জুডো
- কাজী আনোয়ার হোসেন

কাজী আনোয়ার হোসেন। জন্ম: ১৯ জুলাই ১৯৩৬-মৃত্যু: ১৯ জানুয়ারি ২০২২। অংকন: সোহানুর রহমান
রহস্যোপন্যাসের পাশাপাশি অল্পবিস্তর নন-ফিকশনও লিখেছেন কাজী আনোয়ার হোসেন। তার জুডো নিয়ে এই অন্যরকম গদ্যটি প্রকাশিত হয় ১৯৭৫ সালের ১৩ এপ্রিল দৈনিক ইত্তেফাকে। শিরোনাম ছিল— ‘মাসুদ রানা খ্যাত কাজী আনোয়ার হোসেনের দৃষ্টিতে জুডো’। তার ৯০তম জন্মবার্ষিকীতে লেখাটি নিজের সংগ্রহ থেকে পাঠকদের সামনে হাজির করেছেন মুহিত হাসান
আমার ছেলে টিংকু (কাজী শাহনূর হোসেন)। ছয় বছরের ছেলে। লাজুক, দুর্বল। শরীরের কাঠামোটা বাড়ন্ত নয়। দেখলে মনে হয় চার বছরের বাচ্চা। ক্লাস ওয়ান। একদিন রাস্তায় বড় একটা ছেলের হাতে মার খেয়ে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি এলো। ভবিষ্যতের কথা ভেবে শঙ্কিত হলাম। ক্লাসের বেশি বয়সের ছেলেদের হাতে মার খাবে, রাস্তায় মার খাবে, খেলতে গিয়ে মার খাবে— প্রতিকার নেই। নালিশ শুনতে শুনতে অস্থির হতে হবে আমাকে। ছেলে বড় হচ্ছে, হবে। এমন নয় যে, কারো সাথে মিশতে না দিয়ে ঘরে আটকে রাখব। বিকাশে বাধা পড়বে তাহলে। পরনির্ভরশীল হয়ে পড়বে, ক্ষতি হবে ওর। সমবয়সী বন্ধুবান্ধবদের সাথে সমান মর্যাদা নিয়ে মেলামেশা করতে না পারলে মানুষ হবে না। সিদ্ধান্ত নিলাম, জুডো শেখাব ছেলেকে। তাহলে আর কেউ ওর পিছনে লাগতে সাহস পাবে না।
একজন রোমাঞ্চোপন্যাস লেখক হিসেবে জুডোর সাথে আমার পরিচিতি বহুদিনের। কিন্তু এ পরিচয় শুধু কাগজ-কলমেই। বাস্তবে যদিও কোনোদিন এর কলাকৌশল দেখবার সুযোগ হয়নি, জানা ছিল, এটা এমন এক গোপন বিদ্যা, যা জীবনে অনেক কাজে আসতে পারে। কাজেই ছেলের এই সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে জুডোর কথাই মনে এল সর্বপ্রথম। ভর্তি করে দিলাম ওকে বাংলাদেশ জুডো ফেডারেশনে।
কিন্তু সিদ্ধান্তটা ঠিক হলো কি না সে ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহ রয়ে গেল মনের মধ্যে। চিন্তা হলো অন্য ছেলেরা আর অযথা মারধর করতে পারবে না ছেলেকে ঠিকই, বুঝলাম, কিন্তু তার মানে এই নয় যে, আমার ছেলে মারবে না। সেটাও মহাসমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে ভবিষ্যতে। জুড়ো শিখে যখন-তখন যাকে-তাকে যদি মারাত্মক জখম করতে শুরু করে তাহলে সেটাও সুখকর অবস্থা হবে না। নালিশে নালিশে পাগলদশা হবে। আর যাই হোক, গুন্ডা তৈরি করতে আগ্রহী আমি নই। নিজের ছেলে রকবাজ হয়ে যাক কে চায়?
এই ঢাকা শহরে ঠাসাঠাসি মানুষ— মাঠ কোথায় যে ছেলেরা খেলবে? খেলাধুলা না করলে মন বড় হবে কী করে?
