের বাইরে খোলা আকাশের নিচে ঘুমিয়েছিলাম। ভোর ৫টার দিকে খলিল ভাই আমাকে ডেকে তুললেন সূর্যোদয় দেখার জন্য। ঘুমঘুম চোখে চোখ মেলে তাকালাম, কিন্তু চারপাশটা ঘন কুয়াশায় এতটাই আচ্ছন্ন ছিল যে, সাগরের বুক থেকে সূর্যের মুখ দেখা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল।
প্রতিদিন সকালে এই বোটে টয়লেট ব্যবহার করাটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় অ্যাডভেঞ্চার বলে মনে হয়েছে! মাত্র সাড়ে তিন ফুট বাই সাড়ে তিন ফুট আকৃতির সেই ছোট্ট স্পেস। নিচে একটি দড়ি বাঁধা বদনা থাকে, যা দিয়ে সাগরের পানি তুলে কাজ চালাতে হয়। সেখানে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর কোনো সুযোগই নেই।
সকালে প্রথম দফা জাল তোলার কাজ শুরু হলো। ছোট সাইজের চাপিলার একটা বিশাল ঝাঁক ধরা পড়েছে। এই বোটে জাল তোলা এবং ফেলার জন্য আলাদা শক্তিশালী মোটর ও মেশিন রয়েছে।
ঘড়িতে তখন দুপুর ২টা বেজে ২৫ মিনিট। মাছ গোছানোর পর্ব শেষ হলো আর ঠিক তখনই নতুন করে জাল ফেলে বোট আবার সামনের দিকে এগোতে লাগল। খলিল ভাই সিদ্ধান্ত নিলেন বোট ঘুরিয়ে আরও পশ্চিমের গভীর সমুদ্রে চলে যাওয়ার। প্রথম টানেই বেশ ভালোরকমের মাছ উঠেছে— ছুরি, রূপচাঁদা, কালাচান্দা, চইট্টা, চাপিলা এবং মাত্র একটি কাঙ্ক্ষিত ইলিশ মাছ! আমার জন্য বিশেষভাবে একটা রূপচাঁদা মাছ আলাদা করে রাখা হয়েছে।
গভীর সমুদ্রের পানি যথেষ্ট ঠান্ডা এবং এর রঙ একেবারে স্ফটিকের মতো টলটলে নীল। দুপুরের খাবার ও কাজ শেষে সবাই এখন কিছুক্ষণের জন্য বিশ্রামে। বিকাল গড়াতেই আবার শুরু হবে মূল কর্মযজ্ঞ। মাছ ভেজে খাওয়ার ফাঁকে দেখলাম জেলেরা এরই মধ্যে জাল ওঠানোর কাজ শুরু করে দিয়েছেন। মাছ বাছার কাজ শেষ হওয়ার পর বোটের সামনের অংশে বসে পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়া রক্তিম সূর্যটাকে দেখলাম।
এখানের পানির রঙ অদ্ভুত রকমের কালো— এটাই সেই বিখ্যাত ‘কালাপানি’। যত গভীরে যাওয়া যাবে, এই কালো পানির পরিধি ততই বাড়বে। সন্ধ্যার পর জাল তুলে দেখা গেল মাছ কম। সবাই মাছ বাছা শেষে রাতের খাবার খেয়ে নিলেন। একটি নির্দিষ্ট নিরাপদ জায়গায় বোট নোঙর করে রাখা হলো রাতের মতো।
৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫
