কোনো পেশাতেই শর্টকাটে সফলতা আসে না

কাজী মো. মহিউদ্দিন
সাফল্যের সংজ্ঞা আর সফল হওয়ার নানা উপায় সম্পর্কে জানা গেল মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চিফ মার্কেটিং অফিসার কাজী মো. মহিউদ্দিনের কাছ থেকে। লিখেছেন স্বর্ণা রায়
সাফল্য নিয়ে প্রচলিত ধারণা অনেকটাই ভুল। অনেকেই মনে করেন, একটি নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছানো মানেই সফলতার চূড়ায় পৌঁছে যাওয়া। কিন্তু বাস্তবে সাফল্য কোনো চূড়ান্ত গন্তব্য বা সমাপ্তি নয়; এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। যেদিন ভাববেন আপনি পুরোপুরি সফল হয়ে গেছেন, সেদিনই আপনার অগ্রগতির ইতি ঘটবে। অন্যদিকে আপনার কাজই আপনাকে এক পর্যায় থেকে অন্য পর্যায়ে নিয়ে যাবে।
এমনটাই বলছিলেন মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চিফ মার্কেটিং অফিসার কাজী মো. মহিউদ্দিন। ২২ আগস্ট শনিবার আগামীর সময়-এর প্রধান কার্যালয়ে ক্যারিয়ার ক্লাব আয়োজিত প্রথম ক্যারিয়ারবিষয়ক অনুষ্ঠান ‘করপোরেট ইনসাইডার: সাফল্যের পেছনের গল্প’তে প্রধান বক্তা ছিলেন তিনি।
এই করপোরেট ব্যক্তিত্বের কাছ থেকে জানা গেল, ২০০৬ সালে কোনো পরিকল্পনা করে নয়, বরং একটি আকস্মিক সুযোগ থেকেই কর্মজীবন শুরু হয় তার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় পত্রিকায় একটি বিজ্ঞাপন দেখে বিজ্ঞাপনী সংস্থায় আবেদন করেন। সেটিই হয়ে ওঠে তার প্রথম চাকরি।
পরবর্তী সময়ে বিজ্ঞাপন, করপোরেট ও ব্র্যান্ড মার্কেটিং— বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করার অভিজ্ঞতা তার পেশাগত দক্ষতাকে সমৃদ্ধ করেছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তরুণদের জন্য তিনি তুলে ধরেন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ।
চাকরির শুরুতেই বাড়তি দায়িত্ব নিন: কাজী মো. মহিউদ্দিন বললেন, কর্মজীবনের শুরুতে শুধু নির্ধারিত দায়িত্ব পালন করলেই হবে না। নিজের কাজ ও পেশা সম্পর্কে জানার জন্য বাড়তি সময় দিতে হবে। অন্যরা যেখানে আট ঘণ্টা কাজ করছে, সেখানে নিজের দক্ষতা ও জ্ঞান বাড়ানোর জন্য আরও এক-দুই ঘণ্টা সময় দেওয়া যেতে পারে।
নিজের প্রথম চাকরির অভিজ্ঞতা তুলে ধরে এই করপোরেট ব্যক্তিত্ব জানালেন, কাজ শেষে তিনি নিয়মিত বিভিন্ন ব্র্যান্ডের কার্যক্রম, বাজারের পরিবর্তন এবং যোগাযোগ কৌশল সম্পর্কে পড়াশোনা করতেন। সহকর্মীকে কাজে সহযোগিতা করতে গিয়ে একসময় তার দায়িত্বও বেড়ে যায়। ফলে অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছেন, অতিরিক্ত সময় দেওয়া ও আগ্রহ অনুভব করাই পরবর্তী সুযোগ তৈরিতে ভূমিকা রাখে।
যে কাজ করবেন, সেটি ভালোভাবে জানুন: যে পেশাতেই থাকুন না কেন, নিজের কাজ সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জন করতে হবে। শুধু নিজের দায়িত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে কাজটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মানুষ, প্রতিষ্ঠান, বাজার ও প্রতিযোগীদের সম্পর্কেও জানা দরকার— এমনটাই জানালেন কাজী মো. মহিউদ্দিন।
তার মতে, চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর প্রথম কাজ হওয়া উচিত নিজের পেশাকে বোঝা। নিজের ক্ষেত্রের ভালো কাজগুলো পর্যবেক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অনুসরণ করার পাশাপাশি নিয়মিত শেখার চেষ্টা করলে ধীরে ধীরে দায়িত্বের পরিধি বাড়ে।
পরিশ্রমের সঙ্গে কৌশলও জরুরি: কাজী মো. মহিউদ্দিন বিশ্বাস করেন, হার্ড ওয়ার্ক ও স্মার্ট ওয়ার্ককে পরস্পরের বিপরীত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। স্মার্ট ওয়ার্ক মানে শর্টকাট নয়। যে কাজ করা হচ্ছে, সেটি ভালোভাবে শেখার জন্য পরিশ্রম করতেই হবে। এরপর সেই কাজকে আরও কার্যকরভাবে করার কৌশল খুঁজে নেওয়া জরুরি। তাই কম সময় কাজ করে বেশি ফল পাওয়ার ধারণাকে ভুলভাবে ব্যবহার না করে কাজের প্রতি পূর্ণ মনোযোগ, পরিশ্রম ও দক্ষতার সমন্বয় করতে হবে। কেননা কোনো পেশাতেই সহজ কোনো শর্টকাট নেই।