নিজের মনে ব্যাপারটার একটা নিষ্পত্তি করবার উদ্দেশ্যে যাতায়াত শুরু করলাম জুডো ফেডারেশনে। ওখানকার পরিবেশটা বুঝে নেওয়া দরকার। দেখলাম, প্রথম দিন যে ছেলে কোরবািনর খাসির মতো চোখের জল ফেলতে ফেলতে রওনা হয়েছিল জুডো শিখতে, এক হপ্তা পর তাকে আর চেনাই যায় না। আশ্চর্যভাবে খাপ খাইয়ে নিয়েছে টিংকু সেখানে নিজেকে। জুডোকাদের দিকে এক নজর চেয়েই বুঝতে পারলাম ওরা সবাই ভদ্রঘরের শিক্ষিত ছেলেপিলে। বুঝলাম বাইরে থেকে লোকে জুডোকে যা ভাবে, আসলে ব্যাপারটা তা নয়। এটা মারপিট বা গুন্ডামি শেখাবার আখড়া নর। অদ্ভুত মজার এক খেলা। নিয়ম-শৃঙ্খলার কোথাও একবিন্দু শিথিলতা নেই। সবাই সার বেঁধে ফ্রি-হ্যান্ড ব্যায়াম করছে, ব্রেকফল শিখছে, পরস্পরকে বো করে ফাইট শুরু ও শেষ করছে, বাড়ি ফেরার সময় হলে বিনীতভাবে অনুমতি নিচ্ছে শিক্ষকের। শুধু খেলা নয়, এখানে শিক্ষা দেয়া হচ্ছে শৃঙ্খলা, নিয়মানুবর্তিতা, গুরুজনের প্রতি ভক্তি-শ্রদ্ধা, বিনয়, আচার-ব্যবহার, আদব-কায়দা, সব। এবং আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদাবোধ। শুধু আত্মরক্ষার ক্ষেত্রেই নয়, জীবনের সব ক্ষেত্রেই কাজে লাগবে এ শিক্ষা। খেলার মাধ্যমে শেখা— ভুলবার উপায় নেই।
জুডোশিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের কয়েকজনের সাথে আলাপ করে আমার বেশ কিছু ধারণা পরিষ্কার হয়ে গেল। যেমন, আমার ভয় ছিল, এই ভয়ংকর বিদ্যা শিখতে গিয়ে হয়তো হাড়গোড় ভেঙে যেতে পারে, কিম্বা বাচ্চা ছেলের অভ্যন্তরীণ কোনো ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। জানলাম, এ ভয় অমূলক। জুজুৎসু থেকে মারাত্মক কৌশলগুলো বাদ দিয়ে নিছক খেলা হিসেবে তৈরি করা হয়েছে জুডো— আর পাঁচটা খেলার মতোই এটা একটা আন্তর্জাতিক খেলা। মুষ্টিযুদ্ধের মতো নাক-চোখ ফাটবার সম্ভাবনা এতে খুবই কম। পাকা জুডোকার ধুড়ুম-ধাড়ুম আছাড় খাওয়াটা আসলে আর কিছু না, অভ্যাসের ফল। ব্যথা পাচ্ছে না তার একবিন্দুও।
কেউ জানে না আমার মধ্যে কী ক্ষমতা আছে, দেখতে আর পাঁচজন সাধারণ মানুষের মতোই আমি, অথচ যে কোনো মানুষকে তুলে আছাড় মারার ক্ষমতা আছে আমার— ভাবলেই পুলক লাগে গায়ে।
এই গোপন বিদ্যা শিখে ছেলে বেয়াড়া হয়ে যাবে না সে ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হয়েছি ভাইস প্রেসিডেন্ট হাসানুজ্জামান (মণি) সাহেবের সাথে আলাপ করে। তাঁর বক্তব্য, যারা মারপিট শেখার জন্যে আসে, তারা এখানে টেকে বড়জোর এক মাস কি দু’মাস। এখানকার পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়াতে না পেরে তারা পালিয়ে বাঁচে। কারণ, এখানে প্রথমেই শিখতে হবে সংযম, নিয়ম-শৃঙ্খলা, ভদ্রতা। এসব মনের মধ্যে বসে গেলে দূর হয়ে যায় গুন্ডামির মনোভাব। স্ট্রিট-ফাইটার হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা জুডোকাদের কাছে একটা হাস্যকর ব্যাপার। প্রচণ্ড এক আত্মবিশ্বাস এসে যায় এদের মধ্যে কয়েক মাসের মধ্যেই। আক্রান্ত না হলে কারো গায়ে হাত তুলবে না এরা। দুর্বল চেহারার এক জুডোকা অনায়াসে ধরাশায়ী করতে পারে প্রকাণ্ড এক পালোয়ানকে, কিন্তু এ সত্য জেনেও বীরত্ব জাহির করবার প্রলোভন বিচলিত করতে পারছে না তাকে শিক্ষার গুণে। অসভ্য বা দুর্বিনীত জুডোকা চোখে পড়েনি আমার।
