অ্যানেসথেশিয়া কখন ঝুঁকিপূর্ণ

অস্ত্রোপচারের কথা শুনলে অধিকাংশ রোগীর মনে প্রথমেই যে ভয়ের উদ্রেক হয়, তা হলো ‘অ্যানেসথেশিয়া’। অ্যানেসথেশিয়ার বিভিন্ন ধরন, ঝুঁকি ও সতর্কতা নিয়ে লিখেছেন ডা. তানভীর হক তূর্য
অ্যানেসথেশিয়া হলো বিশেষ কিছু ওষুধের প্রয়োগ, যা ব্যথার অনুভূতি কমিয়ে দেয় বা বন্ধ করে দেয়। তবে অ্যানেসথেশিয়া মানেই যে শুধু রোগীকে অচেতন করা, তা কিন্তু নয়। এর মূল উদ্দেশ্য চিকিৎসা বা অস্ত্রোপচারের সময় রোগীর ব্যথা ও অস্বস্তি কমিয়ে তাকে আরামদায়ক অবস্থায় রাখা। অনেক সময় রোগীকে পুরোপুরি অচেতন না করেও শুধু ঘুম ঘুম বা শান্ত অবস্থায় রাখা হয়, যাকে বলা হয় সিডেশন। অস্ত্রোপচারের ধরন, রোগীর বয়স এবং শারীরিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে ডাক্তার নির্ধারণ করেন কোন পদ্ধতিতে অ্যানেসথেশিয়া দেওয়া হবে।
অ্যানেসথেশিয়া কীভাবে দেওয়া হয়?
অ্যানেসথেটিক ওষুধের মাধ্যমে ব্যথার অনুভূতি কমানো বা বন্ধ করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চেতনার মাত্রা পরিবর্তন করাই অ্যানেসথেশিয়ার মূল উদ্দেশ্য। এসব ওষুধ বিভিন্নভাবে দেওয়া হয়। যেমন— শিরায় ইনজেকশনের মাধ্যমে, শ্বাসের সঙ্গে গ্যাস দিয়ে কিংবা স্প্রে, ক্রিমের মাধ্যমে।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শিরায় ওষুধ প্রয়োগ করা হয়। তাই অ্যানেসথেশিওলজিস্টকে যথাযথ প্রশিক্ষিত হতে হয় এবং অ্যানেসথেশিয়া-সংক্রান্ত জটিলতা মোকাবিলার বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান থাকতে হয়। কারণ, অ্যানেসথেশিয়ার ওষুধ শিরায় প্রবেশ করার পর তার কার্যক্রম তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করার উপায় নেই।
অ্যানেসথেশিয়ার ধরন
জেনারেল অ্যানেসথেশিয়া: রোগীকে সম্পূর্ণ অচেতন রাখা হয়। বড় ধরনের অস্ত্রোপচারে এটি বেশি ব্যবহৃত হয়।
রিজিওনাল অ্যানেসথেশিয়া: শরীরের একটি বড় অংশের অনুভূতি সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়। স্পাইনাল ও এপিডুরাল অ্যানেসথেশিয়া এর উদাহরণ।
লোকাল অ্যানেসথেশিয়া: শরীরের ছোট একটি নির্দিষ্ট অংশ অবশ করা হয়। ছোট অস্ত্রোপচার, সেলাই বা কিছু দাঁতের চিকিৎসায় এটি ব্যবহার করা হয়।
সিডেশন: রোগীকে পুরোপুরি অচেতন না করে ঘুম ঘুম, শান্ত ও স্বস্তিদায়ক অবস্থায় রাখা হয়। এ অবস্থায় রোগী নিজেই শ্বাস নেন।
শরীরে কীভাবে কাজ করে?
জেনারেল অ্যানেসথেশিয়ায় ব্যবহৃত ওষুধ মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের কার্যক্রমে সাময়িক পরিবর্তন ঘটায়। ফলে রোগী চেতনা হারান এবং অস্ত্রোপচারের সময় কী হচ্ছে, তা সাধারণত জানতে বা অনুভব করতে পারেন না। তবে অ্যানেসথেশিয়ার কাজ শুধু রোগীকে অচেতন করা নয়; অস্ত্রোপচারের সময় ব্যথা, শরীরের প্রতিক্রিয়া, শ্বাসপ্রশ্বাস এবং অন্যান্য শারীরবৃত্তীয় বিষয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে অ্যানেসথেশিয়া টিম বিভিন্ন ওষুধ ও মনিটরিং পদ্ধতি ব্যবহার করে।
সব অস্ত্রোপচারে জেনারেল অ্যানেসথেশিয়ার প্রয়োজন হয় না। রোগীর শারীরিক অবস্থা ও অস্ত্রোপচারের ধরন অনুযায়ী লোকাল রিজিওনাল বা সিডেশন ব্যবহার করা হয়
অ্যানেসথেশিয়ার ঝুঁকি কী?