মানুষের ভেতরের সফট পার্ট ও কাজের গ্রিপ খুঁজে নিন: প্রত্যেক মানুষেরই একটি শক্ত ও একটি কোমল দিক থাকে। কর্মক্ষেত্রে নানা ধরনের মানুষের মুখোমুখি হতে হয়। কেউ হয়তো খুব ব্যস্ত, কেউ রাগী বা সহজে সময় দিতে চান না। কিন্তু আপনাকে খুঁজে বের করতে হবে, কার সঙ্গে কোন কৌশলে বা কোন গ্রিপে কথা বললে কাজ আদায় করা সম্ভব। সবার সঙ্গে একই আচরণ কাজ করে না। অফিসের সবচেয়ে কঠিন বা ব্যস্ত মানুষটিরও একটি কোমল দিক থাকে। সেই জায়গা বুঝতে এবং সঠিক সময়ে সঠিক উপায়ে এগোতে পারলে জটিল কাজগুলোও সহজ হয়ে যায় বলে অভিমত কাজী মো. মহিউদ্দিনের।
প্রতিভার চেয়ে নিয়মিত থাকা গুরুত্বপূর্ণ: মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চিফ মার্কেটিং অফিসারের কাছে ডিসিপ্লিনের সহজ সংজ্ঞা হলো, মন চায় এমন কাজ না করা। প্রতিদিন একই রুটিন মেনে চলা, শেখার অভ্যাস ধরে রাখা এবং সাময়িক অনীহা বা ব্যর্থতার কারণে কাজ থেকে সরে না যাওয়াই শৃঙ্খলার পরিচয়।
তিনি বললেন, ক্যারিয়ার একটি দীর্ঘ দৌড়। পরীক্ষায় বা ক্যারিয়ারের শুরুতে কেউ এগিয়ে থাকলেই যে শেষ পর্যন্ত সে এগিয়ে থাকবে, এমন নয়। নিয়মিত পরিশ্রম ও শৃঙ্খলা অনেক সময় প্রতিভাকেও পেছনে ফেলতে পারে।
লক্ষ্য পরিষ্কার থাকলে বাধা ছোট হয়ে যায়:
আয়োজনে তরুণদের উদ্দেশে কাজী মো. মহিউদ্দিন বললেন, ক্যারিয়ারে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকা জরুরি। কেউ সাংবাদিক হলে কোন ক্ষেত্রে সেরা কিংবা ফটোগ্রাফার হলে কী পরিচয়ে পরিচিত হতে চান— এগুলো স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে। লক্ষ্য পরিষ্কার থাকলে কর্মক্ষেত্রে সমালোচনা, প্রত্যাখ্যান কিংবা কঠিন পরিস্থিতি সহজে মানুষকে থামাতে পারে না। তাই পথের সাময়িক বাধার চেয়ে নিজের গন্তব্যকে গুরুত্ব দেওয়ার ওপর জোর দেন তিনি।
নিজেকে চ্যালেঞ্জ করুন: ক্যারিয়ার যখন একই জায়গায় আটকে যাচ্ছে বলে মনে হবে, তখন নিজেকেই নতুন চ্যালেঞ্জ জানানোর পরামর্শ দিয়েছেন এই করপোরেট ব্যক্তিত্ব। তার মতে, একটি কাজ শিখে স্বচ্ছন্দ হয়ে যাওয়ার পরও একই জায়গায় থেমে থাকা উচিত নয়। নতুন দায়িত্ব, নতুন ক্ষেত্র কিংবা নতুন দক্ষতা অর্জনের সুযোগ খুঁজতে হবে।
নিজের বর্তমান দায়িত্বের উদাহরণ দিয়ে কাজী মো. মহিউদ্দিন জানালেন, ব্র্যান্ড মার্কেটিংয়ের পাশাপাশি নতুন দায়িত্ব হিসেবে সেলস টিমের নেতৃত্ব নিয়েছেন এবং নতুন একটি সিমেন্ট ব্র্যান্ডকে শূন্য থেকে তৈরি ও বাজারজাত করার কাজে যুক্ত হয়েছেন। তার মতে, চ্যালেঞ্জই ক্যারিয়ারে উন্নতির পথে অন্যতম ধ্রুব।
ক্যারিয়ারের পথে সাফল্যের পাশাপাশি ব্যর্থতা, প্রত্যাখ্যান ও কঠিন সময়ও আসবে। তবে সেসব অভিজ্ঞতা থেকে শেখার মানসিকতা এবং ধৈর্য একজন পেশাজীবীকে অন্যদের থেকে এগিয়ে রাখে। তাই স্বস্তির জায়গায় থেমে না থেকে প্রতিটি নতুন চ্যালেঞ্জকে নিজের সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ হিসেবে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
অংশগ্রহণকারীদের অভিমত
অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী আবুল বাশার মিরাজ বললেন, ‘সফলতার নেপথ্যের অভিজ্ঞতা, সংগ্রাম ও শেখার গল্পগুলো আমাকে নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছে। এমন একটি সুন্দর আয়োজনের অংশ হতে পেরে কৃতজ্ঞ এবং আমার আগামীর পথচলায় এটি নিঃসন্দেহে অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।’
অন্যদিকে রুথ চৌধুরী বললেন, ‘এ ধরনের কার্যক্রম যাতে এক দিনের জন্য না রেখে দুই থেকে তিন দিন ধরে আয়োজন করা হয়, তাহলে আমরা আরও বেশি উপকৃত হবে।’







