প্রাণ ও প্রকৃতি
বন বিড়ালের বুদ্ধি

বন বিড়াল
বেশ কয়েক বছর আগের কথা। আমার তখন প্রচুর বই পড়ার অভ্যাস। রাত যতটাই বাজুক না কেন, এক-দুই ঘণ্টা বই না পড়ে ঘুমাই না। সে রাতে আমার বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। আমিই কেবল আমাদের উত্তর ভিটার ঘরের বিছানায় শুয়ে শুয়ে বই পড়ছি। পাশে আমার স্ত্রী ও বড় ছেলে অমি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। হঠাৎ ঘরের জানালা পথে চোখ গেল বাইরে। নরসিংদীর মনোহরদীতে আমাদের বাড়ির চার ভিটায় তখন চার ঘর। মাঝখানে উঠান। আমার বিপরীতে দক্ষিণ ভিটার বেড়ার ঘরে অহিদ ভাইয়ের ফ্যামিলি। ভাবি সে ঘরে মোরগ-মুরগি পোষেন। পশ্চিম ভিটার টিনের চালা ও বেড়ার ঘরটা অনেক বড়। সে ঘরের চালার কোনায় একটি ঝোলানো বাতি। তার আলোয় দেখলাম, একটি বন বিড়াল দক্ষিণ ভিটার ঘরটি ঘিরে চক্কর দিচ্ছে। টের পেয়ে ঘরের ভেতরে থাকা মোরগ-মুরগিগুলো অস্থির হয়ে পড়েছে। আমি আস্তে আমার ঘরের ভেতরের লাইটটি বন্ধ করে দিলাম। আর রুদ্ধশ্বাসে ঘটনার শেষটুকু দেখতে অপেক্ষায় রইলাম।
গ্রামীণ জঙ্গলে গুইসাপ, বেজি, শিয়াল, সজারু ও বন বিড়ালের মধ্যে আমার সবচেয়ে প্রিয় প্রাণী এই বন বিড়াল। তার ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ ভারিক্কি চলাফেরা, মেদহীন শরীর, লম্বা লম্বা পা মুগ্ধ করে আমাকে। ক্ষিপ্রতায় ও চাতুর্যে বন বিড়ালের সমকক্ষ প্রাণী হিসেবে কেবল চিতা বাঘকেই বিবেচনা করা যেতে পারে। সে যাই হোক, বন বিড়ালটি বেশ কয়েকবার এ রকমভাবে ঘরটির চারপাশ প্রদক্ষিণ শেষে লাফ দিয়ে ঘরটির ভিটার কিনারে উঠে গেল। তারপর যে বুদ্ধি খাটাল, তার জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না আমি। বেড়ার ওপাশে থাকা মুরগির অবস্থান নিশ্চিত হয়ে নিয়েছিল আগেই। এবার বেড়ার আঙুল সমান ফাঁক দিয়ে হঠাৎ করেই একটি থাবা ঢুকিয়ে দিল। লক্ষ্য তার অব্যর্থ। বেড়ার ফাঁক দিয়ে সে আস্ত মুরগিটি ধরে আনতে না পারলেও তার শরীর থেকে আস্ত একটি রান ছিঁড়ে আনতে পারল। ঘটনার আকস্মিকতায় আমি কিছু বুঝে উঠতে পারিনি প্রথমে। তারপর মুরগিগুলোর চিৎকারে ভাবিও জেগে ওঠে। দরজা খুলে আমিও দৌড়ে যাই ঘটনাস্থলে। এরই মধ্যে বন বিড়ালটি জ্যান্ত মুরগির শরীর থেকে ছিঁড়ে আনা রানটি মুখে করে বিজয় গর্বে অন্ধকারের ভেতর হারিয়ে গেছে। আর রানহীন মুরগিটি জবাই করা ছাড়া কোনো গত্যন্তর থাকল না ভাবির।