অ্যানেসথেশিয়া সাধারণত নিরাপদ, বিশেষ করে প্রশিক্ষিত অ্যানেসথেশিওলজিস্ট ও যথাযথ মনিটরিংয়ের অধীনে দেওয়া হয়। তবে কোনো চিকিৎসা পদ্ধতিই পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়।
সাধারণ ও সাময়িক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার মধ্যে থাকতে পারে গলা খুসখুস করা, কাঁপুনি বা ঠান্ডা লাগা, গলাব্যথা বা অস্বস্তি, ঘুম ঘুম ভাব, সাময়িক বিভ্রান্তি এবং কিছু ক্ষেত্রে মাথা ঘোরা।
বিরল ক্ষেত্রে শ্বাসপ্রশ্বাসের সমস্যা, হৃদযন্ত্রের ছন্দের সমস্যা, অ্যানেসথেটিক ওষুধে গুরুতর অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া এবং বিশেষ বংশগত ক্ষেত্রে ম্যালিগন্যান্ট হাইপারথার্মিয়ার মতো জটিলতা হতে পারে। তবে অপারেশনের সময় রোগীর অক্সিজেন, রক্তচাপ, হৃৎস্পন্দনসহ গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক সূচক নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয়।
কখন ঝুঁকি বাড়তে পারে?
অ্যানেসথেশিয়ার ঝুঁকি শুধু ওষুধের ওপর নির্ভর করে না; রোগীর সামগ্রিক স্বাস্থ্য, অস্ত্রোপচারের ধরন এবং আগে থেকে থাকা রোগও গুরুত্বপূর্ণ। হৃদরোগ, হার্ট অ্যাটাকের ইতিহাস, এনজাইনা, হার্ট ফেইলিউর, ভাল্ভের রোগ বা অন্যান্য হৃদযন্ত্রের সমস্যা থাকলে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না থাকলেও ঝুঁকি বাড়তে পারে। হাঁপানি, সিওপিডি বা অন্যান্য ফুসফুসের রোগ থাকলে শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত ঝুঁকি বাড়তে পারে। কিডনি ও লিভার ওষুধের বিপাক ও শরীর থেকে ওষুধ বের করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ডায়াবেটিসে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে না থাকলে বিভিন্ন জটিলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে। আগে স্ট্রোক, খিঁচুনি বা অন্য কোনো স্নায়বিক রোগ থাকলে এবং এসব রোগের ওষুধ খেলে তা অ্যানেসথেশিওলজিস্টকে জানাতে হবে। স্থূলতা ও স্লিপ অ্যাপনিয়া থাকলেও শ্বাসনালির জটিলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে। রোগী বা পরিবারের কারও অ্যানেসথেশিয়ার পর গুরুতর প্রতিক্রিয়ার ইতিহাস থাকলেও চিকিৎসককে জানানো জরুরি।
কখন কোন অ্যানেসথেশিয়া
সব অস্ত্রোপচারে জেনারেল অ্যানেসথেশিয়া প্রয়োজন হয় না। রোগীর শারীরিক অবস্থা ও অস্ত্রোপচারের ধরন অনুযায়ী লোকাল, রিজিওনাল বা সিডেশন ব্যবহার করা যেতে পারে। রিজিওনাল অ্যানেসথেশিয়ার মধ্যে স্পাইনাল, এপিডুরাল ও ব্রাকিয়াল ব্লক রয়েছে। তবে এগুলো সবসময় জেনারেল অ্যানেসথেশিয়ার বিকল্প নয়। কোন পদ্ধতি নিরাপদ ও উপযুক্ত হবে, তা অ্যানেসথেশিওলজিস্ট সিদ্ধান্ত নেন।
শিশুদের ক্ষেত্রে সতর্কতা
