১৪ জুন বিশ্ব রক্তদাতা দিবস
রক্তশূন্যতা এড়াতে ফলিক অ্যাসিড

চারপাশে এমন অনেক জরুরি বিষয় থাকে, যা নিয়ে আমরা সচরাচর খুব একটা মাথা ঘামাই না। অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হলেও বিষয়গুলো নজর এড়িয়ে যায়। তেমনই একটি অতিপ্রয়োজনীয় উপাদান ফলিক অ্যাসিড। এটি মূলত ভিটামিন বি-কমপ্লেক্সের একটি বিশেষ রূপ। রক্তকণিকা তৈরিতে প্রয়োজনীয় এই উপাদান সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনের জন্য খুবই দরকার। তবে শর্করা প্রধান খাদ্যাভ্যাসের কারণে প্রাকৃতিকভাবে এ পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হই আমরা। বিশেষ করে নারীদের শরীরের জন্য এ ভিটামিন অপরিহার্য হলেও সাপ্লিমেন্ট ছাড়া ফলিক অ্যাসিডের ঘাটতি সহজে মেটে না। ফলে খাদ্যাভ্যাসের বদল কিংবা সাপ্লিমেন্ট— যে আকারেই গ্রহণ করুন না কেন, ফলিক অ্যাসিড নিয়ে আমাদের সচেতন হওয়া দরকার।
খাদ্যাভ্যাস ও রক্তশূন্যতা
আমাদের চারপাশের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ও খাদ্যাভ্যাসের দিকে তাকালে চোখে পড়বে একটি বড় সমস্যা। আমাদের প্রধান খাদ্য ভাতে তেমন পুষ্টিগুণ মেলে না। রোজকার পাতে শর্করা, প্রোটিন ও স্নেহের অনুপাত নিয়েও বেশিরভাগ মানুষই সচেতন নন। এদিকে অতিরিক্ত শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট গ্রহণে শরীরে নানা পুষ্টির ঘাটতি তৈরি হয়। নারীদের ক্ষেত্রে এটি আরও প্রকট। আমাদের দেশের পারিবারিক ও সামাজিক বাস্তবতায় বেশিরভাগ নারীই পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার পান না। খাদ্যতালিকায় প্রোটিন ও শর্করার ভারসাম্য তো দূরের কথা, তাদের পাতে শাকসবজি ও ফলমূলও ওঠে তুলনামূলক কম। খাদ্যাভ্যাসে পুষ্টির ঘাটতি ও মাসিকের কারণে আমাদের দেশে নারীদের রক্তশূন্যতার প্রবণতা তুলনামূলক বেশি। এতে প্রতিনিয়ত তাদের ভুগতে হয় নানা স্বাস্থ্য সমস্যায়। গর্ভকালে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ে।
ফলিক অ্যাসিড মূলত তাজা ফল ও সবুজ শাকসবজি থেকে আসে। তবে রান্নার সময় অতিরিক্ত তাপে এ ভিটামিন সহজেই নষ্ট হয়ে যায়। তাই শরীরের রক্তশূন্যতা দূর করতে চিকিৎসকরা নিয়মিত ফলিক অ্যাসিড সাপ্লিমেন্ট বা ট্যাবলেট খাওয়ার পরামর্শ দেন।
শরীরে রক্তকণিকা তৈরিতে ফলিক অ্যাসিড খুবই প্রয়োজনীয়। রক্তশূন্যতা অন্তঃসত্ত্বা ও থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত মানুষের জন্য এটি জীবন রক্ষাকারী উপাদান
গর্ভধারণ ও একটি শিশুর ভবিষ্যৎ
সন্তান নেওয়ার কথা ভাবছেন এমন যেকোনো নারীর জন্য ফলিক অ্যাসিড খুব গুরুত্বপূর্ণ। গর্ভে সন্তান আসার পর প্রথম তিন মাস এটি খাওয়া বাধ্যতামূলক। শিশুর মস্তিষ্কের নিউরাল টিউবের সঠিক গঠনের জন্য ভিটামিনটি অপরিহার্য। শরীরে ফলিক অ্যাসিডের অভাব থাকলে গর্ভের শিশু জন্মগত প্রতিবন্ধী হয়ে বেড়ে উঠতে পারে। ঝুঁকি এড়াতে চিকিৎসকরা গর্ভধারণ-পূর্ব পরামর্শের ওপর জোর দেন। পরিবারে প্রতিবন্ধী শিশু মা-বাবা কারও জেনেটিক সমস্যা থাকলে এই ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। তাই সন্তান গ্রহণের পরিকল্পনা করার অন্তত তিন মাস আগে থেকেই ফলিক অ্যাসিড খাওয়া শুরু করা উচিত। এটি জন্মগত ত্রুটির ঝুঁকি প্রায় ২০ থেকে ৫ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনে। এই ট্যাবলেট খুবই সাশ্রয়ী মূল্যে বাজারে পাওয়া যায়।
থ্যালাসেমিয়া আক্রান্তদের লড়াই
সাধারণ মানুষের পাশাপাশি বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে ফলিক অ্যাসিড জীবন রক্ষাকারী উপাদান হিসেবে কাজ করে। উদাহরণ হিসেবে থ্যালাসেমিয়া রোগীদের কথা বলা যায়। এ রোগে আক্রান্ত মানুষের শরীরের রক্তকণিকাগুলো বেশিদিন বাঁচে না; স্বাভাবিক সময়ের আগেই ভেঙে যায়। এর ফলে মারাত্মক রক্তশূন্যতায় ভোগেন তারা। এই দীর্ঘমেয়াদি ঘাটতি পূরণে রক্তরোগ বিশেষজ্ঞরা থ্যালাসেমিয়া রোগীদের সারা জীবন ফলিক অ্যাসিড খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। এতে তাদের শরীরে নিয়মিত নতুন রক্তকণিকা তৈরির হার বজায় থাকে এবং সুস্থ থাকেন তারা।
সচেতনতাই মূল পথ
ফলিক অ্যাসিডের অভাব দূর করা কঠিন বা ব্যয়বহুল বিষয় নয়। এর জন্য প্রয়োজন কেবল সঠিক সময়ে সঠিক সচেতনতা। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় তাজা ফলমূল ও সবুজ শাকসবজি রাখার চেষ্টা করতে হবে। পাশাপাশি জীবনের বিশেষ মুহূর্তে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সাপ্লিমেন্ট নিতে হবে। সামান্য সচেতনতা পারে একটি পরিবারকে বড় ধরনের শারীরিক ও মানসিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ, বন্ধ্যত্ব ও গর্ভকালীন ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ ও সার্জন, বিআইএইচএস জেনারেল হাসপাতাল