ঘন ঘন যাতায়াত এবং জুডোর প্রতি আমার আগ্রহ দেখে কয়েকজন প্রস্তাব দিলেন, আমিও শিখি না কেন। বললেন, যে কোনো বয়সেই এটা শুরু করা যায়, যে কোনো বয়স পর্যন্ত চর্চা বজায় রাখা যায়। মনটা উতলা হয়ে উঠেছিল। কেউ জানে না আমার মধ্যে কী ক্ষমতা আছে, দেখতে আর পাঁচজন সাধারণ মানুষের মতোই আমি, অথচ যে কোনো মানুষকে তুলে আছাড় মারার ক্ষমতা আছে আমার— ভাবলেই পুলক লাগে গায়ে। জানি, জীবনে কাউকে তুলে আছাড় মারার মতো পরিস্থিতি খুব কমই আসে, তবু যদি কখনো এরকম অবস্থা আসে, জুডো জানা থাকলে আক্রমণের মুখে আত্মরক্ষা করতে পারব অনায়াসে, এই ভেবে দুর্দমনীয় আকর্ষণ বোধ করি জুডোর প্রতি। দুঃখ হয়, বয়সটা যদি আমার আরো কয়েক বছর কম হতো। কিম্বা বয়স্কদের জন্যে যদি আলাদাভাবে জুডো শেখাবার ব্যবস্থা থাকত। এখন নেই। হয়তো হবে পরে। যখন হবে, তখন হয়তো আরো বয়স্ক হয়ে যাব। খেলোয়াড়সুলভ মনোভাবটা নষ্ট হয়ে যাবে পুরোপুরি।
নিজের কথা থাক। ফেডারেশনের কয়েকটি ছেলের খেলা দেখে মনে হয়েছে খুব ভালো খেলছে এরা। কিন্তু দুঃখের বিষয়, ঠিক কতটা ভালো তা বোঝার উপায় নেই। আর সব দেশের আর সব ছেলেরাও বসে নেই নিশ্চয়। আমাদের ছেলেরা আন্তর্জাতিক মান অর্জন করেছে কি করেনি, কতটা করেছে, কতটা বাকি—নিশ্চিত করে জানা খুব দরকার। বাইরে থেকে জুডো টিমকে আমন্ত্রণ করা দরকার, এদেরকে বিদেশে পাঠানো দরকার। কে জানে, জাতীয় গৌরব হতে পারে এইসব ছেলে, উজ্জ্বল করতে পারে দেশের মুখ। যদি দেখি বাংলাদেশের ছেলে একদিন বিশ্ব জুডো প্রতিযোগিতায় বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়েছে, সেদিন আমাদের জাতির জন্যে এক মহা শুভদিন হবে।
এই ঢাকা শহরে ঠাসাঠাসি মানুষ— মাঠ কোথায় যে ছেলেরা খেলবে? খেলাধুলা না করলে মন বড় হবে কী করে? পাড়ায় পাড়ায়, রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে আড্ডা মারা আর মেয়েদের দিকে সিঁটি মারার চেয়ে আমার মনে হয় জুডোর ম্যাটে খানিক ঘাম ঝরিয়ে আসা অনেক ভালো।
শিক্ষক দুজন— জনাব আওলাদ হোসেন ও জনাব হাসানুজ্জামান মণি। এঁরা সততার সাথে মানুষ তৈরি করছেন। জুডোরা ভাগ্যবান। বিনা পারিশ্রমিকে যে স্নেহ আর যত্ন তাঁরা ব্যয় করছেন মানুষ তৈরির কাজে, সেটা এদেশে কেন, সারা পৃথিবীতেই দুর্লভ।
হারজিৎটাই বড় কথা নয়। এই সেদিন জাতীয় দিবস উপলক্ষে প্রতিযোগিতা হলো। ছোট ছোট তিনটে বাচ্চা যোগ দিয়েছিল প্রতিযোগিতায়। ফলাফল : তিনজনই ফার্স্ট। কারণ? শিক্ষকরা চান না অতটুকু বাচ্চাদের মনে কষ্ট লাগুক। ওরা এতই ছোট যে, প্রতিযোগিতা শব্দের অর্থ বুঝবারও বয়স হয়নি। এতটা অন্তর্দৃষ্টি নিয়ে যে প্রতিষ্ঠানে গড়ে তোলা হচ্ছে শিশু, কিশোর, তরুণ— ভবিষ্যৎ নাগরিক, তার সর্বাঙ্গীণ মঙ্গল এবং উত্তরোত্তর উন্নতিই কামনা করব।
ইত্তেফাক, ১৩ এপ্রিল ১৯৭৫