পান্তা ভাত আর মাছের তরকারি দিয়ে সকালের খাবার খাওয়া হলো। সাগরে চা আনলিমিটেড। সকালের প্রথম জাল টানা হয়ে গেছে, গতকালের থেকেও অনেক মাছ কম উঠেছে। আজও কোনো ইলিশের দেখা মেলেনি। এদিকে আমাদের বাবুর্চির শরীর খারাপ হওয়ায় রান্নার কাজ সবাই মিলে করতে হচ্ছে। হঠাৎ করেই উত্তর দিক থেকে ঠান্ডা বাতাস বইতে শুরু করল। সমুদ্রের কালো জলে ভেসে চলেছি আমরা। এখন আরও দক্ষিণ-পশ্চিমের গভীর সমুদ্রে যাচ্ছি।
দুপুরের খাওয়াদাওয়া করে সবাই চলে গেছে জাল তুলতে। এবার জালে কাঙ্ক্ষিত ‘টাকার মাছ’ রূপচাঁদা ধরা পড়েছে! গভীর সমুদ্রে প্রতিদিন প্রায় ৮০ হাজার টাকা খরচ হয়। সেই অনুপাতে মাছ না উঠলে বড় লস।
আমি প্রতিদিনের মতো নিচে নেমে ফ্রাই করে খাওয়ার জন্য একটা কালাচান্দা আর একটা ফাগলা মাছ নিয়ে নিলাম। সন্ধ্যার সময় জাল তোলা হলে উঠে এলো দুটো আস্ত সাপ! সাপ দুটি সরানোর পর জালে মণখানেক চান্দা মাছ মিলল।
৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫
সকালটা শুরু হয় একঝাঁক ডলফিন দেখে! বোটের কাছে এসে দুই-তিনটা লাফ দিয়ে ডলফিনগুলো লাপাত্তা। দুপুরের পর থেকে ঢেউ একটু বেশি। বোট একবার উঠছে আর নামছে, সমুদ্র উথালপাথাল। কড়া একটা ঘুম দিয়ে উঠে দেখি জাল তোলার কার্যক্রম চলছে। দুপুরের মেন্যুতে বাটারফ্লাই মাছ। আজকের স্রোত অনেক বেশি, বোটে পানির বাড়ি লেগে পানি ছিটে একাকার। মোটামুটি ভালো মাছ উঠেছে জালে কিন্তু টাকার মাছ কম।
৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫
রাতে ঘুম ভাঙল প্রচণ্ড শীতে। বাতাসের গতিবেগ বেশি থাকায় নৌকা প্রচণ্ড বেগে দুলছিল। সমুদ্র উত্তাল, বোট প্রায় ৮-১০ ফুট ওপরে উঠে আছড়ে পড়ছে পানিতে। ভাঙা পানির কনায় সূর্যের আলো পড়ে তৈরি হচ্ছে রঙধনু! দুপুরের খাবার শেষ করে জাল তোলা হলে মাছ মোটামুটি ভালো এসেছে। সেখান থেকে একটা ফাগলা আর একটা রূপচাঁদা মাছ ফ্রাইয়ের জন্য নিলাম। কিন্তু সন্ধ্যায় তৃতীয় দফা জাল তোলার সময় বাধল বিপত্তি! পুরো জাল ছিঁড়ে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল, কোনো মাছ এলো না।
১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫
সময়ের হিসাবটাই যেন হারিয়ে ফেলেছিলাম— টেরই পেলাম না কখন এতগুলো দিন হুড়মুড় করে কেটে গেছে! নবম দিন সকালে খলিল কাকা কমিউনিকেশন রেডিওর ফ্রিকোয়েন্সিতে একটা জরুরি বার্তা পেলেন— আমাদের কোম্পানিরই আরেকটি মাছ ধরার ট্রলার হঠাৎ ইঞ্জিন বিকল হয়ে গভীর সাগরে ভাসছে! সেই ট্রলারটি ইলিশ মাছে ভরপুর।
রেডিওতে ভেসে আসা নিদের্শনা অনুযায়ী সেই বিকল ট্রলারের উদ্দেশে ফুল স্পিডে বোট ছুটল। ঘটনাস্থলে পৌঁছে ইলিশে ভরপুর সেই ভাসমান ট্রলারটিকে টেনে নিয়ে কূলের পানে ফিরতি যাত্রা করলাম।