শিশুদের অ্যানেসথেশিয়ার সময় বয়স, ওজন, শারীরিক গঠন ও অন্যান্য রোগ বিবেচনা করা হয়। ওষুধের মাত্রাও এসব বিষয় অনুযায়ী নির্ধারণ করা হয়। অপারেশনের আগে কতক্ষণ না খেয়ে থাকতে হবে, তা হাসপাতাল ও অ্যানেসথেশিওলজিস্টের নির্দেশনা অনুযায়ী মানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসকের অগোচরে শিশুকে খাওয়ানো ভয়াবহ বিপর্যয়, এমনকি মৃত্যুও ডেকে আনতে পারে। শিশুর সম্প্রতি জ্বর, সর্দি-কাশি, শ্বাসকষ্ট বা হাঁপানি হয়ে থাকলে চিকিৎসককে জানাতে হবে। অপারেশনের পর কিছু শিশুর অস্থিরতা, কান্না বা বিভ্রান্তি দেখা দিতে পারে, যা সাধারণত স্বল্পস্থায়ী। খুব ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় বা বারবার অ্যানেসথেশিয়ার সম্ভাব্য প্রভাব নিয়েও চিকিৎসকরা প্রয়োজন অনুযায়ী ঝুঁকি ও উপকার বিবেচনা করেন। প্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার শুধু অ্যানেসথেশিয়ার ভয় থেকে এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়।
বয়স্কদের ক্ষেত্রে
বয়স বাড়ার সঙ্গে হৃদযন্ত্র, ফুসফুস, কিডনি ও লিভারের কার্যক্ষমতা এবং শরীরে ওষুধের বিপাকের ক্ষমতায় পরিবর্তন আসতে পারে। একই সঙ্গে একাধিক রোগ ও ওষুধ ব্যবহারের সম্ভাবনাও বেশি থাকে। তাই রক্ত পাতলা করার ওষুধ, ডায়াবেটিসের ওষুধ, উচ্চ রক্তচাপের ওষুধসহ নিয়মিত সব ওষুধের তথ্য চিকিৎসককে জানাতে হবে। অস্ত্রোপচারের পর বয়স্কদের সাময়িক বিভ্রান্তি বা পোস্ট অপারেটিভ ডেলিরিয়ামের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে।
গর্ভাবস্থায় অ্যানেসথেশিয়া
গর্ভাবস্থায় অ্যানেসথেশিয়া বা অস্ত্রোপচারের সময় মা ও গর্ভের শিশুর নিরাপত্তা— দুটিই বিবেচনা করা হয়।
গর্ভাবস্থায় অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হলে গর্ভকাল, অস্ত্রোপচারের ধরন, মায়ের শারীরিক অবস্থা ও গর্ভের শিশুর অবস্থা বিবেচনা করে অ্যানেসথেশিয়া ও প্রসূতি বিশেষজ্ঞরা যৌথভাবে পরিকল্পনা করতে পারেন। মায়ের রক্তচাপ, অক্সিজেন, শ্বাসপ্রশ্বাসসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পর্যবেক্ষণ করা হয়। গর্ভকাল বেশি হলে রোগীকে কীভাবে শোয়ানো হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ভ্রূণের হৃৎস্পন্দন কীভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে, সেটিও বিবেচনা করা হয়।
অ্যানেসথেশিয়ার আগে চিকিৎসককে
যা জানাবেন
আগে অ্যানেসথেশিয়ার সময় বা অপারেশনের পর জ্ঞান ফিরতে দেরি হয়েছিল কি না, কোনো সমস্যা হয়েছিল কি না, নির্দিষ্ট কোনো ওষুধে অ্যালার্জি আছে কি না, বর্তমানে কী কী ওষুধ ও সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করছেন, হৃদরোগ, ফুসফুস, কিডনি, লিভার বা থাইরয়েডের রোগ আছে কি না, ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ আছে কি না, স্লিপ অ্যাপনিয়া, স্ট্রোক বা খিঁচুনির ইতিহাস আছে কি না এবং পরিবারের কারও অ্যানেসথেশিয়ায় গুরুতর প্রতিক্রিয়া হয়েছিল কি না, তা জানাতে হবে। গর্ভাবস্থার সম্ভাবনা থাকলে বা গর্ভাবস্থা থাকলে তার সময়কালও জানানো জরুরি।
লেখক: এমবিবিএস, ডিএ, অ্যানেসথেশিওলজিস্ট
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি, ঢাকা।



