গায়ক পাখির নাম কেন ‘কসাই’

অন্য পাখি খাওয়ায় ওস্তাদ কসাই। ছবি: আহনাফ আল সাদমান
শিকারি জীবনে মাত্র ৫০ গ্রাম ওজনের একটি পাখি আমার মাথা ঘুরিয়ে দিয়েছিল। সুন্দর গান গায় সে। কিন্তু স্বভাব আর আচরণ ভয়ংকর হিংস্র। বনের ধারের বাবলা গাছে কিংবা ক্ষেতের সীমানার কাঁটাতারের বেড়ার ওপর প্রায়ই আমার সঙ্গে তার দেখা হয়ে যেত। তার শিকার ধরা, মারা ও সংরক্ষণের কৌশল আমাকে এতটা কৌতূহলী করে তুলেছিল যে, দিনের পর দিন তার কাজের ওপর নজর রাখছিলাম। যখন ক্ষেতের ধারের বাঁশের বেড়ার ওপর বসে থাকত, মনে হতো কত শান্ত-সুন্দর পাখি! আসলে এমবুশ হান্টার। চুপচাপ গোবেচারার মতো দীর্ঘ সময় শিকারের অপেক্ষায় গাছের ডালে কিংবা ফসল ক্ষেতের বাঁশের বেড়ার ওপর বসে থাকে। শিকার চোখে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে উড়ে গিয়ে তাকে আক্রমণ করে বসে। শিকারি পাখি পেঁচা, ঈগল কিংবা চিলের মতো ধারালো ও শক্তিশালী নখরযুক্ত থাবা নেই তার। তাহলে কীভাবে সে শিকারকে ধরাশায়ী করে? কখনো কখনো সে নিজের চেয়ে বেশি ওজনের শিকারকে অনায়াসে কুপোকাত করে ফেলে। আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো বাইনোকুলারে চোখ রেখে তার অভাবনীয় শিকার কৌশল পর্যবেক্ষণ করতাম।
শিকারের দেহের নরম অংশ বাবলা গাছের কাঁটায় ঢুকিয়ে সে জীবন্ত খাওয়া শুরু করত
শিকার ছোট হলে সোজা উড়ে গিয়ে ঠোঁট দিয়ে চেপে ধরে গলাধঃকরণ করে। আর ইঁদুর, অঞ্জন, গিরগিটি কিংবা সাপের বাচ্চার ক্ষেত্রে বারবার গাছের কাণ্ডে আছাড় মেরে হত্যা করে। তার ঠোঁট শিকারি পাখির মতো মজবুত এবং শিকারোপযোগী। কখনো দেখতাম, সে শিকারকে ঘাড় বরাবর ধরে প্রচণ্ডভাবে ঝাকাতে শুরু করত। এতে স্পাইনাল কর্ড ছিঁড়ে প্রায় সঙ্গে সঙ্গে প্রাণীটার মৃত্যু ঘটে। কখনো শিকারের দেহের নরম অংশ বাবলা গাছের কাঁটায় ঢুকিয়ে সে জীবন্ত খাওয়া শুরু করত। একবার তাকে নিজের চেয়ে বড় একটা কাঠশালিক শিকার করতে দেখেছি। আমি তাকে কাটা গাছে একাধিক শিকার ঝুলিয়ে রাখতে দেখেছি, যেন এক মাংসের দোকান। যখন প্রকৃতিতে খাদ্য সংকট দেখা দেয়, বিশেষ করে শীতকালে, তখন সে তার এই সংরক্ষণাগার থেকে খায়। মাঝেমধ্যে ওরা পা দিয়ে ধরেও শিকার ছিঁড়ে খায়।
এতক্ষণ আমি যার কথা লিখলাম সে আমাদের দেশের অতি সুন্দর এক গায়ক পাখি। অথচ শিকার ধরার কৌশল আর সংরক্ষণের জন্য তার নাম হয়ে গেল ‘কসাই’। কালো মাথা কসাই, লেঞ্জা লেটোরা ইত্যাদি নামে অনেকে তাকে চেনে। আরও একটি দুর্দান্ত নাম রয়েছে, তা হলো ‘বাঘাটিকি’। দেহের পালকে বাঘের মতো সাদা-কালো-বাদামি ডোরাকাটা রঙ আর দুর্দান্ত সাহসের কারণেই এই নাম। নিজের চেয়ে দু-তিন গুণ ওজনের পাখিকেও অনায়াসে তাড়িয়ে দিতে পারে। মানুষকেও খুব একটা পাত্তা দেয় না। কসাইয়ের নির্দিষ্ট এলাকা বা ‘টেরিটরি’ রয়েছে। সেখানে অন্য কোনো শিকারি পাখি প্রবেশ করলেই ঘটে বিপত্তি, তীক্ষ্ণ চিৎকার করে সে তাকে তাড়িয়ে নিয়ে যায়। কখনো বেধে যায় ভয়ানক লড়াই।
প্রজনন ঋতুতে পুরুষ কসাই একের পর এক সাপের বাচ্চা, অঞ্জন, ব্যাঙ, ইঁদুর, ছোট পাখি ইত্যাদি থরে থরে সাজিয়ে রাখে বাবলা কিংবা খেজুর গাছের কাঁটায়। এসব মৃত প্রাণী সংরক্ষণের কারণ স্ত্রী কসাই সেই পুরুষকেই সঙ্গী হিসেবে বেছে নেবে, যার সংরক্ষণে সবচেয়ে বেশি আর বৈচিত্র্যময় শিকার ঝুলে থাকবে।
বাঘাটিকির ইংরেজি নাম হচ্ছে Long-Tailed shrike। আর এর বৈজ্ঞানিক নাম Lanius schach। শীতকালে আমাদের দেশে এই প্রজাতির আরও কিছু পাখি পরিযায়ী হয়ে আসে, এদের মধ্যে বাদামি কসাই, মেটে পিঠ কসাই এবং তামাপিঠ কসাই অন্যতম।
কসাই নেতিবাচক নাম হলেও পাখিটি ভীষণ উপকারী। ক্ষতিকারক কীটপতঙ্গ নির্মূলে তার জুড়ি মেলা ভার। তবে আগে যেমন গ্রামের প্রায় প্রতিটি স্থানে এদের দেখতে পাওয়া যেত, এখন সংখ্যায় অনেক কমে গেছে। পরিযায়ী কসাইদের আগমনও হ্রাস পেয়েছে। এটি প্রকৃতির জন্য খুব শুভ লক্ষণ নয়।







